মঙ্গলবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৮

জরুরী কথা

প্রতিবার গল্পবৈঠক শেষে ইনবক্সে মেসেজ ভরে যায়। এবারেও তাই হল। কি করে গল্পবৈঠকে গল্প পড়তে পারি? অনেকবার আগেও বলেছি, আবারো বলছি।
সর্বাগ্রে তিনটি "উ"কে চাই। গল্পকার বন্ধুকে হতে হবে উপকারী, উপযোগী, উতসাহী।
আমাদের অনুষ্ঠানের কোনো মেম্বারশিপ চাঁদা নেই।
এখানে অনুষ্ঠান মূলতঃ কোয়ালিটির ওপর বেস করে হয়।
কোয়ান্টিটি তে প্রাধান্য দেওয়া হয় না।
আমরা সম্মাননা জ্ঞাপন করিনা। 
আমাদের প্রতি অনুষ্ঠানে নতুন নতুন থিম আর সীমিত শব্দসীমার মধ্যে ছোট ছোট গল্প লেখাটাই প্রধান উপজীব্য বিষয়। আর?
অন্ততঃ গল্পকারের একটি গদ্য সংকলন থাকাটা বাঞ্ছনীয় unless তিনি অনেকদিন কবি অথবা সম্পাদনা, সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। 
প্রিন্ট অথবা ওয়েব পত্রিকায় অন্ততঃ দুটি গল্প প্রকাশিত হওয়াটা বাঞ্ছনীয়।
গল্পটি যেন পাঠযোগ্য হয়।
পাঠ যেন শ্রুতিমধুর হয় এবং স্পষ্ট উচ্চারণ হয়।
আর ওপরের ক্রাইটেরিয়া গুলি সব ফুলফিলড হলে শ্রোতা হয়ে আসতে হবে আপনাকে অথবা কোনো কাজে অংশ নিতে হবে।
তারপর আমরাই ডেকে নেব আপনাকে একদিন। শুধু নিজের গল্পটি পড়লাম আর চলে এলাম হলে চলবে না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাকে অনুষ্ঠানের রিভিউ লিখতে হবে। কোথাও সেটি প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। সঞ্চালনার দায়িত্ত্ব নিতে হবে দরকার পড়লে। তার চেনা পরিচিত কোনো আলোচক কে নিমন্ত্রণ করে আনতে হবে।
প্রত্যেক অনুষ্ঠানে বিদগ্ধ আলোচক থাকেন। তাঁর আলোচনা নেবার মত শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। 
এবার প্রস্তুত তো? 

মঙ্গলবার, ৩ এপ্রিল, ২০১৮

গল্প বৈঠক - ১৯ বিষয়ঃ স্বরচিত অ্যাডাল্ট থিমের গল্প

ণিশতম গল্পবৈঠকের প্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রাপ্তমনস্ক অধিবেশন বসেছিল দক্ষিণ কলকাতার রাজডাঙায় শ্রীমতী তপশ্রী পালের বাড়িতে। এবারের বৈঠক আদ্যন্ত নারীপ্রধান এবং লেখিকাদের উপস্থিতিতে উজ্জ্বল। সাহিত্যিক কণা বসুমিশ্র প্রায় প্রতিবারের মতই এবারেও উপস্থিত ছিলেন।
মোট আটজন গল্পকার এবারে গল্প বলেছেন। আলোচনায় ছিলেন অদ্বিতীয়া পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক মৌমিতা তারণ এবং সিস্টার নিবেদিতা গার্লস কলেজের বাংলার বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপিকা মণিদীপা দাস। সঞ্চালনায় মৌমিতা ঘোষ কথার ফাঁকে ফাঁকে দু এক লাইন স্বরচিত কবিতায় ভরিয়ে দেন গল্পপাঠের সন্ধ্যা।


প্রথম গল্পকার ছিলেন বুবুন চট্টোপাধ্যায়। তাঁর গল্পের নাম ছিন্নশোক। গল্পের বিষয় এক মধ্যবয়সী যৌবন অতিক্রান্ত দম্পতি। প্রকৃতির নিয়মে স্ত্রী তাঁর মেনোপজ আক্রান্ত দেহে অনুভব করেননা মিলন সুখ। স্বামীও এন্ড্রোপজকেই ভবিতব্য জেনেছেন। আপাত সুখী দাম্পত্যে অবিশ্বাস নেমে আসে স্বামীর মৃত্যুতে। স্ত্রী জানতে পারেন, যৌবন তাঁরই গিয়েছে। স্বামী তাঁর অজান্তে পরকীয়াতে রত ছিলেন। স্ত্রীর এই শোক স্বামীর মৃত্যুশোককে ছাপিয়ে যায়।


দ্বিতীয় গল্পকার আইভি চট্টোপাধ্যায়। গল্পের নাম নিকুঞ্জ। ভারী মরমী গল্প। এটিও এক দম্পতির গল্প। যেখানে স্বামী আবিষ্কার করে যে স্ত্রী আসলে সমকামী। অথচ, যে কোনও কারণেই হোক, সেইটি সে নিজেও বোঝেনি। জানার পর প্রাথমিক দুঃখবোধ দুজনকেই ভারাক্রান্ত করে । কিন্তু স্বামীর কাছে প্রেম এক অন্য রূপে আসে। স্ত্রীর অসময়ে সে পাশে থেকে যায়।
তৃতীয় গল্পকার তপশ্রী পাল। তাঁর গল্পটির নাম প্রথম রিপু। আদ্যন্ত কমেডির মোড়কে এটিও এক দম্পতির মধ্যবয়সের সেক্সুয়াল ইনকমপ্যাটিবিলিটির গল্প। শেষ পর্যন্ত যা শেষ হয় পুরুষটির অনিবার্য এক মোহ ও পাপের মধ্য দিয়ে। বাস্তব ঘটনা গল্প হয়ে উঠেছে। 
 চতুর্থ গল্পকার ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর গল্পের নাম সাপ। এটিও এক দম্পতির গল্প। শীতল স্ত্রীকে সন্দেহ করে  স্বামী। সেই সন্দেহের প্রতীক যেন সাপ। সাপের হিসহিস শব্দ যেন তার নিজের বুকের ভেতর। শেষ পর্যন্ত গল্পের উত্তরন ঘটে। স্বামী যখন পিতা হয়ে ঘুমন্ত স্ত্রীর অবয়বে নিজের আত্মজাকে  দেখতে পায়।
পঞ্চম  গল্পকার অনিন্দিতা মণ্ডল। গল্পের নাম উন্মেষ। গল্পটি একটি মুক্ত  সম্পর্কের গল্প। যেখানে দুটি ভাই সম্পূর্ণ বিপরীত স্বভাবের। উদ্দাম পৌরুষ যার, সেই ভাইকে প্রত্যাখ্যান করে নরম স্বভাবের অন্য ভাইকে আপন করে নেয় এক নারী। অবাক নারীর বিস্ময়কে সত্যি প্রতিপন্ন করে যে পুরুষ বলে, সে জীবনে প্রথম যে মেয়েটিকে দেখেছে, সে তার মা।
ষষ্ঠ গল্পটির নাম ও সাপ। গল্পকার মহুয়া মল্লিক। বলিষ্ঠ এক গল্পে গল্পকার জানিয়েছেন ব্যাভিচারিনী এক নারীর যৌন অতৃপ্তি ও তৃপ্তির সন্ধিক্ষণ। এখানে সাপ যৌন কামনার অনুষঙ্গে উঠে এসেছে।
সপ্তম গল্প নিমমঞ্জরী। গল্পকার কৃষ্ণা রায় সমাজের চিরাচরিত এক কষ্টের কথা বলেছেন। যেখানে ধর্ষিতা তার জনককেই চিহ্নিত করে ধর্ষক হিসেবে। আর তার এই কষ্ট থেকে বার করে আনার জন্য তার স্বামী মনোবিদের পরামর্শ মানে। মেয়েটি তার জীবনের অন্য প্রধান পুরুষটির হাত ধরে বেরিয়ে আসতে থাকে আলোয়। ধর্ষিতার একটি পাপবোধ কাজ করে। যা থেকে মুক্ত হতে পারলে সে আসলে পেরিয়ে যায় অন্ধকার।


অষ্টম গল্পটি গল্প বৈঠকের মূল হোতা, ইন্দিরা  মুখোপাধ্যায়ের। গল্পের নাম তিন কন্যা। তিনটি দুঃখিনী মেয়ের গল্প। তিন বোন। বাবা মা যখন দালালের সঙ্গে মিলে তাদের বিক্রি করে দেয়। আর তাদের নিষ্ঠুর পরিণতি যা হতে পারে তাই। একটি বোন বেশ্যা পল্লী থেকে পালিয়ে যেতে গিয়ে হারিয়ে যায়।শহরের "মিসিং গার্লের দলে নাম লেখায়। একটি ঠাই পায় নিষিদ্ধ পতিতা পল্লীতে। সয়ে  যায় তার। আর সবচেয়ে বড় বোন খাল পাড়ের বস্তিতে থাকে। দিন গুজরান করে কয়েক বাড়ি পরিচারিকার কাজ করে। শেষ পর্যন্ত সেও ভেঙে পড়ে প্রৌঢ় মালিকের কাছে। রাত্রিতে তাকেও খুশি করতে হয় ধাবার ড্রাইভার খালাসিদের। নইলে বস্তিতে থাকা চলেনা। নিরুপায় সে আশ্রয় চায় সামাজিক ভাবে নিরুপায় এই মানুষটির।
গল্প বৈঠকের এই অধিবেশন আক্ষরিক অর্থেই প্রাপ্তমনস্ক। মনস্তত্ব জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে প্রতিটি গল্পে।
আগামীতে আরও উন্নত হোক ধারালো হোক বৈঠকি কলম।উঠে আসুক নতুন নতুন গল্প। 


প্রতিবেদনঃ অনিন্দিতা মণ্ডল

বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

অষ্টাদশী গল্পবৈঠক


অয়ন চৌধুরী

প্রদীপ গুপ্ত ( যুগ সাগ্নিক পত্রিকা)
যেন সমাপতন। গল্পবৈঠকের ১৮তম সম্মেলন পড়েছিল ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৮ তারিখে।স্থান : গান পয়েন্ট ক্যাফে। মনোহরপুকুর রোড। কলকাতা।  রিভিউ লিখলেন জয়তি রায়। 

‘গল্পবৈঠকের’ আসরে প্রথমবার গিয়ে কবি সুকান্তর কবিতার সেই বিখ্যাত লাইনটি মনে পড়ে যাচ্ছিল।

   "আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়"
ঠিক তাই সাবালিকার ভয় কি পথচলায়?

গল্পবৈঠকর আঠারোতম সম্মেলন ছিল সেদিন । ফাগুনের মাতাল দুপুর, খোলা বাতাবরণ, রঙ্গীন মনের এক গুচ্ছ নবীন লেখককে দেখে  মনে হল, আঠারো বসন্তের স্পর্ধা নেমে এসেছে ওখানে। উপলব্ধি দেরিতে হলেও বুঝলাম ,স্থানটিও একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে রয়েছে। খোলামেলা, সুন্দর আলো, বসবার জন্য ছড়ানো ছিটানো চেয়ার গুলি, অপূর্ব এক আড্ডা হাওয়া মহল তৈরি । আয়োজক লেখিকা ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়।

উপস্থিত ছিলেন আরো এক ইন্দিরা। তিনি একাধারে সুগায়িকা ও সঞ্চালিকা ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় । সভাকে বেঁধে রেখেছিলেন নিপুণভাবে। সবকটি গুণী সদস্যের উজ্জ্বল উপস্থিতি সভাকে একটি অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছিল।

সঞ্চালিকা এবং গায়িকা ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায়


 এবারের গল্পের বিষয় ছিল: প্রেম ও সম্পর্ক। বাঁধাধরা শব্দসীমার মধ্যেও প্রত্যেক লেখক পরিবেশন করলেন, টানটান, সংবেদনশীল, বলিষ্ঠ বক্তব্যপূর্ণ  নিজেদের গল্প। শুরুতে এবং মধ্যে মধ্যে ইন্দিরার রবীন্দ্রসংগীত, আলোচকদের আলোচনায় ভরপুর সভাটি দেখে মনে হচ্ছিল, সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে স্বয়ং ঈশ্বর নেমে এসেছেন।

মোট এগারটি গল্প পাঠ হল। প্রত্যেকটি গল্প ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যে, বক্তব্যের বলিষ্ঠতায়, ভাষার সাবলীলতায় এবং পরিচ্ছন্ন শব্দ চয়নে উজ্জ্বল। প্রেম, বিরহ,পরকীয়া, মা ছেলে, শাশুড়ী বৌমা -- চিরাচরিত সম্পর্কের টানাপোড়েন, প্রকৃতির নিখুঁত বর্ণনা--

প্রেম ও সম্পর্কের নানা দিক দিয়ে ভরপুর গল্পগুলি শুনতে শুনতে মুগ্ধ নির্বাক শ্রোতারা এক কথায় মধুর মৌমাছির মত আটকে বসে ছিল।

মাঝে মাঝে গল্পগুলি নিয়ে সুন্দর আলোচনা করছিলেন, প্রদীপ গুপ্ত(সম্পাদক যুগ সাগ্নিক)
এবং অয়ন চৌধুরী (সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞ)

 

সুকল্যাণ চৌধুরী
জয়তি রায়
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়
সোনালী

তমালী রায়
তপশ্রী পাল

বুবুন চট্টোপাধ্যায়
কৃষ্ণা রায়


মহুয়া মল্লিক
আর উপস্থিত ছিলেন  সুকল্যান চৌধুরী-- আমাদের গুণী বন্ধু । হঠাৎ এসে পড়ে, মুগ্ধ করলেন গানে ও মনোগ্রাহী আলোচনায়।

আসরের প্রথম গল্পটি পাঠ করলেন, নন্দিনী সেনগুপ্ত। গল্পের নাম - খেলা। একটা খেলার মধ্যে দিয়ে গল্পটি বুনে উঠেছে। খেলাটি হল-- বাংলা ছাড়া অন্য শব্দ বললেই ফাইন হবে। রাকা আর সুমন্ত্র আর চাঁদিপুরের মধুচন্দ্রিমা যাপনের মধ্যে টুকরো টুকরো সংলাপ দিয়ে তৈরি এক পরিপূর্ণ ছবি। দুদিন পরেই একুশে ফেব্রুয়ারী। ভাষা দিবস। সেই প্রেক্ষিতে,গল্পের শেষে যখন , সুমন্ত্র বলে-- থ্যাংক ইউ।”
রাকা বলে যে, দুবার টাকা দিতে হবে। কেন না,দুটি ইংরেজি শব্দ বলা হয়েছে। শেষটি অতি সুন্দর। গল্পের নাম খেলা অতি সুপ্রযুক্ত।

কৃষ্ণা দাস
নন্দিনী সেনগুপ্ত


জয়তী রায়ের একলা ফাগুনে -- ঘটনার ঘনঘটা বা বর্ণনার বিস্তার নেই। এক একলা মনের দিকশূন্যপুর যাওয়ার প্রবল ইচ্ছে বাঁধা পড়ে আছে সংসার ধর্মের শিকলে, তাই নিয়ে এক কাব্যধর্মী অনুগল্প বলা যায়।

কৃষ্ণা দাশের খাদান গল্পে তুলে এনেছেন কয়লা খাদানের চরিত্র-- “বাবার মৃত্যুর পর দিন গুলি কয়লা গুঁড়ির মত কালো হয়ে যাচ্ছে।’ প্রাঞ্জল বর্ণনা, ধেনো মদ, হাতে সোনার বালা চক চক ,কয়লা মাফিয়ার রূপ ফুটে ওঠে। খাদান নামটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকল  নরনারীর সম্পর্কের অতল গভীর খাদানের মত রহস্য। কৃষ্ণার গল্পের সাবলীল রূপ মুগ্ধ করে।

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের উড়নচন্ডী গল্পে মা পদ্মা আর উত্তরদিশায় কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে উত্তরার মধ্যেকার সম্পর্কের টানাপোড়েন, একে অন্যের প্রতি মমতা, দায়িত্ববোধ আর তার মধ্যে এসে পড়ে বস্তি, নিম্ন শ্রেণীর সমাজ, কেমন ভাবে শোষিত হয় ‘বাপী’র মত মানুষদের কাছে। যারা অসহায় মা মেয়ে দুজনকেই ছিঁড়ে খায়। কিশোরী বয়সের খিদে, পড়াশুনো করার অদম্য ইচ্ছে থেকে উত্তরা বাপিকে কাছে ঘেঁষতে দিলেও সখেদে বলে
বাপীদা এগরোলও কিনে দেয় না!” সমাজ, এবং সম্পর্ক হাত ধরাধরি করে এই গল্পে উঠে এসেছে এই গল্পে ।

আলোচক দুজন প্রদীপ গুপ্ত এবং অয়ন চৌধুরী সদা সতর্ক থেকে নিজেদের মূল্যবান মতামত দিচ্ছিলেন। পাঠ করা নিয়ে অয়ন বলতে চাইলেন "গল্প লেখার মত ,পাঠ ও সুন্দর হবার দরকার আছে” 

প্রদীপ দা সুন্দর করে বোঝালেন যে, ইন্দিরার এই গল্পটির মধ্যে লুকিয়ে থাকা আগামী উপন্যাসের সূত্র।

বলে রাখা ভালো,গল্প পড়ার ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মধ্যেই সংগীতশিল্পী ইন্দিরার গলার রবীন্দ্রসংগীত শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল এক অন্য ভুবনে পৌঁছে গেছি। সংগীত আর সাহিত্যের এই অপূর্ব মেল বন্ধন সম্ভব হয়েছিল, গল্প বৈঠকের কান্ডারী লেখক ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের জন্য। ওনাকে মাইকের ব্যবস্থা, সুস্বাদু জলখাবারের ব্যবস্থা, সবার সব রকম কথা শুনে মিষ্টি করে হেসে উত্তর দেওয়ার পরে অনুষ্ঠানকে তর তর করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কি করে সম্ভব হল, ভেবে আমি /আমরা যথারীতি মুগ্ধ হচ্ছিলাম।

ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের  "প্রেম” নামের গল্পটিতে সম্পর্ক এবং প্রেম দুটিই যেহেতু অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, তাই দুটো দিকই এই গল্পে ফুটে উঠেছে সুচারু ভাবে। কাজের মেয়ে তার জীবনের গল্প বলে। কেমন করে তার চেয়ে বয়সে অনেক বড় স্বামী তাকে মদ খেয়ে মারধোর করে। প্রথম পক্ষের এক বউও আছে আবার। তবু সে স্বামীকেই, তার মরদকেই ভালোবাসে। এক অদ্ভুত টান। যার জন্য বাকি সব না পাওয়া তুচ্ছ হয়ে যায় তার কাছে! শুনতে শুনতে ভাবি, কত সামান্য ত্রুটি তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের সম্পর্কককে ভেঙে চুরমার করে দেয়। আর এই কাজের মেয়েটি ? কোনো শর্ত ছাড়াই সে কেবল ভালোবাসে। love for love's sake। নিজের থেকেও সেই মাতাল স্বামীর সুখ তার কাছে বড়। সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা, ভাস্বতীর এই গল্পটি তার নামের মতই সার্থক।

গল্প পাঠ করলেন বুবুন চট্টোপাধ্যায়: গল্পের নাম “মায়া”। আসরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প বলা যায়। প্রথমেই ধাক্কা খাই, গল্পের বিষয়বস্তুতে। বিদেশে থাকা সন্তানের প্রয়োজনে দেশ থেকে মা বাবাকে যেতে হয় বিদেশে। সেখানে যাবার পরে কুরে কুরে খায় একাকীত্ব। বুবুন বাড়তি কথার মধ্যে যান নি, অতিরিক্ত ভাবাবেগ, শব্দ প্রয়োগ কিছুই না করে, সামান্য সামান্য মোচড়ে ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন এমন ভাবে যে, গল্পের শেষে এসে সোনালী মাছের ল্যাজ ঝাপটে ঘুরে তাকানোর মধ্যে দিয়ে বোঝা যায়, মায়ের বুকের ভেতর “কেউ’ যে ডাকছিল ,সে আসলে তার নিজের চেনা পরিবেশ। অনবদ্য।

তপশ্রী পালের "সেই সাগর বেলা" গল্পে পঞ্চাশ পেরোনো নায়িকা মনে করছে তার ফেলে আসা মধুচন্দ্রিমার দিন গুলির কথা। সে যেতে চেয়েছিল পাহাড়ে, স্বামী নিয়ে এলো সাগরের কূলে। নামী দামী হোটেলের স্বাচ্ছন্দ্যে তর তর করে কেটে গেল দিনগুলি। মন থেকে মুছেও গেল পাহাড়ে না যাবার অভিমান। তবে, একদিন এক বিপদ ঘটতে যাচ্ছিল। গল্পটির ছোট ছোট মুহূর্ত গুলি ভারি সুন্দর। যেমন কলার খোসায় পা পিছলে পড়ে নায়িকা লেখনীর ব্যাগ খুলে বেরিয়ে এলো হাজার কসমেটিকস। ফ্লুরিসে বসে সংলাপ আর লেখনীর খুনসুটি।
হোটেল বা অন্য কোনো জায়গার নাম প্রকাশ্যে না বলাই ভালো, এমনতর বক্তব্য রাখলেন আলোচক তপশ্রীর গল্প পাঠের শেষে।

সোনালীর গল্পকে বলা যায় তার ধারাবাহিক উপন্যাস  “ল্যাপটপ আর হাভেলীর গল্প” থেকে নেওয়া এক টুকরো অথচ সম্পূর্ণ ছবি, তার নাম “হাভেলীর গল্প”
গল্পে রিন রিন করে বাজে মিষ্টি প্রেমের সুর। খাড়ি হিন্দী, রাজস্থানী উর্দু শব্দের যথাযথ ব্যবহার গল্পে এনেছে অন্য মাত্রা। গল্পের নায়িকার নাম সোহিনী। নামটি উচ্চারণ মাত্রেই যে গভীর মিষ্টি রাগ সংগীত মনের আকাশে ফুটে ওঠে, নায়িকা তেমনই সুন্দর। অসাধারণ চিত্রকল্প এই গল্পের। সোনালী যেন অক্ষরের তুলিতে ফুটিয়ে তুলেছেন রাজস্থানী রঙ্গীন জীবন। তখন বিকেল নামছিল ধীরে ধীরে। মন্ত্রমুগধ শ্রোতারা ডুবে যাচ্ছিলাম হাভেলীর ছায়াঘন রহস্যে।
চা পানের বিরতির পর শুরু করলেন অধ্যাপিকা কৃষ্ণা রায়।  তাঁর ছোট গল্পের নাম ‘নষ্টচন্দ্র’। আমাদের আড্ডায় তখন হ্যারিকেনের মধ্যে জ্বলে উঠেছে হলুদ আলো। পরিবেশ আরো সুন্দর। খুব উপযুক্ত। নষ্টচন্দ্র গল্পটি অসাধারণ মনস্তাত্বিক বুনোটের উপর ভিত্তি করে লেখা। নিছক শাশুড়ি বৌমার দ্বন্দ্বের কাহিনী নয় । এখানে এসেছে অস্তিত্বের সংকটের কথা। কাহিনীতে অঙ্ক বিষয়টিকে কেন্দ্র করে দুটি নারীর কথা। যারা দুজনেই অঙ্ক ভালোবাসে। দুজনে নিজের মত করে বিষয়টিকে বোঝে। দুজনের জায়গায় দুজনে অনড়। জীবনের অঙ্ক মেলাতে পারেনা কেবল স্ত্রী আর মায়ের মাঝে থাকা পুরুষটি। গল্প শেষ হবার পরে কিছুক্ষন চুপ করে থাকতে হয়। সঠিক শব্দসীমার মধ্যে খেলা করে কৃষ্ণার জাদু কলম মনের মধ্যে এক চাপা দীর্ঘশ্বাসের সৃষ্টি করে। আর পাঠটিও যথা যত।

তমালী রায়ের গল্প “আমার সকলই নিয়ে” প্রেম এবং সম্পর্কের গল্প। অসাধারণ সংলাপ এবং লেখার মসৃন ভঙ্গি বজায় রেখে তমালী দেখিয়েছে, কিভাবে দাম্পত্য প্রেমে আসে তৃতীয় ব্যক্তি। এই সঙ্গে নাসির আর পিয়াসার সম্পর্ক তুলে আনে মুসলিম সমাজের একটি দিক। বিষয় বৈচিত্র্য, চরিত্র চিত্রণ অসামান্য দক্ষতায় ফুটে উঠলেও, আলোচক সামান্য আপত্তি করেন, গল্পের মধ্যে গান রাখা এবং ইংরেজী শব্দের ব্যবহার নিয়ে।

এই পর্যন্ত  যতগুলি গল্প শুনেছি, প্রত্যেকটি গল্পকে আলাদা করে লেখা উচিত বলে মনে করি। ঠাস বুনোন, জীবন্ত চরিত্র চিত্রণ, উপযুক্ত সংলাপ সৃষ্টি, পরিবেশ প্রকৃতির যথাযথ বর্ণনায় পূর্ণ প্রতিটি গল্প আলাদা মনোযোগের দাবী রাখে।

প্রকৃতি পরিবেশের সার্থক উদাহরণ শেষের গল্প

 দৃশ্যান্তর। লিখেছেন মহুয়া মল্লিক।

ট্রেনের ডেইলি প্যাঞ্জারের জীবন যাত্রা। ট্রেন চলছে। পলকে বদলে যাচ্ছে জীবনের ছবি। ছুটছে ট্রেন। কখনো ধীরে কখনো দ্রুত। দেখা যাচ্ছে উকুন বাছে এক মেয়ে, সংসার , হাঁড়ি কুড়ি, ছেলে মেয়ে, খেজুর গাছের রস , মান অভিমান মিলিয়ে মিশিয়ে এক নিটোল ছবিকে দেখে নিজেকেই যেন খুঁজে পায় সুলগ্না। তার প্রেম এবং প্রতারণার কষ্ট ওই ট্রেনের কামরায় ঘটে যায়, তারই প্রতিরূপ যেন ওই মেয়েটির সংসার।  একটুকরো নির্মম সমাজ -ছবি  দেখতে পাই ,  সুলগ্নার  প্রতি কামরার সহযাত্রীদের টিপ্পনীতে। হতাশা - আক্রান্ত সুলগ্নার সামনে আবার দাঁড়ায় ওই মেয়েটি তার সুখী জীবন নিয়ে। তাই দেখে সুলগ্নাও ফিরে পায় মনের জোর।

গল্পটির, বিশেষত্ব তার চলনের মধ্যে এবং শেষের পজিটিভ দর্শনের মধ্যে।
এর পরে, সুগায়িকা ইন্দিরার একটি অনবদ্য মুক্ত গদ্য পাঠ ও গানের সুরে আসর মেতে ওঠে ফাগুন হাওয়ায়। চমক বাকি ছিল । নতুন অতিথি সুজাতার কণ্ঠে একটি ঝলমলে লোকগীতি হঠাৎ কানে এসে বেজে, প্রাণে দোলা লাগিয়ে দিল।
সুস্বাদু জলখাবার এসে গেল। সবশেষে, এবার বিদায়ের পালা। কোথায় যাবো? যাচ্ছি বটে, কিন্তু আবার যেন ফিরে আসতে পারি গল্প বৈঠকের আসরে। এমন প্রতিশ্রুতির আদান প্রদানের মধ্যে দিয়ে শেষ হল-- আঠারোতম গল্প বৈঠকের আসর।



শুক্রবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৮

২০১৮ য় প্রথম গল্প বৈঠক

ত ২৪শে জানুয়ারি, ২০১৮ অনুষ্ঠিত হল গল্পবৈঠকের সপ্তদশতম সাহিত্য বাসর। আনন্দের চাঁদের হাট বসেছিল ইছাপুর মণ্ডল রাজবাড়িতে । ঐতিহ্যমণ্ডিত এই বাড়িতে শীতের নরম দ্বিপ্রাহরিক রোদ্দুরে গা এলিয়ে নেমে এলো গল্পেরা, তার সাথে পরম সুখে মাথা নেড়ে তাল দিল গঙ্গাতীরের মৃদু বাতাস। যারা গল্পবৈঠকের সাথে জড়িত, সবাই জানেন যে এখানে যারা আসেন, গল্প এবং শুধুমাত্র গল্পের টানেই আসেন। অন্য কোনও বিশেষ আকর্ষণ যেমন পত্রিকায় গল্প ছেপে বের হওয়া বা বিশেষ কোনও পুরস্কার প্রদান, সম্মাননা প্রদান, বই প্রকাশ... এসব কোনও কিছুর সাথে গল্পবৈঠক বা গবৈ-এর কোনও সম্পর্ক নেই।

মধ্যাহ্নভোজনের পরে ঘরোয়া এই বৈঠক শুরু হল অতিথি গল্পকার শতদ্রু মজুমদারের গল্প ‘কবি ও কবিতা’ দিয়ে। কাব্যপাঠের এক আসরে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র এক কবির কবিতার খাতা হারিয়ে যাওয়াকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে গল্পের ঘটনাবলী। কবির সন্দেহ, মানসিক দোলাচল, কবিতার পাণ্ডুলিপি হারানোর কষ্ট এসব অনুষঙ্গের মধ্য দিয়ে যেন লেখক বর্তমান সময়ের কাব্যলক্ষ্মীর দৈন্যদশার কথাই ব্যক্ত করলেন কিছু ব্যঙ্গের মোড়কে।

দ্বিতীয় গল্পকার ছিলেন প্রদীপ গুপ্ত। গল্পের নাম ‘বসন্তপূর্ণিমার খোয়াব’। চাঁদ এবং এক পাগল বাউলকে কেন্দ্র করে নেমে এলো এক স্বপ্নালু আবেশ। লেখার কাব্যিক শৈলীর মধ্য দিয়ে জ্যোৎস্নার আলো এসে যেন মুছে দিল বাস্তব এবং কাল্পনিক জগতের সীমারেখা। গল্পের শেষে চন্দ্রোদয় বয়ে নিয়ে আসে নতুন আশাবাদী ইঙ্গিত।

তৃতীয় গল্পে নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত বললেন একটি মেয়ের গল্প। আমোদিনী কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেও, এই গল্পেও চাঁদ একটি উল্লেখযোগ্য পার্শ্বচরিত্র, কারণ গল্পের নাম ‘চন্দ্রবিদ্ধা’। সত্যিই কি চাঁদ আমোদিনীকে উন্মাদ করে দেয়? নাকি সংসারের চার দেয়াল থেকে পথে বেরিয়ে জন্ম হয় আরেকটি নতুন মেয়ের, যে দূর থেকে পরম আমোদে পর্যবেক্ষণ করে জগতসংসার। সাধুভাষায় লেখা এই গল্পের জোরালো বার্তা পাঠক এবং শ্রোতামণ্ডলীকে ভাবতে বাধ্য করে।

চতুর্থ গল্পকার ছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক কণা বসু মিশ্র; পড়লেন হার-না-মানা চিরযুবক মানুষের গল্প ‘সৌম্যকান্তি’। তিনি কোনওভাবেই মেনে নিতে চাননা তার বয়স বাড়ছে। টুকরো টুকরো খুশি রীতিমত হিসেব করে কুড়িয়ে বাড়িয়ে, সাজিয়ে নিতে চান বেঁচে থাকার আনন্দ। সংসার আড়ালে হাসে, তাল রাখতে পারেনা তার অদম্য ইচ্ছের সাথে, কিন্তু তাতে সৌম্যকান্তির বয়ে গেলো। আকর্ষক নানা সংলাপের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা গল্পের পরিণতি চরম মুহূর্তে পৌঁছায়, যখন সৌম্যকান্তি নিজের বুড়োটে প্রতিবিম্বকেও আয়নায় লাথি মেরে অস্বীকার করেন।


 পঞ্চম গল্প ‘পরবাস’এ কস্তূরী চট্টোপাধ্যায় বিবৃত করেন একটি মেয়ের কথা। শিশুকালে, কিশোরীবেলায় উদারমন মা’কে সংসারে এমনকি নিজের অধিকারটুকুও দাবী করে নিতে দেখেনি বন্যা। হয়তো তাই সে নিজেও কোনওকিছু আঁকড়ে ধরেনা সেভাবে, বরং অসুখী সংসার-জীবনের অজস্র না-পাওয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় থাকে কখনও না-যাওয়া, এক অগম্য প্রবাসের। সহজ ভঙ্গিমায় লেখা এই গল্প টেনে রাখে, শ্রোতারা একাকার হয়ে যায় বন্যার সাথে, আশায় জাগে মন, তার অনাগত প্রেমের জন্য।

পরবর্তী গল্পকার তমালী রায় তার ‘অন্তর্লীনা’ গল্পে শুনিয়েছেন এক নারী দেবদত্তার কথা, যার অন্তর্জগত হঠাৎ টলে যায় মনোরোগে। ছাত্রজীবনে প্রিয় বন্ধু গুঞ্জন ছিল লেখালেখি এবং সৃষ্টিকর্মের অনুপ্রেরণা। মৃত্যু তাকে কেড়ে নিলেও, সেই বন্ধুর দেওয়া নাম ‘ভ্রমর’ এর মধ্যে সুপ্ত নিজেরই অস্তিত্ব যেন অতীত থেকে ফিরে এসে তৈরি করে এক দ্বন্দ্ব। অবশেষে সেই দ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে আসার কথা সরল অথচ মনোগ্রাহী ভাষায় বলেন গল্পকার।

অনিন্দিতা মণ্ডল তার ‘পুতুল’ গল্পে সহজভাষায় ব্যক্ত করেন যাদুবাস্তব। গায়ক পার্থর সঙ্গে চিত্রকর/ভাস্কর যীশুর বন্ধুত্বকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে কিছু নারী দাঁড়িয়ে থাকে শিল্পসৃষ্টির মায়াজগতের সাথে বাস্তবের সীমানা জুড়ে। এদের অস্তিত্ব পার্থর কাছে ইন্দ্রিয়াতীত মনে হয়, চিনেও চিনতে পারেনা। সবাইকে যেন যীশু বশ করে পুতুল বানিয়ে রেখেছে বলে মনে হয় তার। একসময় সে নিজেও একাকার হয়ে যায় যীশুর সৃষ্টির সাথে।

কৃষ্ণা দাস তার ‘গোপনীয়’ গল্পে বলেন দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনের চড়াই-উতরাইয়ের মাঝে থাকা এক নারী আদিরার কথা। সংসারে সবকিছুর সাথে মানিয়ে নিতে নিতে আদিরা হয়তো নিজের ভালোবাসাটুকুও চিনতে পারেনা। প্রতিশোধের গোপন খেলা কি তার নিজের সাথেই? স্বামী অরিন্দমের মাথার নিচের বালিশ ঠিক করতে করতে নিজেকেই সে আশ্বাস দিতে চায়, ‘ভালোবাসি না, একটুও না।’ মায়া জাগিয়ে শেষ হয় এই গল্প।

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় তার ‘পূর্বপুরুষ’ গল্পে বলেন আধুনিক সমাজের এক পুরুষের কথা, যে সবার নেতা হয়ে উঠতে চায় যেন আদিম পশুর দলের গোষ্ঠীপতির মতো। আধুনিক শিক্ষাদীক্ষা সত্ত্বেও মানুষ অতিক্রম করে উঠতে পারেনা জিনের মধ্যে গ্রথিত থাকা তার পূর্বপুরুষ শিম্পাঞ্জির প্রবৃত্তি। নেতা হবার জন্য সে এমনকি অন্য কাউকে খুন করে নিজের পথের কাঁটা পরিষ্কার করতে চায়। সমান্তরাল ভাবে চলতে থাকা টেলিভিশান চ্যানেলের স্টোরি এবং গল্পের নায়কের মনের দোলাচল শ্রোতাদের বিশেষভাবে স্পর্শ করে।

এই গল্পবৈঠকে ভিন্ন স্বাদের অনুবাদ গল্প নিয়ে এলেন জয়া চৌধুরী। এলেনা পনিয়াতৌস্কার স্প্যানিশ গল্প ‘পরিচয়’ পাঠ করে শোনালেন। সুন্দর পঠনভঙ্গিমায় শ্রোতারা সবাই যেন গল্পের নায়কের সাথে চাষির ট্র্যাক্টরে চড়ে সঙ্গী হলেন পাহাড়ের পথে। উপত্যকা পেরিয়ে গল্প পৌঁছায় এক উত্তরণের দিকে, যখন গল্পের নায়কের কাছ থেকে কোনও দান সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে, চাষি নিজেই তাকে একটা নাম দিতে চায়। কারণ, যে তার অন্তরের সম্পদে ঋদ্ধ, শুধুমাত্র সেই পারে কিছু দিতে।

থিওডোর স্টর্মের লেখা একটি জার্মান শিশুগল্পের অনুবাদ ‘হাবুলের ভ্রমণবৃত্তান্ত’ পাঠ করেন নন্দিনী সেনগুপ্ত। বেশি বেশি ঘুরে বেড়াতে গিয়ে হাবুলের ভারি বিপদ হয়েছিল, কাজেই অতিরিক্ত কোন কিছুই যে ভালো নয়, এই গল্প সেরকম এক নীতিশিক্ষার কথা বলে। এছাড়াও দেখানেপনা করতে গিয়েই হাবুল নিজের বিপদ ডেকে এনেছিল, অতএব দেখানেপনার বিরুদ্ধেও একটা বার্তা আছে এই গল্পে।

মিষ্টিমুখ এবং খোলা আকাশের নিচে আড্ডা-গানে শেষ হল গল্পবৈঠক। অনতিদূরেই গঙ্গার বহমানতার সঙ্গে গল্পের প্রবাহ নিয়ে ঘরে ফিরলাম আমরা । এবারের আসরের পরম প্রাপ্তি ছিল কণা বসু মিশ্রের উপস্থিতি, যিনি অন্তরঙ্গ ভঙ্গীতে তাঁর লেখক জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ভাগ করে, আলো করে রেখেছিলেন গবৈ। নিঃশর্ত বন্ধুত্বে জড়িয়ে থাকা গল্পবৈঠকের মানুষেরা সূর্যের অস্তরাগে মিশিয়ে মেখে নিয়েছিল এক আনন্দের গুলাল। গবৈ এগিয়ে চলুক এভাবেই বন্ধুদের গল্পহাত জড়িয়ে। 



প্রতিবেদন লিখলেন নন্দিনী সেনগুপ্ত

সোমবার, ২৮ আগস্ট, ২০১৭

"মিতালি"র আয়োজনে ষোড়শ গল্পবৈঠকে কিশোর গল্পপাঠ এবং লাইব্রেরী উদ্বোধন




ক্ষিণ কলকাতার কালিকাপুরের অক্সফোর্ড স্কুলের আঙিনায় বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা মিতালি-র আহ্বানে অনুষ্ঠিত হল গল্পবৈঠকের ষোড়শতম সাহিত্য বাসর।
মিতালি, একটি উজ্জ্বল প্রয়াস, যার লক্ষ্য নারী ও শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অপুষ্টি থেকে রক্ষা করা, এবং বঞ্চিত শিশুদের সাংস্কৃতিক সচেতনতা বৃদ্ধি।
এঁরা সুন্দর করে মঞ্চ সাজিয়েছিলেন।অতিথিদের আপ্যায়ন এবং মিষ্টি মুখের আয়োজন করেছিলেন, এবং ছোটদের বই পড়ার অভ্যাসকে এগিয়ে নিইয়ে যাবার জন্য , একটি গ্রন্থাগারের উদ্বোধন ও করলেন এই অনুষ্ঠানকে সংগে নিয়েই । গল্প বৈঠকের সদস্য এবং মাননীয় অতিথিরা প্রত্যেকেই কিছু বই উপহার দিয়ে অংশভাক হয়ে রইলেন এই আনন্দের মুহুর্তটির ।
মিতালি-র পক্ষ থেকে একটি উদ্বোধনী সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে সুরু করলেন সমগ্র অনুষ্ঠানটির ।


এরপর গল্প বৈঠকের অন্যতম আয়োজক শ্রীমতী ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় সঞ্চালনার ভার তুলে দিয়েছিলেন সপ্রতিভ মঞ্চশিল্পী, অনুবাদক, এবং সুবক্তা সাহিত্যিক জয়া চৌধুরীর হাতে। জয়া মঞ্চে আহ্বান করে নিলেন, আজকের আলোচক সাহিত্যশিল্পী অতিথিদের।প্রখ্যাত সাহিত্যিক রতনতনু ঘাটি, বিনতা রায়চৌধুরী,বুবুন চট্টোপাধ্যায় এবং মহাশ্বেতা রায়কে মিতালির সদস্যরা মঞ্চে বরণ করে নেবার পর, জয়া চৌধুরী স্ত্রোত্র পাঠের মধ্য দিয়ে শুভারম্ভ করলেন এই বৈঠকি আড্ডার ।
প্রথমেই জনপ্রিয় গল্পকার দীপান্বিতা রায় গল্প পড়লেন । গল্পের নাম, চেনা ঠিকানা । দরিদ্র ট্যাক্সি চালক আনোয়ার, আর তার পরিবারে, অবাঞ্চিত মাতৃহারা কন্যা লক্ষ্মী, কেমন সহজেই আপন হয়ে অকালে নিহত মেয়েটির স্থান পূর্ন করে, জেনে মনে মধ্যে মমতার ঢেউ ওঠে । লেখিকা অনায়াস দক্ষতায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি , মানবিকতা, কন্যা সন্তানের প্রতি আমাদের দায়িত্ব এই সব বড় বড় তত্ত্বকে বক্তৃতার মঞ্চ ঠেকে ঘরের উঠোনে নিয়ে এসেছেন। এই জল রঙে আঁকা ছবিটি বহুকাল মনে থাকবে।


বিখ্যাত সাহিত্যিক, শিশু সাহিত্যের দিকপাল শ্রী রতনতনু ঘাটি আলোচনা করলেন এ গল্পের। তিনি বললেন, এইটেই আজকের রূপ কথা। সত্যি তো  এ আমাদের ঘরের সিন্ডারেলার গল্পই বটে।আরও বললেন, সাহিত্য, বিশেষ শিশু সাহিত্যে মানুষের জয় হওয়া কতোটা জরুরি। শুনতে শুনতে মনে পড়ে গেল, “হোথা মাতৃহারা মা পাইবে চিরদিন---” কলমের জয় হোক ।
এরপরেই জয়া চৌধুরী ডাক দিলেন আমায়। অঙ্কের প্রতি ছোটদের আতঙ্ক, এবং তা কাটানোর জন্য আমার ছেলে মেয়ের সঙ্গে তাদের দাদু দিদার নানান মজার খেলা, সব বাচ্ছাদেরই চেনা লাগে। তাই ছড়ার নাম ছিল, সাত সতেরো । ছোট্ট শ্রোতাদের এক গাল হাসি, মন ভাল করে দিল।

এই ফাঁকে জয়া জানালেন গল্প বৈঠকের গোড়ার কথা। শ্রীমতী ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়, শ্রী অয়ন চৌধুরি, শ্রী নিলয়কান্তি বিশ্বাস কি ভাবে সাহিত্যের আদান প্রদানের জন্যেই গড়ে তুলেছিলেন এই আড্ডা।
গার্গী রায়চৌধুরী জানালেন ২০১২ থেকে মিতালির পথ চলার ইতিহাস।
এরপর জনপ্রিয় এবং রসিক লেখিকা তৃষ্ণা বসাক, কিশোর ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত গল্প রোবোর বাপের শ্রাদ্ধ গল্প ।  ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে রোবট সমাজ, মানুষের অভাব, অনুভূতি,প্রকৃতির সংগে আমাদের ক্রমবর্ধমান দূরত্ব কি সাবলীল হাস্যরসে মুড়ে উপহার দিলেন।এবং উপসংহারে  সময় সাঁতারুর ইলিশ আনার ছোঁয়ায় সব বাঙালি মাত।
কিশোর ই-পত্রিকার “ইছামতী”র সম্পাদক, সাহিত্যিক শ্রীমতী মহাশ্বেতা রায়, কল্পবিজ্ঞানের এই গল্পটির বিভিন্ন দিকগুলি ছুঁয়ে, আধুনিক জীবনে প্রযুক্তি ও আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে মনোজ্ঞ মতামত রাখলেন।

এরপর, ছড়াকার হিসেবে এলেন নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত। নিবেদিতা তাঁর অননুকরণীয় ভঙ্গীতে ছড়ার ছন্দে ছোটদের জানিয়ে দিলেন, বৃষ্টি হলে ছোট মানুষের কত অসুবিধে। তার কিত কিত খেলা, বাবার জলদি বাড়ি ফেরা, সব ভন্ডুল। খালি অঙ্ক টিউশানির দিন এলে ভারি সুবিধে।
এরপরে মঞ্চে এলেন শ্রীমতী ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় । তাঁর পুরাণ ছোঁয়া সরস রচনা, ভ্রমণ কাহিনী, উপন্যাস, রম্য রচনা বাঙালি পাঠকের বিশেষ পরিচিত।
ছোটদের জন্য তিনি নিয়ে এসেছিলেন গল্প, চিন্তামণি থটশপ। সেই দোকান যেখানে বুড়ো মানুষ চিন্তামণি বাবু, নানান রকম স্বপ্নের ক্রিস্টাল লজেন্সের মত বোয়েমে সাজিয়ে রাখেন। ল্যাবরেটরির বর্ননা, স্ট্যালাগমাইট, স্ট্যালাকটাইটের সৌন্দর্য, গ্লাস রডে গুলে যাওয়া স্বপ্নের রঙ, সব শেষে , অবিশ্বাসীদের থেকে দূরে স্বর্গের স্বপ্ন ছুঁতে চাওয়া একলা চিন্তামণি, সব মিলিয়ে এক সাতরঙা অপরূপ রামধনু। রসায়নবিদ লেখিকা নবরসের বেশির ভাগগুলিকেই সাজিয়ে দিয়েছেন এই আলোময় কাহিনীর মধ্যে।
আলোচনা করতে মঞ্চে সাহিত্যিক, সাংবাদিক বুবুন চট্টোপাধ্যায় তাই অবন ঠাকুর,লীলা মজুমদার এবং মানুষকে জিতিয়ে দেবার প্রসঙ্গ আনলেন। বললেন, “এমন কেন সত্যি হয়না আহা-”
পরবর্তী গল্প পাঠে এলেন বৈঠকের আরেক আয়োজক , সাংবাদিক , সাহিত্যিক অয়ন চৌধুরি । তিনি মনে করিয়ে দিলেন এ দিনটি মাদার টেরিজার পুণ্য জন্ম তিথি, এবং পথের পাঁচালি দিবস ও ।
তাঁর গল্পের নাম; স্বাধীনতা ।অবাঙ্গালি রঘুনাথ কুমারের মাতৃহীন ছেলে চতুর্থ শ্রেণীর ছোটুর ঘুড়ির সুতোর বায়না, তার বাবার জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান , আত্মসচেতন হয়ে ওঠা বাপ ও ছেলে , জীবন্ত হয়ে ওঠে শব্দ বিন্যাসে। অন্যাইয়ের সংগে আপোষ না করার স্বাধীনতা মিলে মিশে যায় ছেলের ইচ্ছেসুখে ঘুড়ি ওড়ানোর স্বাধীনতার সংগে।
আলোচনায় বিখ্যাত লেখিকা বিনতা রায়চৌধুরি প্রথমে বই এবং গ্রন্থাগারের প্রতি ভালবাসার কথা জানালেন। পরে বললেন , গল্পটি বড়দের জন্যেও কত উপযোগী ।
এরপর, জনপ্রিয় কবি সুস্মেলি দত্ত, ছড়া পড়লেন, উলট পুরাণ । ছন্দের জাদু খুশি করে দিল ছোট বড় সবাইকে।

চা সিংগারা সহ জলযোগের বিরতিতে, মিতালির ছোটরা সবার হাতে পৌঁছে দিল গোলাপ ফুল এবং নিজেদের হাতে বানানো অপুর্ব নান্দনিক কার্ড ।তারপর মঞ্চে এল মিতালির পরিশ্রমের ফসল। নীল সাড়ি , সাদা বন্ধনীর সাজে চার কিশোরী যে অপূর্ব মুদ্রা ও নৃত্যশৈলীতে নেচে গেল, “মন মোর মেঘের সঙ্গী –” অনেক খ্যাতিসম্পন্ন নাচের মহলকেও তা হার মানিয়ে দেবে। মুগ্ধ হলাম মিতালির এই কিশোর মানুষদের প্রতি যত্ন দেখে।


এরপর আবার গল্প। প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয় লেখিকা মহুয়া মল্লিক পড়লেন কল্প বিজ্ঞানের গল্প , গ্রিন প্রোজেক্ট ।রোবট অদ্রিজর চোখে মানব জীবন , প্রকৃতি , ভালবাসা , সব কিছুকে ছোঁয়ার আকুলতা, স্নেহের জন্য আর্তি, আমাদের মায়ায় ঢেকে দিল।
আলোচক শ্রী রতনতনু ঘাটি ও প্রশংসা করলেন গল্পটির ।
পরের বার মঞ্চে এলেন অন্যতম রসিক সাহিত্যিক , শ্রী রজতশুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ।তাঁর লেখার অনাবিল হাস্যরস এই সময়ের মানুষকে আনন্দে রাখে । আজকের লিমেরিক, “ আর পাগলামি নয়” ও সবার মুখে হাসি ফোটাল।
পরের গল্পকার , মউল পত্রিকার সম্পাদিকা , শ্রীমতী কৃষ্ণা দাস, কল্পবিজ্ঞানের গল্প শোনালেন।ভুন্ডুল আর গ্যামেটের আধ ঘণ্টা , গল্পটির কিছু অংশ পাঠ করে শোনালেন তিনি।
আলোচক মহাশ্বেতা রায়, জোর দিলেন ইংরাজি শব্দ কম ব্যবহারের ওপর, এবং কল্প বিজ্ঞান সব দেশের সাহিত্যেই কত বড় জায়গা নিচ্ছে, সেকথা ও জানালেন তিনি।
নতুন অতিথি তপশ্রী পাল, ছড়া পড়লেন, “ছিল রুমাল হয়ে গেল বেড়াল”।
কাগজ বিলি করা গরিব ছেলে বঙ্কুর জাদুদন্ড পেয়ে দারিদ্রকে হারিয়ে দেওয়ার গল্প ছন্দে গেঁথে শোনালেন তিনি।
সব শেষ গল্পটি এল জনপ্রিয় গল্পকার ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়, আমাদের অপূর্ব এক মিষ্টি গল্পের জলছবিতে ফিরিয়ে নিইয়ে গেলেন মাটির কাছে, শিকড়ের টানে।বাবান ও হাঁসের ছানা – গল্পটি মুগ্ধ করল ছোট বড় সবাইকে। সহজ ভাষায় প্রকৃতি জীবন সব ধরা পড়ল তুলিতে আঁকা ছবির মত গদ্যে।
বুবুন চট্টোপাধ্যায় আলোচনায় বললেন এ গল্পের মাটির গন্ধ, মরমী দৃষ্টিভঙ্গীর কথা।
এরপর উপস্থিত সকলে নতুন লাইব্রেরীটির জন্য কিছু বই দিলেন। এবং কচিকাঁচাদের হাতে বই তুলে দিয়ে লাইব্রেরীর উদ্বোধন করলেন মাননীয় শিশু সাহিত্যিক রতনতনু ঘাটি।
শেষে অতিথি সাহিত্যিক শ্রী রতনতনু ঘাটি শোনালেন তাঁর মফস্বল ঠেকে এসে কলকাতা শহরের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে ওঠার গল্প।
মিতালির মিষ্টিমুখের আয়োজন সমাপ্ত করল এই সুন্দর সাহিত্য সন্ধ্যাকে।   



প্রতিবেদন লিখেছেন সোনালী

বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৭

" রিয়েল ভার্সেস ডিজিটাল আড্ডা " এই বিষয়ে কি মত তোমাদের?

সেদিন হঠাত মনে পড়ে গেল আমাদের পুরোণো বাড়ির দালানে বসে একজোট হয়ে তুতো ভাই বোনেদের সঙ্গে জমিয়ে কাঁকড়ার ঝাল দিয়ে ভাত খাওয়ার কথা। কাঁকড়ার সুস্বাদু দাঁড়া চিবোতে চিবোতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যেত। হাতের এঁটো হাতেই শুকিয়ে যেত তবু যেন আড্ডা ফুরতো না। কিসের এত আড্ডাই বা ছিল? কেন ই বা এত গল্প জমে থাকতো জানিনা বাপু। একটা কারণ অবিশ্যি নিয়মিত দেখা না হওয়া। সকলেই ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় থাকতাম। কোনো এক ছুটির দিনে একজোট হয়ে খাওয়াদাওয়া, হৈ হুল্লোড়ে মেতে উঠতাম সকলে মিলে। মাংসের হাড় নিয়েও কাঁকড়ার মত অবস্থা হত আমাদের। আর খাওয়ার পর হাত চাটা যেন শেষ ই হত না। চাটনীতে আঙুল ডুবিয়েই চলেছি আর গল্পের গোরু গাছে উঠে আমাদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। তখন কি আর জানি বাপু যে এই আড্ডা গিয়ে থমকে যাবে একদিন? এই গোলগল্প গুলো আছাড় খাবে  ফেসবুকের চৌকাঠে? তাহলে আরেকটু নাহয় আড্ডা দেওয়া যেত। ঠিক তেমনি মনে পড়ে কলেজ কেটে কফিহাউসের আড্ডার কথা। কবিতায় কথালাপ, হেঁয়ালির ছটা, মজার জোকস বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নেবার আনন্দ। এই বাস্তব আড্ডার ঠেক এখন সোশ্যালনেটের এক চিলতে নীল অলিন্দ। আর সেখানে নিজের চেনা পরিচিত তুতো ভাইবোনরা যেমন আছে, আছে স্কুল কলেজের বন্ধুরা আর আছেন অপরিচিত কিছু বন্ধুবান্ধব ও। তবে তথাকথিত আড্ডার বাতাবরণ কি মেলে এই ডিজিটাল গল্পের আড্ডাখানায়? সেখানে কি সম্পর্কের বেড়াজাল পেরিয়ে আলাপচারিতা ধাক্কা খায়? না কি  সম্পর্কের টানাপোড়েন কে উপেক্ষা করে নিমেষেই উবে যায় কর্পূরের মত। অথচ ফেসবুকের মত প্ল্যাটফর্মে কোটি কোটি মানুষ অহোরাত্র আড্ডা দিয়েই চলেছেন। 

তাহলে কি দাঁড়াল? 

হাতের মুঠোয় স্মার্টফোন অথবা ল্যাপটপে কিম্বা ট্যাবের চ্যাটালাপই টিঁকে থাকবে? আর  মুখোমুখি বসে বাস্তব আড্ডাগুলো হারিয়ে যাবে সুপর্ণকান্তি ঘোষের সেই অমোঘ লিরিক্সের মধ্যে দিয়েই?  "কফিহাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, আজ আর নেই " বলে আমরা স্কাইপে, হোয়াটস্যাপে, ফেসবুকে চেঁচাতেই থাকব? 

এ বারান্দা থেকে ও বারান্দায় কাপড় তুলতে তুলতে কিম্বা শীতের রোদে বড়ি দিতে দিতে, অথবা ছাদে চুল শুকোতে গিয়ে কেউ কারোর মুখও দেখব না আর জিগেসও করব না? কেমন আছো গো? আজ কি রান্না হল তোমার হেঁশেলে? অথবা চলো না ঐ সিনেমার টিকিটটা কাটি।  
রোয়াকের আড্ডাও অপ্রতুল এখন। নেই সে রোয়াক ওলা বাড়ি, নেই সেই আড্ডাবাজ তরুণ তুর্কীরা। তা অবিশ্যি ভালোই একদিক থেকে। তরুণেরা কাজে ডুবে থাকাটা দেশের পক্ষে মঙ্গলজনক। আর যে তরুণরা এখনো বেকার হয়ে ফ্যা ফ্যা করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে জটলা করে তারা কি বোঝে সোশ্যালনেটের মাহাত্ম্য? অগত্যা রাস্তাই ভরসা তাদের আড্ডা দেবার জন্য। কিন্তু সেটাও তো ঠিক নয়। নব্য প্রযুক্তির কাছে আবালবৃদ্ধবণিতা যখন হার মানেনি তারাই বা কেন স্মার্টফোন খুলে ফেসবুকে বন্ধুর মুখ দেখবে না? সেটা বরং ক্ষতিকর সমাজের পক্ষে। 

কি মনে করছে লোকজন? ব্যাঙের ছাতার মত কফির ক্যাফে হয়েছে আজকাল। তবুও সেখানে গিয়ে বন্ধুরা জমায়েত হয়ে নিজের নিজের স্মার্ট ফোন খুলে ফেসবুক খুলে বসে আছে। অথবা হোয়াটস্যাপে আলাপ চালিয়েই যাচ্ছে। কফির পেয়ালা পানতা হয়ে যাচ্ছে। বেয়ারা বিল মিটিয়ে চলে যাচ্ছে কিন্তু প্রকৃত আড্ডা যেন মুখ লুকোচ্ছে সেখানেও ।
সেই নিয়েই পক্ষে ও বিপক্ষে অলোচনা হোক! জমে উঠুক শারদীয়া চক্র বৈঠক ! কমেন্ট বক্সে লেখা পোস্ট করুন!

সোমবার, ১৭ জুলাই, ২০১৭

পঞ্চদশ গল্প বৈঠকে ১৫ জনের গল্প পাঠ


ল্পবৈঠকের পঞ্চদশ আসর বসেছিল শেষ আষাঢ়ের এক মন কেমন করা বিকেলে, দক্ষিণ কলকাতার পাটুলি অঞ্চলে । না, কোন বাঁধাধরা সভা কক্ষে নয়, “নেশা’স কিচেন” নামে এক রম্য নিরিবিলি রেস্তোরায় আমন্ত্রিত হয়ে। শব্দসীমা বেঁধে রাখা অথচ টানটান সংবেদী গল্প পরিবেশনই সাধারণত এই বৈঠকের উদ্দেশ্য। সাথে অবশ্যই থাকে নির্ভেজাল আনন্দে ঘেরা মেধাবী আড্ডা। এবারের গল্পের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল সম্পর্ক। শুরুতেই স্তোত্রপাঠ করে শোনালেন কবি, স্প্যানিশ ভাষায় দক্ষ সাহিত্যজীবি জয়া চৌধুরি। নিমেষেই বাণিজ্যিক রেস্তোরাটি আমূল বদলে গিয়ে হয়ে উঠল এক পরিশীলিত সাহিত্য-সভা। আর তাতে বিশেষ মাত্রা সংযোজন করতে এগিয়ে এলেন গল্পকার ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, উৎপল কুমার বসুর স্মরণযোগ্য বর্ষার কবিতা এবং জয় গোস্বামীর মুক্তগদ্য জলঝারি থেকে পাঠে বৈঠকটি আশ্চর্য, সপ্রাণ গতিতে সঞ্চালিত হতে লাগল। চোদ্দটি ছোট গল্প আর একটি ভীষণ মন ছোঁয়া শৈশব স্মৃতিকথার আবহে সময়ের দোলাচল সে ঘরে টের পাওয়া গেলনা। মেধায়, মননে, প্রতিভার বহু স্বরে সম্পর্ক নামক এক অমোঘ জীবনব্যাপী সঙ্গতা নিয়ে আমরা বুঁদ হয়ে শুনলাম গল্পগুলি। সম্পর্কের মাঝে সম্পর্কহীনতার গল্পও প্রবলতর দাবি নিয়ে এগিয়ে এল। আসলে অভাব না থাকলে স্বচ্ছলতা কে যে ঠিকঠাক চেনা যায়না। এদিনের গল্পের আলোচনায় ছিলেন সাহিত্যিক কাবেরী  রায় চৌধুরী।




আসরের প্রথম গল্পটি পড়লেন এদিনের অতিথি গল্পকার সুবীর বোস। 
গল্পের নাম অনন্ত কুয়াশা।মানুষের ব্যক্তিগত যাপন চিত্রে কত যে বিচিত্র বিষয় লগ্ন থাকে ! মানসিক মেদুরতা, রহস্য ভরা ঘটনা থেকে শুরু করে গভীর গোপন কত যুদ্ধ-- বলিষ্ঠ ভাষায় লেখক জানিয়ে দিলেন,স্বল্প পরিসরে গল্প কত তীক্ষ্ণ সূচীমুখ হয়ে উঠতে পারে। ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প বিষম এর পটভূমি বেশ সাম্প্রতিক এবং চিরকালীন। ধর্ম পরিচয় গোপন করা এক গৃহ পরিচারিকার অকপট সত্য ভাষণ, কি ভাবে যে সংশয়-দীর্ণ সভ্য তথা শিক্ষিত মানুষকে দ্বন্দ্ব ও অসহায়তার অতল গহ্বরে পৌঁছে দিতে পারে, সে কথা লেখক বড় যত্ন নিয়ে তুলে ধরেছেন।



কৃষ্ণা রায়ের গল্প পিতৃপ্রতিম এর বিষয়বস্তুতে তেমন চমক নেই, আছে সন্তানের জন্য চিরকালীন, সীমাহীন, অযৌক্তিক স্নেহের বেদনাঘন আবহ । স্বেচ্ছায় অকরুণ হয়ে এক সফল প্রতিষ্ঠিত পুত্র-সন্তান লোক সমক্ষে নিজের অসফল বাবাকে “বাপের বয়সী বিরক্তিকর মানুষ” বলে চিহ্ণিত করলেও কাঙাল পিতৃহৃদয় সেই টুকু সবীকৃতিকেই পরম প্রাপ্তি বলে আঁকড়ে ধরেন। আমাদের শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া দাবি করে মনোযোগ কখনো এক নাগাড়ে স্থায়ী হতে পারেনা। তাই প্রয়োজন হয় ক্ষণিক বিরতির। এই বৈঠকে গল্প দিয়েই ইন্দ্রিয়দের শাসন করা হয়।আর এ তো জানা কথা, যথেষ্ট ভারী বিষয়বস্তুও রচনার প্রসাদ গুণে স্নায়ুর চাপ নামিয়ে দেয়।


রজতশুভ্র বন্দোপাধ্যায়ের আঁতলামো ও মাতলামো শুনে শ্রোতা বন্ধুরা প্রাণ খুলে হাসলেন। দুই সম্পূর্ণ বিপ্রতীপ বিষয়কে নির্বাচন করে রম্যতা, হাস্যরস, চমক, শ্লেষ, সমকালীন নাগরিক জীবন এর মিশেল দিয়ে কী স্বচ্ছন্দ গদ্য যে লেখা যায়, রজতশুভ্রের লেখা যারা পড়েছেন বা শুনেছেন, সে কথা তারা স্বীকার করতে বাধ্য। জয়া চৌধুরি বরাবরই গল্প অনুবাদের ক্ষেত্রে বিষয়-বস্তুটিকে প্রাধান্য দেন। এবারেও ব্যতিক্রম হয়নি। বলিভিয়ার এক লেখকের স্প্যানিস ভাষার গল্পের অনুবাদ, বন্ধ দরজা শিরোনামের গল্পটির প্রতিটি পর্বে চমক পাঠক-শ্রোতাদের এক মুহূর্তের জন্য অন্যমনস্ক হতে দেয় না। চূড়ান্ত পর্বে বাবা-মেয়ের এক বিচিত্র সম্পর্কের সামনে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হতেই হয়।

বুবুন চট্টোপাধ্যায়ের সম্পর্ক গল্পে স্থায়ী দাম্পত্যের চেনা অন্বয় ও সমীকরণ অনায়াসে গল্পটিকে পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে যায় । নিজস্ব মানুষটির মধুমেহ রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর জেনে সদা সমালোচক ঝগরুটে স্ত্রী রসকলির উদ্বেগ উপভোগ করে হারাণ। স্ত্রীর কোমল , মমতাময় আচরণের পালাবদলের উৎসে যে রয়ে গেছে অর্থনৈতিক ভাবে পরাধীন মানুষের আমূল নির্ভরতা, তারই তাগিদে হয়তো বা দীর্ঘ দাম্পত্যে মধুর বাতাবরণ তৈরি হতে অসুবিধে হয়না। জীবনের এক ধূসর সত্য এ গল্পে সহজ ছন্দে উঠে এসেছে। টানটান মেদহীন গল্প উপহার দিয়েছেন পারমিতা মুন্সি তার অসম্পর্কের গল্পে। নব পরিণীতা অতীব সুন্দরী স্ত্রী যে আদতে অজস্র সম্পর্কে লগ্ন থাকা ছদ্মবেশী আই এস আই গুপ্তচর, সে কথা জেনেও প্রেমাকুল স্বামীর সংশয় যায়না। বিচার ব্যবস্থাকে অবজ্ঞা করে প্রতারক স্ত্রী আত্মঘাতী হলেও সবামী তার অন্ত্যষ্টিক্রিয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ গল্প কি সত্যিই অসম্পর্কের? নাকি সমাজ-মান্য সংলগ্নতাকে উপেক্ষা করে শাশ্বত জীবন-লগ্নতার দলিল?

সুগত চৌধুরির ছেঁড়া চিঠি এক বহু চেনা হৃদয় রেখার কাহিনী, বুদ্ধ পূর্ণিমার রাতে বৃদ্ধাশ্রমে থাকা দুঃখিনী মায়ের লেখা চিঠি, মেরুদন্ড হীন পুত্র গৌতমকে তার জন্মদিনে। আপাত ভাবে চেনা ছকের গল্পের মধ্যেও হয়তো বা রয়ে গেছে আরেক যোগসূত্র। ভগবান বুদ্ধ ঘর –সংসার ছেড়ে পথে নেমেছিলেন জীবনের বিচিত্রতার সাধনায়। আর আধুনিক যুগে সংসার থেকে বিতাড়িত মায়েরা বৃদ্ধাশ্রমে বাস করে জরা-ব্যাধি-মৃত্যু- ইত্যাদি নশ্বর জীবনের যাপন কথার অমোঘ বার্তাটি হৃদয়ঙ্গম করেন।এ বার্তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলে । বেশ উপভোগ্য ও স্মরণযোগ্য গল্প। শাশ্বতী সরকারের অমরত্বের খোঁজে গল্পের পরতে পরতে সম্পর্কের জটিল বুনন এসেছে সহজ ভাষায় । জীবনে তেমন কিছু না হয়ে ওঠা ভিকি হতাশা থেকে মুক্তি খোঁজে অনর্গল স্বপ্নচারণে, তার অবচেতন মনলোক ধর্ষক বাবার বিরুদ্ধে প্রতিশোধের উপায় খোঁজে, আকাঙ্খা করে মাতৃজাতির প্রার্থিত সম্মান । এভাবেই সে খুঁজে চলে জীবনের জ্যোতিঃলোকের পথ।

তমালি রায়ের মানুষ হিন্দু-মুসলমানের নিটোল সম্প্রীতির গল্প। এ ধরণের গল্প যত বেশি লেখা হবে, আমাদের জনমানস গোঁড়া ধর্মীয় বাতাবরণ থেকে মুক্ত হয়ে তত বেশি যুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে।

ঋণী গল্পে ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় বেশ ঝরঝরে ভাষায় তুলে এনেছেন সম্পর্কের এক ভিন্নতর বাঁক । মানুষের ব্যক্তিগত যাপন চিত্রের কত শত খুঁটিনাটি অস্তিত্বের খোঁজ সব সময় রাখা যায় না, রাখলেও সংশয় থেকেই যায়। এ গল্প এক হারিয়ে যাওয়া জৈবিক (বায়োলজিক্যাল) পিতা ও আরেক একক মায়ের ছেলের জীবন কথা। পিতা পুত্রের সম্পর্কে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা কিন্তু চিরকালীন মানবীয় আবেগের দাবি কিংবা অন্বয়টি কে অস্বীকার করতে পারেনা। গল্পের এই মর‍্যাল মনে করিয়ে দেয় সাহিত্যচর্চার মহত্তর লক্ষ্য আসলে অফুরান জীবন রসের নিবিষ্ট সাধনা এবং মানব-কল্যানের নব দিগন্ত ।

বাবা–মেয়ের সম্পর্কের দ্বন্দ্ব-জটিলতা নিয়ে গার্গী রায়চৌধুরীর সম্পর্ক গল্পটি বস্তুত একটি সুদূরপ্রসারী গল্পের অভিমুখ। প্রার্থিত পরিণতির প্রত্যাশা থেকেই যায়। প্রান্তিক মানুষের জীবনে নির্বীজ-করণের মত বাস্তব অথচ ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে গল্প খুব কম লেখা হয়েছে। কৃষ্ণা দাসের নির্বীজ গল্পটি সেই হিসেবে বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। শিক্ষিত, সুভদ্র নাগরিক যেখানে নিজের জৈবিক দৈন্যের বিষয়টি এড়িয়ে দাম্পত্য পর্ব টিকেই স্বীকৃতি দিতে অপারগ হয়, অন্ত্যেবাসী, শ্রমজীবি মানুষের চেতনা সেখানে স্বাভাবিক জীবন বোধে অনায়াসে অতিক্রম করে যায়। প্রচলিত সমাজমান্যতার ছক উপেক্ষা করে নিজের পুরুষত্বকে বাজি রাখতে তার দ্বিধাহীনতাকে তখন বাহবা না দিয়ে পারা যায়না।

 গল্প শুনতে শুনতে শ্রোতার আত্মশক্তি যে সপ্রাণ হয়ে ওঠে সোনালির শায়িত বুদ্ধ গল্পটি না শুনলে বিশ্বাস করা কঠিন হত। অসাধারণ কিছু শব্দ বিন্যাস দিয়ে ঘেরা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি উদ্বোধনের গল্পটি বহু কাল মনে থাকবে।

আসরের শেষ পর্বে মহাশ্বেতা রায় শোনালেন ফেলে আসা ছেলেবেলায়, মা ভাই, প্রতিবেশী , বন্ধুদের সান্নিধ্যে ঝুলন সাজানো দিনের স্মৃতি। সেই সব ভাল লাগার উৎসব আধুনিক নাগরিক জীবন থেকে নিছক অবহেলায় হারিয়ে গেছে।মহাশ্বেতা রায় তার অনুপম গদ্যে, প্রায় রূপকথার ভাষায় তুলে আনলেন সেই মহার্ঘ কিছু দিন। আর সেই হারিয়ে যাওয়া ঝুলন উৎসব পালনের আনন্দের রেশ আমরা সবাই সারা অস্তিত্বে মেখে নিলাম। পৌঁছে গেলাম আমাদের অগম্য শৈশবের সোপানে, মনে পড়ে গেল সেই সব দিনের অজস্র অনাবিল সম্পর্কের কথা।



পনেরো জন গদ্যকারের স্বরচিত গল্পপাঠে পঞ্চদশ গল্পবৈঠক নিটোল পূর্ণতা পেল আরো দু’জনের সান্নিধ্যে। নেশা’স কিচেনের পক্ষ থেকে সাহিত্যপ্রেমী দীপা চ্যাটার্জীর আন্তরিক আপ্যায়ন এবং সেদিনের আসরে পঠিত গল্প নিয়ে বিশেষ অতিথি সাহিত্যিক কাবেরী রায় চৌধুরির খোলামেলা, অন্তরঙ্গ আলোচনা ছিল দিনের বাড়তি প্রাপ্তি । শর্তহীন স্নিগ্ধতায় এই দুই নারী গল্প বৈঠকের প্রতিটি সদস্য ও বন্ধুদের মানবিক সম্পর্কে জড়িয়ে নিলেন। গল্পবৈঠকের যাত্রাপথ এগিয়ে চলবে আরো কয়েক শতক আসরের লক্ষ্যে ।


কৃষ্ণা রায়