শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৯

বর্ষশেষের গল্পবৈঠক ২৯


৪২৫  বাংলা বর্ষশেষের দিনটিতে সাহিত্যিক শ্রীমতী সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিউটাউনের গৃহে তাঁর আন্তরিক আতিথ্যে জমে উঠেছিল উনত্রিশতম গল্প বৈঠকের আসর।শুরুতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরমূর্ছনায় আসরের মূল সুরটি বেঁধে দেন সুগায়িকা শ্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর একে একে গল্প ও কবিতাপাঠে বৈঠকী মেজাজটি জমে ওঠে।

সেদিনের স্বরচিত গল্পপাঠে ছিলেন ন'জন। পূর্বা মুখোপাধ্যায়, দ্বৈতা গোস্বামী,সাবিনা ইয়াসমিন,মহুয়া মল্লিক,দীপা চ্যাটার্জী,সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়, যশোধরা রায়চৌধুরী, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়,ও সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের টানটান গল্প ‘আফটারম্যাথ’, সাবিনা ইয়াসমিনের ‘আহারে জীবন’, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের ‘ব্যাভিচারিনী’, মহুয়া মল্লিকের ‘শঙ্খলাগা’, পূর্বা মুখোপাধ্যায়ের ‘বীরত্ব’,সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জননী’,আর যশোধরা রায়চৌধুরীর ‘তরিবৎ’ যেন এই পরিবর্তিত সময়ের সমাজজীবনের নানা রূপ,নানা মুখ নিয়ে গড়ে ওঠা বিচিত্র সব সম্পর্কের রূপকথা। সেদিনের গল্পপাঠের আসরে হঠাত উপস্থিত দ্বৈতা গোস্বামীর ‘প্রবোধবাবুর বাবা’ বা দীপা চ্যাটার্জীর ‘শ্রীময়ী আদর সমীরণ’ ছিল রম্যগল্পের সার্থক পরিবেশন।

পরিবেশটি আরো সমৃদ্ধ হয় কবি সুতপা সেনগুপ্ত, কাবেরী গোস্বামী এবং বুবুন চট্টোপাধ্যায়ের একাধিক কবিতাপাঠে। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে তাদের কবিতাপাঠ খোলা জানলার মুক্ত বাতাসের স্নিগ্ধতা বয়ে আনে।

সবমিলিয়ে এবছরের শেষ গল্পবৈঠকটি যেন আগামী বছরের নতুন কলমে নতুন কালির শুভ সংযোজন হয়ে উঠল।   

প্রতিবেদনঃঃ সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

রবিবার, ৩১ মার্চ, ২০১৯

গল্পবৈঠক ২৮ @ সাঁইথিয়া, বীরভূম

আনন্দবাজার পত্রিকা
০১৯ এ গল্পবৈঠকের মুকুটে আরেকটি পালক সংযোজিত হল। গত ২৩শে মার্চ বীরভূমের সাঁইথিয়া শহরে শশীভূষণ দত্ত বালিকা বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হল গল্পবৈঠকের ২৮তম সাহিত্যবাসর। ২০১৬র হুগলী জেলার উত্তরপাড়ার পর এই নিয়ে দ্বিতীয়বার পশ্চিমবঙ্গের কোনও জেলায় আয়োজিত হল এই গল্পপাঠের আসর। কলকাতা থেকে হাজির হয়েছিলেন গল্পকার ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। সাঁইথিয়ার গল্পকার সুজাতা রায়ের তত্ত্বাবধানে অন্য্যন্য গল্পকারেরা ছিলেন মিলি মজুমদার, ব্রততী মন্ডল রায়, ঝিমকি বন্দ্যোপাধ্যায়, মিতালী দাস গোস্বামী, সুনেত্রা সাধু এবং সৌমী সিংহ । সমগ্র অনুষ্ঠানটি সুচারু হস্তে সঞ্চালনার দায়িত্ত্বে ছিলেন কবি, লেখক, নাট্যকার শ্রী বিজয় কুমার দাস। শনিবারের দুপুরে মধ্যাহ্নভোজের পর সুখনিদ্রায় ডুব না দিয়ে হাজির হয়েছিলেন সাঁইথিয়ার অজস্র মানুষ, যারা বাংলা ছোটগল্প শুনতে ভালোবাসেন।  
বিজয়কুমার দাস

বিজয়কুমার দাস অনুষ্ঠানের শুরুতেই বললেন সাঁইথিয়ার হারিয়ে যাওয়া ব্যাবসা বাণিজ্যের ঐতিহ্যের কথা। আর সেই লক্ষ্মীর হাত ধরেই এই অঞ্চলের মানুষ এখানে সরস্বতী বন্দনায় ব্রতী হতেন বহু যুগ আগে থেকেই। তাই সারস্বত চর্চায় বীরভূমের সাঁইথিয়া শহরের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। গ, ল আর প নিয়ে গল্প শব্দটির তাত্পর্য ব্যখ্যা করলেন তিনি। গ এর অর্থ গল্পের গমন, ল এর অর্থ লিখন এবং প এর অর্থ হল পঠন। তাই একজন গল্পকার কিভাবে গল্পের জ্বাল বুনছেন এবং কেমন তার বিন্যাস আর সর্বোপরি পাঠক বা শ্রোতা কেমন ভাবে তা নিচ্ছেন সেটা জানা বোধহয় সবচেয়ে প্রয়োজন গল্প লিখিয়েদের। একটি পাঠযোগ্য গল্প একজন পাঠক বা শ্রোতার কাছে গ্রহণযোগ্য হলেই সেই গল্প লেখার সার্থকতা। 
সৈয়দ হাসমত জালাল

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কবি, লেখক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসমত জালাল। স্বাগত ভাষণে শ্রীমতী সুজাতা রায় অনুষ্ঠানের মূল সুরটি বেঁধে দেন এবং তাঁকে অনুসরণ করেই এক অত্যন্ত আন্তরিক এবং অনাড়ম্বর পরিবেশ রচিত হয়ে ওঠে। স্বরচিত প্রতিটি গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র নারী। সমাজের প্রত্যন্ত স্তর থেকে শুরু করে মফঃস্বল এবং শহরের আধুনিকা নারীদের মনস্তাত্বিক এবং সামাজিক ওঠাপড়া কে ঘিরে আটটি ছোটগল্পের মনোজ্ঞ আলোচনা করেন সভাপতি সৈয়দ হাসমত জালাল। বলাই বাহুল্য তাঁর এই সাবলীল আলোচনা অনুষ্ঠানটিকে বিশেষ মাত্রা দেয়।কানায় কানায় উপচে পড়া শ্রেণীকক্ষে শব্দ বলতে শুধু ছিল চৈত্রের ঝরাপাতার খসখস আওয়াজ আর মাঝেমধ্যে ছিল ইতিউতি কোকিলের কুহুতান। শুধুমাত্র বাংলাভাষাকে ভালোবেসে গল্প শুনতে আসা এমন নিমগ্ন শ্রোতা যেকোনো অনুষ্ঠানের গর্ব। সাঁইথিয়াবাসীর কাছে সেই কৃতজ্ঞতার কথা জানাতে ভোলেন নি ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। 



কবি হাসমত জালাল বললেন, "আমরা যারা পুরুষ রচিত সাহিত্য নিয়ে চর্চা করে নিজেদের সাহিত্যমনস্ক করে তুলি তাদেরো বিস্মিত হতে হবে প্রত্যেক নারীর রচনা শুনলে বা পড়লে। প্রতিটি গল্পে নিম্নমধ্যবিত্ত মধ্যবিত্ত থেকে এবং উচ্চবিত্ত মেয়েদের কথা উঠে এসেছে। গ্রামীন মানুষদের কথা বাদ দিয়ে সাহিত্য রচনা করলে একধরণের আত্মপ্রবঞ্চনা হবে বলে আমার মনে হয়। অধিকাংশ গল্পের মূল চরিত্র একজন নারী। গ্রাম্য মানুষ হয়ে তাদের যে সংবেদনশীলতা, মানবিকতা সেগুলি যেমন সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে তেমনি শহুরে মানুষদের চরিত্র চিত্রায়নেও সফল গল্পকারেরা। 

মিতালী দাসের চিঠির আঙ্গিকে লেখা "অর্ধেক আকাশ" গল্পটিতে শাশুড়ি বৌয়ের কথোপকথন উঠে আসে। সমাজের বহু চর্চিত বিষয়। নারী নিজের অজান্তে পুরুষতন্ত্রে বড় হতে হতে নিজেদের হাতে ক্ষমতা তুলে নেয়। সেই জেরে অমানবিক হয়ে পড়ে শাশুড়ি বীণাপাণি দেবী । হয়ে ওঠেন তাঁর সংসারের চিরন্তন ক্ষমতার কন্ঠস্বর।তিনি নিজে নারী হয়েও ভুলে যান যে তাঁর বৌমাও একজন নারী। তাকে প্রথম কন্যাসন্তান নষ্ট করতে বাধ্য করেন এবং দ্বিতীয় সন্তানটিও কন্যা হয়ে আসে আবারো। এবং সেখানেই গল্পের আসল মোচড়। এবার বৌমাটি মনে করছে এই দ্বিতীয় কন্যাটি‌ই ভবিষ্যতে শাশুড়িকে শিক্ষা দেবে এবং তার মনোস্কামনা পূর্ণ করবে। তার মানবিকতা দিয়ে হয়ত সে পূর্বনারীকে জয় করতে পারবে।     
পরের গল্পটি ব্রততী মন্ডল রায়ের "অভিশাপ" অত্যন্ত কঠিন, নির্মম বাস্তবতার কাহিনী।  দিন আনা দিন খাওয়া ঝুপড়িবাসীকে কেন্দ্র করে।
তাদের ঘরের মেয়েরা অভাবের তাড়নায় বড় হয়ে রোজগার করে আনে। বাড়ির লোকেরা জানতেও পারেনা কি করে সংসারে এত টাকা আসছে। ভালোই তো মেয়ে টাকা রোজগার করে আনছে। তারা বুঝতেও পারেনা সেই মেয়েকে একদিন বিয়ের নাম করে বয়স্ক পাত্রের হাতে তুলে দেয় কেউ। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে সে একদিন বিক্রী হয়ে যায়। দেহ ব্যবসায়ী হয়ে যায়। বাড়ির লোকেরা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনা। বেচারা, নিরীহ মেয়েটি বুঝতেও পারেনা তার জন্য কি অপেক্ষা করে আছে। সেখানে তার দেহের ওপর অমানবিক নির্যাতন হবে, যা ছিল মেয়েটির কল্পনার অতীত। ক্লাসরুম উপচানো উপস্থিত প্রত্যেকে যে গল্প মন দিয়ে শুনেছেন সেটাই গল্পবৈঠকের পরম প্রাপ্তি। লেখক এবং শ্রোতার মধ্যে এই নিবিড় সম্পর্ক আমাকে মুগ্ধ করেছে।  আমি নিজেও খুব আশ্বস্ত বোধ করছি বাংলাসাহিত্য, বাংলাভাষায় রচিত ছোটগল্প নিয়ে।
সৌমী সিন্‌হার গল্প "পিছুটান" সেখানে প্রধান নারী চরিত্রটি যার নিজের খাবার সামর্থ্য নেই সে পরিচারিকার কাজ করে । তার কাজের বাড়িতে পোষা বেড়ালটি বাড়ি ফেরেনি তিনদিন ধরে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আজকাল বড়োই কৃত্রিম। সেখানে পোষ্য বেড়ালটির প্রতি তার মমত্ববোধ, সংবেদনশীলতা অপূর্বভাবে ফুটে উঠেছে। সবচেয়ে ভাল লাগে শেষের অংশে যখন বেড়াল টি ঢাকা দেওয়া খাবার খেয়ে নেয়। মেয়েটির মন ভরে ওঠে কানায় কানায়।   

মিলি মজুমদারের গল্প "আতঙ্ক" তেও ছ 'বছরে মাতৃহারা মেয়ে গঙ্গার বিয়ে হল চব্বিশ বছরে। তাঁর পুত্র সন্তান হয়নি বলে বিচ্ছেদ ঘটেছিল। সেই গঙ্গাকে ধর্ষণ করে কেউ। আর পরে যখন তাঁর পুত্র সন্তান হল দেখা গেল সবাই তাকে লক্ষ্য করতে থাকে জমিদারের পুত্রর সঙ্গে সেই পুত্রের সাদৃশ্য দেখে । খুব বাস্তব চিত্র। যুগে যুগে দেখা যায় এমন ঘটনা। সমাজের তথাকথিত নিম্ন বর্গের মানুষ বড়লোকদের কাছে অস্পৃশ্য। কিন্তু তাকে স্পর্শ করে পুরুষের কামনা চরিতার্থ করার বেলায় সে আর অছ্যুত থাকেনা। বাধা থাকেনা তাকে ছুঁতে। এমনই সমাজের পরিহাস।

 ঝিমকি বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প "করমটিলার ইতিকথা" এক প্রত্যন্ত গ্রাম্য নারীকে কেন্দ্র করে যাকে দেবীজ্ঞানে পুজো করা হয়। ময়ূরাক্ষীর তীরে জঙ্গলাকীর্ণ করমটিলার হতদরিদ্র ভল্লা পরিবারে হঠাত করে আগত এক যুবতীকে সেই গ্রামের মেয়ে মরদ হাঁড়িয়ার ঘোরে তাকে দেবীজ্ঞানে পুজো করতে থাকে। মূহুর্তেই সেই যুবতীর মানবী থেকে দেবীতে উত্তরণ ঘটে।পুণ্য সঞ্চয়ের আশায় সবাই সেই দেবীকে কাজে লাগাতে চায়। দেবী রোগের উপশম করেন। বিশ্বাস জন্মায় সকলের। গোটা গ্রামে সবাই দেবীর মাহাত্ম্য অনুভব করে। সবাই জয় দেয় দেবীর নামে। দেবীর প্রতিপত্তি বাড়ে। ভক্তদের আনুগত্যে দেবীর অভাবও ঘোচে। হঠাত বর্ষার আগমনে ময়ূরাক্ষীতে বন্যার আশংকা। বাঁধ ভেঙে গ্রাম বানভাসি হবার আশংকা। তখন দেবীকে জাগানোর কথা মাথায় আসে। তিনি‌ই সেই মূহুর্তে একমাত্র ভরসা তাদের। রাতের বেলায় সবাই যখন ঘরে ফিরে যায় সেই গ্রামের শক্তপোক্ত বীরপুরুষ ধুঁধুল সবাইকে জেগে বাঁধ পাহারা দেবার কথা বলে। শীতলা জ্ঞানে পূজিতা সেই দেবীর থানে কাঠি, তেলের কুপি জ্বালিয়ে হাজির হয় ধুঁধুল। কিন্তু দেবীর রূপ দেখে নিজেকে সামলাতে পারেনা সে। ঝাঁপিয়ে পড়ে সে মানবী শীতলাদেবীর ওপর। নিজের বিচারবুদ্ধি লোপ পায় তার। দেহরসের টানাপোড়েনে জর্জরিত ধুঁধুল সব ভুলে যায়। ওদিকে নদীর জল নেমে প্রকৃতি শান্ত হয়। খরিস সাপে কাটে ধুঁধুলের ছেলেকে। তার বৌ রাইমণি ছেলেকে নিয়ে ছুটে যেতে চায় মায়ের থানে। বাধা দেয় ধুঁধুল। বলে ও দেবী নয়, মানবী। ততক্ষণে ছেলে সাপের বিষে মারা যায়। রাইমণি দোষারোপ করে স্বামীকে। দেবীর রোষেই সে পুত্রহারা হয়েছে সে জানায়। এভাবেই একদিকে কুসংস্কার অন্যদিকে নারীকে ব্যাবহার করে তাকে কাজে লাগিয়ে গ্রাম্যজীবনের টানাপোড়েন পর্বের সমাধা হয়।  

সুনেত্রা সাধুর গল্প "বারোতলার বারান্দা"। সেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র দিতির সংসার অরণির সঙ্গে। বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ নয় তারা। তার মনখারাপের বারান্দা বারোতলার ওপরে বসে সে শীত, গ্রীষ্ম বর্ষা অনুভব করে। কোথাও যেন ফাঁক তার জীবনে। স্নানঘরে ঢুকে সে কেঁদে ভাসায়। এ জীবন তাকে বিষণ্ণ করে। কেন এমন হয় তার?  চলে যেতে হবে তাকে এই বারোতলা থেকে। অরণি আর আগের মত ভালোবাসেনা তাকে, সেটাই কেবলি ভাবায় দিতি কে।  কিন্তু বারান্দায় লাগানো গাছগুলোর প্রতি মায়া। জল দেবার কথা বলে যেতে হবে অরণি কে। কি অপূর্ব এক মমত্ববোধ আর আকর্ষণ এই যাবার বেলায়। পিছু ডাকে দুজনের হাতে কেনা উইন্ডচাইমের মৃদু শব্দ। আধুনিক জীবনের মধ্যে প্রবেশ করেছে লিভ-ইন সম্পর্ক। দিতি আর অরণিও তার স্বীকার। তবুও যদি প্রকৃত বন্ধন হত। তাই সে চলে যেতে চায়। মনের টান নেই আর।  আর তারপরেই  দিতির জন্মদিনের সারপ্রাইজ পার্টি অর্গানাইজ করে অরণি। এলাহী আয়োজন অথচ সবটাই অজানা ছিল। সব আত্মীয়স্বজনকে নিমন্ত্রিত করেছে অরণী সেই জন্মদিনের পার্টিতে। কিন্তু সবটাই দিতির অজান্তে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে দুটি সম্পর্কে জোড়া লেগে যায়। দিতি মুগ্ধ হয় অরণির ভালোবাসায়। আর গল্পের মধ্যে এই পজিটিভ বার্তা এখনকার ভেঙে যাওয়া বহু বিচ্ছেদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে" এভাবেও ফিরে আসা যায়" 

সুজাতা রায়ের গল্প "আমরা ওরা" একজন শহুরে এবং একজন গ্রাম্য নারীকে কেন্দ্র করে। শহুরে এক মহিলার বাড়িতে পুরোণো পরিচারিকা বিজুরী হাজরার মেয়ে বকুলমণি তার সংসার সামলাত । গৃহকর্ত্রীর আদরের বিদুষী কন্যারত্ন তুতু বিদেশে চাকরীরতা। বকুলকে ছোট থেকে পড়ানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। প্রথম প্রথম সমাজসেবী হয়ে উঠছেন ভেবে শুরু করেও ছেড়ে দিলেন অচিরেই। এবং ছোটঘরের মেয়েটির যেন পড়াশুনো না শিখলেও চলবে সেইরকম মনোভাব। নিজের মেয়ের সঙ্গে বড় করতে গেলেন কিন্তু কোথাও যেন কাজ করল তাঁর আত্মম্ভরিতা। সেই বকুলের ভরভরন্ত যৌবনে বিয়ে হল একদিন। সে চলে গেল শ্বশুরঘরে। তুতু বিদেশ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা পাঠালো তার বিয়েতে। ক্রেডিট নিলেন সেই কর্ত্রী। যেন তাঁর মেয়ের দয়াতেই আজ বিয়েতে এত ঘটা হল বুঝি। একদিন নিজে যখন হাজির হলেন বকুলের নতুন সংসার দেখতে সেখানে গিয়ে অবাক তিনি। তাঁদের ধনী পরিবারের সব অনুষঙ্গ অণুকরণ করেছে বকুল। আবারো রীতিমত ঈর্ষাণ্বিত হলেন। মনে হল যা হবার নয় তাই হয়েছে। তাঁর মেয়ে তুতুর পাঠানো মহার্ঘ্য ডলারে সুখে স্বচ্ছন্দ্যে ঘরকন্না করছে পরিচারিকার মেয়ে এহেন বকুল? সুখী গৃহকোণে লক্ষ্মীশ্রী যেন উথলে উঠছে। কি পরিপাটি তার সংসারে। অথচ তাঁর মেয়ে তুতুকে কিছুতেই রাজী করানো গেল না বিয়েতে।  আর সেখানেই গল্পকার হিসেবে সার্থক সুজাতা। ট্যিপিকাল একজন মহিলার অন্য আরেকজনের প্রতি ঈর্ষাণ্বিত হবার ঘটনা, যা আমাদের অতি পরিচিত। অথচ এই বকুল কর্ত্রীর দুর্দিনে বুক দিয়ে আগলেছে তাঁর সংসার। কিন্তু মেয়েদের ঈর্ষা, হিংসার কাছে বিচারের সব বাণী অচিরেই ভেসে যায়। তার বাড়িতে গৃহকর্ত্রীর আতিথেয়তার কোনো ত্রুটি রাখেনি। তবুও তাকে হঠাত খারাপ লাগতে শুরু করল সেই গৃহকর্ত্রীর। নারীমনের চোরাকুঠুরি থেকে বুদবুদ কেটে বেরিয়ে আসে শুধুই হিংসে।মনে পড়ে যায় সেই টুনটুনির গল্পের হিংসুটে রাজার কথা। রাজার ঘরে যে ধন আছে তা পাখীর ঘরে থাকাটা অবাস্তব। বকুলের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করে তাঁর। আর গল্পটি সেখানে শেষ হয়েও শেষ হয় না।    

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের গল্প "প্রেমপিল" একটি কল্পবিজ্ঞানের গল্প। কিন্তু গল্পের শেষে আমরা আবিষ্কার করি নারী পুরুষের জোরা লেগে যাওয়া বিবাহিত সম্পর্কটিকে।
"বাস্তাবিক ভাবে একটি সার্থক গল্প" বললেন আলোচক সৈয়দ হাসমত জালাল। "মেয়েরা কল্পবিজ্ঞান সেভাবে লেখেনা। কিন্তু সেখানে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন ইন্দিরা। গল্পের নামটিও চমৎকার। দৈনন্দিন জীবনে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যে চরম উদাসীন্য সৃষ্টি হয়েছিল সেটার পরিসমাপ্তি ঘটে গল্পের শেষে।শুক্তির বিজ্ঞানী স্বামী অনিমেষ দুধরনের প্রেমের বড়ি আবিষ্কারে মগ্ন। একটি ওষুধে বহুদিনের অধরা প্রেম পুনরুজ্জিবীত হবে আর অন্যটি হল প্রেম রোধক। অর্থাৎ প্রেমের বাড়াবাড়িকে রুখে দেবে। আর অনিমেষের স্ত্রী শুক্তির প্রতি সন্দেহভাজনতা তার ছাত্র প্রিয়মকে জড়িয়ে। তাই বুঝি সেই প্রেমের নিষ্পত্তি করতেই উঠে পড়ে লেগেছিলেন বিজ্ঞানী অনিমেষ। কিন্তু বুদ্ধিমতী শুক্তি ধরে ফেলেছিলেন যে তিনি‌ই হচ্ছেন তাঁর স্বামীর গিনিপিগ অর্থাত তাঁর ওপরেই পরীক্ষা চালাবেন অনিমেষ। কিন্তু শেষে শুক্তি জানিয়ে দিলেন যে প্রিয়মের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা কেবলি তাঁর এক ছাত্রীকে ঘিরে যার সঙ্গে প্রিয়মের হার্টব্রেক হয়েছে। অতএব সেই প্রেম কে জোড়া লাগানোর প্রেমপিল কি অনিমেষ তাকে দিতে পারে? সেখানেই গল্পের ইতি আর অনিমেষ-শুক্তির ভাঙা সম্পর্ককে জোড়া লাগানোর পজিটিভ ইঙ্গিত"  



সংবাদ প্রতিদিন

যুগশঙ্খ, রবিবারের বৈঠক 


প্রতিবেদন লিখলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

সোমবার, ২৫ মার্চ, ২০১৯

বসন্তে গল্পবৈঠক - মদনমোহন মন্দির, বেলঘরিয়া

সন্তে গল্পবৈঠকের আসর বসেছিল বেলঘরিয়ার মদনমোহন মন্দিরে। এটি ছিল গল্পবৈঠকের ২৭ তম আসর। প্যারীচাঁদ মিত্রর ঐতিহ্যমণ্ডিত ঠাকুরবাড়িতে মনোরম এক বসন্ত সন্ধ্যায় ১০ই মার্চ নবীনা ও প্রবীণা নজন লেখকের স্বরচিত গল্পপাঠ অনুষ্ঠিত হল। গল্পগুলির নির্দিষ্ট একটি সূত্র ছিল। সংস্কৃত নাটকে যে নয়টি রসের উল্লেখ আছে, নটি গল্প সেই নবরসের উপর আধারিত। সঞ্চালকের ভূমিকায় ছিলেন ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় । তাঁর সঞ্চালনার বিশেষ দিকটি হচ্ছে তিনি অপূর্ব সুকণ্ঠের অধিকারিনী। গল্পের মাঝে মাঝে তিনি রবীন্দ্রগান পরিবেশন করে অদ্ভুত আবহের সৃষ্টি করেছেন। গল্পবৈঠকের কর্ণধার এবং অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠান সার্থক হওয়ার পেছনে তাঁর সুচারু ভুমিকা নজরে পড়ে।
ওপর থেকে - অনিন্দিতা মণ্ডল, নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত, বুবুন চট্টোপাধ্যায় , সুবর্ণা রায়, নন্দিনী সেনগুপ্ত, আইভি চট্টোপাধ্যায়, পৃথা কুণ্ডু, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণা রায় 

     শ্রীকল্যাণ নামের গল্পটি ছিল লেখক আইভি চট্টোপাধ্যায়ের । শান্ত রসের গল্প এটি। উত্তাল এবং বিধ্বংসী সম্পর্কের শেষে অভিষেকের অদ্ভুত এক উপলব্ধির জগতে প্রবেশ। পার্থিব মায়ার জগত ছেড়ে এক শান্ত নিস্তরঙ্গ মহাসমুদ্রে প্রবেশ করেছে তার মন। গল্পের শেষে মন আপনিই শান্ত হয়ে যায়। 
সুবর্ণা রায় পরিবেশন করলেন গোলাপি ক্ষত। রৌদ্র রসের গল্প। রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়। স্বপ্নে ইচ্ছেপুরণের গল্প এক অত্যাচারিত মেয়ের। রোজ যে স্বামীর হাতে মার খায়। 
পৃথা কুণ্ডুর গল্প অজ্ঞাতবাস। বীররসের গল্প। এ গল্প শুনলে আমাদের চিত্রাঙ্গদাকে মনে পড়তে বাধ্য। 
ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় , গায়ক, সঞ্চালক, পরিকল্পক  

ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় গানও গেয়েছেন চিত্রাঙ্গদা থেকেই। এই গল্পের অধিকারী মহাশয় ও বিপ্লবী পার্থকে মনে থাকবে বহুদিন। নন্দিনী সেনগুপ্ত লিখেছেন বীভৎস রসের গল্প, সীমান্ত ক্ষত। দূর বিদেশে দুটি মানুষের সম্পর্কের মধ্যে ঢুকে পড়ে সীমান্তের কাঁটাতার। যেখানে ব্যক্তিমানুষের সম্পর্ককে দুষিত করে তোলে যুদ্ধ ও ঘৃণার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। 
নিবেদিতা ঘোষ মার্জিতের গল্প উদ্ভট। অদ্ভুত রসের গল্প। সাহিত্যের অঙ্গনে প্রতিভাবান অথচ নবীনদের হেনস্থার একটি অপূর্ব শ্লেষাত্মক রচনা লিখেছেন নিবেদিতা। কিন্তু ক্রমশ চেপ্টে যাওয়া মানুষও যে ইচ্ছেপূরণের জন্য নিজের ভাবনা অনুযায়ী পাল্টে যেতে পারে তার প্রমাণ অন্তু। শেষ পর্যন্ত তার ইচ্ছেতে সে হয়ে যায় একটা ট্রাক, যার পিঠে হলুদ আলোর টুনি। লেখা আছে দেখবি আর জ্বলবি, লুচির মতো ফুলবি। সত্যিই অন্তু চরিত্রটির  বন্ধু সাহিত্যিকদের বিদ্বেষের উত্তরে। তার ট্রাক হয়ে ওঠা ছাড়া আর কিছু ছিলনা ! কৃষ্ণা রায় লিখেছেন নিশি স্পর্শ। ভয়ানক রস। এ গল্পটি শুনে শিউরে উঠতে হয়। সম্পত্তির জন্য বাবাকে চাপ দিতে থাকা, অসুস্থতাকে বাড়িয়ে দেওয়া, এ পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু ল্যাবরেটরিতে কোমায় আচ্ছন্ন বাবার শরীর থেকে মাপ মতন মাংস তুলে আনা, এক লহমায় আমাদের নরখাদক বানিয়ে দেয়। সত্যিই ভয়ানক। বুবুন চট্টোপাধ্যায়ের গল্প ‘মৃত্যু’। করুণ রসের গল্প। আত্মজার আত্মহনন। এক আপাত নির্লিপ্ত পিতার মেট্রোয় আরেকটি সুইসাইড শুনে প্রথমে বিরক্তি, ‘কেন যে এরা মেট্রোকেই বেছে নেয়?’ থেকে শেষে অশ্লীল খসখসে গলার ফোনে জানতে পারা, মৃত্যু হয়েছে মেয়ের। বন্ধুদের সঙ্গে পাবে যাওয়ার অনুমতি না পেয়ে অভিমানে সে সুইসাইড করেছে। সত্যিই করুণ! কি অদ্ভুত অন্তঃসারশূন্য সমাজ তৈরি করেছি আমরা! 
গল্পটি অবশ্য আকস্মিক পাওয়া সংবাদে পিতার স্তব্ধ হয়ে যাবার কথা বলে। 

শৃঙ্গার রসের গল্প লিখেছেন অনিন্দিতা মণ্ডল। তাঁর গল্পের নাম হিয়ার মাঝে। এক যৌবন অতিক্রান্ত অধাপিকার প্রথম প্রেমের খোঁজে ছুটে বেড়ানোর গল্প। ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় এ গল্পের রেশে গেয়েছেন ‘আমি তোমার প্রেমে হবো সবার কলঙ্কভাগী’। মন ভেসে যায় সে গানে। 
হাস্য রসের গল্পে পটু ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। তাঁর গল্পের নাম ফেসবুকেন সংস্থিতা।এই ভার্চুয়াল জগত নিয়ে কি অপরিসীম আগ্রহ আমাদের! জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে ফেসবুক। ফেসবুকের আড়ালে কল্পিত এক দেবীর পুজো নিয়ে গল্পের অন্তর্বর্তী শ্লেষ ধরা পড়ে। 
গায়িকা ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় এ গল্পের অনুষঙ্গে গেয়েছেন সুউপযুক্ত গান ‘ও ভাই কানাই’। অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে বিদ্যাপতির ‘মাধব বহুত মিনতি করি তোয়’ পদটি দিয়ে। এ পদের সুর দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। মদনমোহন মন্দিরে এমন নিবেদনের পদ গেয়ে ইন্দিরা উপস্থিত সকলকে আবিষ্ট করেছেন। এভাবেই এই পর্বের বসন্তের গল্পবৈঠক রূপে রসে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল।          
     
প্রতিবেদন লিখলেন অনিন্দিতা মণ্ডল 

মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

গল্পবৈঠক ২৬ @ ব‌ইমেলা ২০১৯



কলকাতা ব‌ইমেলা ২০১৯ এর শেষ দিনে হয়ে গেল গল্পবৈঠকের ২৬ তম আসর। এবার গল্পপাঠের বিষয় ছিল কল্পবিজ্ঞান নিয়ে অণুগল্প। গল্প পড়লেনঃ চৈতালি চট্টোপাধ্যায়, নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত, সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়, তমালী রায়, শ্যামলী আচার্য, ঊর্মি নাথ, স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়, নন্দিনী সেনগুপ্ত, এবং তপশ্রী পাল। এবারের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল কলিকাতা লেটার প্রেস প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হল দুটি ব্যতিক্রমী অণুগল্প সংকলন। সম্পাদনায় বুবুন চট্টোপাধ্যায় ও ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। দুটি ব‌ই থিম ভিত্তিক। একটি সমকাম প্রেমের অণুগল্প এবং অন্যটি ভার্চুয়াল প্রেমের অণুগল্প। ব‌ইদুটি প্রকাশ করেছেন সাহিত্যিক সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শ্রী অমর মিত্র। 


সোমবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০১৯

রূপোয় মোড়া গল্পবৈঠক ২৫

অ্যাদ্দিনে তো জেনেই গেছেন, ‘গল্পবৈঠক’ কী, কেন, কাদের। যাঁরা জানেন না, তাঁদের জন্য আরেকবার পুরনো পড়া ঝালিয়ে দেওয়ার মতো করেই বলি, এই বৈঠক গল্পকারদের এবং এই দল অধিকাংশই মেয়েমানুষের। আমন্ত্রিত পুরুষ থাকেন বৈকি, কখনও শ্রোতা হয়ে, কখনও লেখক পরিচয়ে। কিন্তু মোদ্দা কথা হল, যে কোনও বয়সের নারী-গল্পকার এই দলে আসেন, আসছেন, আসবেন। মঞ্চ-মাইক-আলো-পুরস্কারের দেখনদারি এড়িয়ে সহযোদ্ধা অক্ষরশ্রমিকের বৃত্ত ক্রমশ বড় হয়েছে। সাহিত্যিক শ্রীমতী ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের মনের ছাঁদে গড়া এই মুক্তমনের আঙিনায় আমাদের অনেকের যাতায়াত। আমিও এই দলে সম্প্রতি ঠাঁই পেয়েছি। এবং পাওয়া ইস্তক চেটেপুটে নিচ্ছি খোলা আকাশ। যাঁরা নিন্দেমন্দ করে বলেন, মেয়েমানুষ মানেই কূটকচালি আর কুঁদুলেপনা, তাঁদের জন্য একছড়া কাঁচকলা আর একঝুড়ি বাতিল ছেঁড়া কাগজের টুকরো উপহার রইল। ঐ ঝুড়িতে আমাদের কাটাছেঁড়া করা বাতিল গল্পের শব্দগুলো রয়েছে... ওগুলো হিংসুটে দুষ্টু লোকেদের জন্য।
    ২০১৯-এর জানুয়ারি; দেখতে দেখতে পঁচিশতম গল্পবৈঠক। রজতজয়ন্তী বলে কথা! সাহিত্যিক শ্রীমতী কণা বসু মিশ্রের ফার্ন রোডের ঐতিহাসিক বাড়িতে জম্পেশ ভোজের সঙ্গে জমে উঠল গল্পবৈঠক। এবার থিম ছিল ‘পিকনিক’। শীতের মরসুমে এর চেয়ে চমৎকার থিম আবার হয় নাকি! ছ’শো শব্দের বাঁধন আর সেইসঙ্গে এগারোজনের গল্পপাঠ। আহা! যেমন গল্প, তেমন সব উপস্থাপনা! তার সঙ্গে বাড়তি পাওনা সাহিত্যিক শ্রীমতী সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোজ্ঞ বিশ্লেষণ। এমন বিশ্লেষণ আর কাটাছেঁড়া করে ভুল শুধরে উৎসাহ দেওয়ার আশায় সমস্ত জীবন ধরে গল্প লিখে যাওয়া যায়!
    পন্ডিতিয়ার আর সি মাইতি’র দোকানের সিঙ্গাড়া বাড়তি অ্যাড্রিনালিন জোগান দেয় বলেই ইন্দিরাদি সিঙ্গাড়ার ঠোঙা আগে বাড়িয়ে ধরেন সকলের মুখের কাছে। ব্যস! উপচে পড়ে লাবণ্যে মোড়া এক-একটি মণিমুক্তো। শ্রীমতী সুতপা গুপ্ত গেয়ে ওঠেন “আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে”; ফার্ন রোডের বাড়ির হাওয়ায় তখন পিকনিকের গন্ধ। 
    জ্যোৎস্নারাতের গানের শেষেই শ্রীমতী জ্যোৎস্না কর্মকার শুরু করলেন তাঁর ‘পিকনিক প্রলেপ’। পাখি-মিমি-স্যান্টির গল্প। এই সময়ের গল্প। আজকের জেন-ওয়াইয়ের প্রেমের সম্পর্কের টানাপোড়েন আর ফোবিয়া নিয়ে একটি নিটোল গল্প। যদিও গল্পের ওঠাপড়া নিয়ে সর্বাণীদির পরামর্শ রইল। চৈতালি চট্টোপাধ্যায়ের কলমে কবিতা আর গদ্যের রঙের অপূর্ব মিশেল। তাঁর ‘দৈব-অদৈবের পিকনিক’ গল্পে যদু-রাজীব-অপালা-শমিত-মিমি এই পাঁচটি চরিত্রের মধ্যে তিনজন আত্মকথনে বলে যায় তাদের মনের কথা। বিষবৃক্ষের বীজের মতো গল্পের শেষে জ্যাক ড্যানিয়েলের বোতলের মধ্যে লুকিয়ে থাকে পরকীয়া আর প্রতিহিংসা।  সাবলীল লেখনী তাঁর। টানটান গল্পটি থেকে মন সরানো যায় না। স্টেটমেন্টের পাশাপাশি ডায়ালগ থাকলে বোধহয় আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠতে পারত। সে স্বাধীনতা একান্তই লেখিকার।   


    শ্রীমতী স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায় পড়েন ‘লাল গাড়ির যাত্রীরা’। ষোলজনের পিকনিকে এল পারফেক্ট পিকনিক মেনুর বর্ণনা। অনিমেষ-বাসব-মনোজ-তৃষ্ণা-মেঘা সকলে মিলে পাহাড় আর জঙ্গলের মধ্যে অনুভব করে এক অপার্থিব অভিজ্ঞতা। বিজ্ঞানে যার ব্যাখ্যা মেলে না। এককথায় ভূতের গল্প। দিব্যি। যদিও বাস্তব আর অলৌকিকের মধ্যে কোনও বিভাজন না থাকায় পাঠক একটু ধন্দে পড়তে পারেন।
কৃষ্ণা রায় শোনালেন ‘অরণ্যশীর্ষে সন্ধে’। পঁচাত্তর পেরোনো বাবা-মা নিজেদের এখন ছেলে পুপুর সংসারে শুকনো লতার মতো পরগাছা ভাবেন, সারাদিন বদ্ধ ঘরে তাঁদের স্মৃতিচারণ, ভারাক্রান্ত করে তোলে চারপাশের পরিবেশ। মফস্বল স্কুলের হেডমাস্টার এখন অবসরপ্রাপ্ত, বৃদ্ধ। তাঁর সঙ্গে এক বিষণ্ণ ডিসকোর্স তাঁর স্ত্রীয়ের। যেমন হয়, যেমন হচ্ছে চারপাশে। প্রায় একই চলনে শ্রীমতী সংযুক্তা সেনগুপ্ত শোনান ‘বিষাদসন্ধ্যা’। বিপ্লব সিকদারের স্মরণসভায় শাপলা-শালুকের পুকুরে ঢ্যালা ছুঁড়ে একটু একটু স্মৃতিবিন্দু তৈরি করেন, প্রবাসী খোকনের প্রিয় খাবার সরিয়ে রেখে পিকনিকে বসে ফিরে তাকান চড়ুইভাতির দিকে। গল্পের শেষে মনের মধ্যে কেমন চিনচিনে ব্যথা। পূর্বা মুখোপাধ্যায় ওরফে মুকুজ্যে গিন্নি যেন কৌটো থেকে অন্য কৌটোতে ঢালা-উপুড় করার মত নিখুঁত জার্ক অ্যান্ড মিক্স দিয়ে সাজিয়েছেন তাঁর লেখা ‘প্রেম অ্যাট দ্য রেট পিকনিক’। নিক্সের জীবনে কাব্যকলি থেকে ম্যাডোনা--  এক আশ্চর্য হালফিল প্রেমের জার্নি। অনেক উপচারের মধ্যেও একদলা নীল কষ্ট বুকের মধ্যে জমাট বেঁধে বসে থাকে। ঝরঝরে লেখনী, আর একটু গভীরে গেলেই চলকে পড়বে গাঢ় নীল রঙের যন্ত্রণা।  
সাহিত্যিক শ্রীমতী কণা বসু মিশ্রর অভিজ্ঞ লেখনী বড় কাব্যময়। ডোরাকাটা পাথরের নুড়ি নিয়ে টুকি খেলা কিশোর আর রাইকিশোরী দূরবীণ দিয়ে দেখে, তাদের পিকনিকের লুকোচুরি খেলা এখন স্মৃতির পাতায়। তারপরেই ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় গড়চুমুকে নিয়ে যান পাঠকদের। পিকনিকের চরিত্র, আলসেমি, ফূর্তি ভরপুর। তূণীরের অফিসের পিকনিকে দূরে আর এক দলের মধ্যে ছেড়ে যাওয়া প্রেমিকা রাকা। রাকা-তূণীর, রাকা-কৌশিক--  প্রাক্তন প্রেমিক তূণীর আর স্বামী কৌশিক, দু’জনের জীবনেই অপয়া রাকা। ‘আলোড়ন’ গল্পটির শেষে রাকার মনের কথা শুনতে পায় শুধু নদীর জল। একটা লাইনের মধ্যেই অন্য গল্পের মোচড়।  
নন্দিনী সেনগুপ্ত’র ‘সোনা তরঙ্গ নদীধারে’ গল্পটি শুনতে শুনতে মনে হয় যেন নাটক শুনছি। প্রবাসে বরফ ঢাকা প্রান্তরের সামনে এক বসন্তের খোঁজ। রূপক গল্পটিতে শুধুই আসা-যাওয়ার হাতছানি। স্মৃতি আর ব্যথাভরা বেদনার ভার। প্রতিদিনের প্রবাস-যাপনে স্মৃতিভ্রংশ স্থবির এক মানুষকে জাগাতে চায় আরেকজন। বৃষ্টির ফোঁটা ফেলার মতো স্মৃতি ঝরে পড়ে টুপ্টাপ। কাব্যিক, বাস্তব গল্পে বুঁদ হয়ে থাকি অনেকক্ষণ। সোনালী মুখার্জির অসাধারণ বর্ণনায় আধুনিক জীবনের ঝকঝকে বর্ণনা। তার আড়ালে দাঁত-নখ বের করে হঠাৎ হানা দেয় এক সাঙ্ঘাতিক মোচড়। ‘চড়ুইভাতি’ গল্পের শেষের বুনোট বেশ জোরালো ধাক্কা।
আর শ্যামলী আচার্যর গল্পের নাম ‘পিকনিক’। রতু আর শুন্টি কাজ করে বাজির কারখানায়। এই দুটি শিশুশ্রমিক জানে না ‘পিকনিক’ কী, পিকনিক জায়গাটা ঠিক কোথায়, কি কি হয় সেখানে। তাদের স্বপ্ন, কল্পনা, বাস্তব-অবাস্তবের ছায়াপথ এই গল্পে।
সুতপা’র মনভরানো গান আর কণাদির কবজি ডুবিয়ে খাওয়ানোর আয়োজনে দিশেহারা লাগে। ‘গল্পবৈঠক’ শেষ হয়। রেশ থেকে যায় বহুক্ষণ। ঠিক যেমন ‘পিকনিক’-এর স্মৃতি জেগে থাকে দীর্ঘ সময়। সবশেষে মধুরেণ সমাপয়েত সোনালীর আনা গল্পবৈঠকের ২৫ টি অনুষ্ঠান পূর্তিতে আনা কেক দিয়ে। 



প্রতিবেদন লিখেছেন
শ্যামলী আচার্য
     
  

      
   

   
   

   

বুধবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৮

গল্প বৈঠক ২৪, রূপশালীর ১০ বছর পূর্তিতে

রূপা মজুমদার ও চুমকি চট্টোপাধ্যায়


আমন্ত্রণপত্র ডিজাইন করলেনঃ নন্দিনী সেনগুপ্ত
শিশুদিবসের প্রাক্কালে রূপশালীর ১০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান হল দক্ষিণ কলকাতার শরত বাসভবনে। সেই উপলক্ষে আমন্ত্রিত ছিল গল্পবৈঠকতাঁদের ২৮ তম গল্পপাঠ নিয়ে। বেশ কিছু গল্প ছড়া আর এক সুন্দর আলোচনা চক্র নিয়ে সুচারু অনুষ্ঠানটি হয়ে গেল ১২ই নভেম্বর, ২০১৮য়।
ছিলেন রিনা গিরি রূপশালীর তরফ থেকে আর ছিলেন সাহিত্যিক ইন্দিরা মুখোপধ্যায় যার অসীম উৎসাহ ও উদ্দীপনা দিয়ে গড়ে তোলা গল্পবৈঠক আজ শুধু এক গল্পের আড্ডাই নয়, বরং গল্প অনুশীলনের এক সুন্দর সাবলীল চারণভূমি।
অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল নির্ধারিত সময়েই মরদান হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী  অনুষ্কা দাশগুপ্তর গান দিয়ে। অনুষ্কা প্রথমে আমাদের শোনাল অন্তরা চৌধুরীর বিখ্যাত গান "নাচো তো দেখি আমার পুতুল সোনা" এবং তারপর অত্যন্ত সাবলীল গলায় শোনাল "লাল নীল সবুজেরই মেলা বসেছে"। কিশোরী অনুষ্কার গানে মুগ্ধ যখন শ্রোতারা তখন সঞ্চালিকা জয়া চৌধুরী মঞ্চে ডেকে নিলেন কিশোরভারতীর সম্পাদক চুমকি চট্টোপধ্যায় ও শুকতারা এবং নবকল্লোলের সম্পাদক রূপা মজুমদারকে। বিশিষ্ট দুই অতিথি বক্তব্য রাখলেন অতি প্রাসঙ্গিক এক বিষয়ের ওপর -  "ডিজিটাল যুগে কিশোররা কি সাহিত্য পড়ছে?"

রূপা আমাদের শোনালেন আশার কথা। বললেন কিশোর সাহিত্যের ভবিষ্যৎ মেঘলা নয়। এখনও বহু কিশোর মোবাইল ফোন বা টিভির হাতছানি উপেক্ষা করেও বই পড়ে আর সেই কারণেই এখনও পর্যন্ত যথেষ্ট কিশোর সাহিত্য সৃষ্টি হয়েই চলেছে।
চুমকি বললেন কিশোর সাহিত্যের ফর্ম পাল্টেছে হয়ত অল্প তবে কিশোর সাহিত্যের সংজ্ঞা পালটে যায়নি আজো। এও বললেন শহরের তুলনায়  মফস্বলে কিশোর সাহিত্যের পাঠক এখন অনেক বেশি। তার কারণ হিসেবে পাঠমাধ্যম থেকে শুরু করে গ্যাজেট নির্ভরতা এবং অতিরিক্ত ভিস্যুয়ালের ব্যবহারে শিশু মস্তিস্কের অলস হয়ে ওঠা সবই উঠে এসেছিল। তবে দুই সম্পাদক এবং দর্শকাসনের বন্ধুরা অনেকেই একমত ছিলেন যে ভাল পাঠক তৈরি সম্ভব তখনই যখন বাড়িতে ভাল পড়ার পরিবেশ এবং আগের প্রজন্মের ভালো পড়ার অভ্যাসের ছায়া পড়বে আগামীর মননে।
শ্রোতা সঞ্চালক ও অতিথিরা সবাই একাত্ম হয়ে এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করায় সময় বয়ে গেল বড় তাড়াতাড়ি।
 
গল্প পাঠেঃ সুকন্যা সাহা, সঙ্গীতা দাশগুপ্ত রায়, বুবুন চট্টোপাধ্যায়, পায়েল সেনগুপ্ত, দেবযানী বসু কুমার, মিতা নাগ ভট্টাচার্য, স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়, নন্দিনী সেনগুপ্ত এবং ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

শুরু হল ছড়া ও গল্পপাঠের পালা। প্রথমে কবিতা শোনালেন সংস্কৃতি ব্যানার্জী। সুখপাঠ্য কবিতাটি আজকের দিনে বড় প্রাসঙ্গিক লাগে।অনুষ্ঠানের শুরুতে রিনা গিরির উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের উত্তরীয় গামছা দিয়ে বরণ করে নেওয়াটা নজর কেড়ে নেয়।
এর পর সঙ্গীতা দাশগুপ্তরায় শোনালেন একটি ছোট ছেলের বোধবিভ্রাটের গল্প।  ছোট বেলায় বড়দের সব কথার মানে খুব স্পষ্ট থাকে না। তেমনই এক কথা থেকে এক ছোট ছেলের বোঝার ভুল আর সে ভুল ভাঙ্গার এ গল্প আমাদের অনেকের ছোটবেলাকেই মনে করাবে সম্ভবতঃ। 
দেবযানী বসুকুমার শোনালেন "পাড়াবেলা"র কথা যে বেলা আমাদের সকলের ছেলেবেলার সাথে জড়িত কিন্তু দুর্ভাগ্য যে এখনকার শিশুরা এ স্বাদে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে প্রতিটি পরিবারেই। দেবযানীর আন্তরিক আর্তিটি যদি শিশুদের পাড়াবেলা ফিরিয়ে দিতে পারত তো  বেশ হত।
মিতা নাগ ভট্টাচার্য্য শোনালেন এক শিশুর গল্প যে আচমকাই এক চরম যন্ত্রণাময় সত্যর মুখোমুখি দাঁড়ায়। বাবার মৃত্যুসংবাদের যন্ত্রণা নিয়ে দুর্গার কাছে প্রার্থনারত শিশুটির কথা শুনতে শুনতে মন কেঁদে ওঠে। মিতা কিন্তু দক্ষতার সঙ্গে স্বরচিত গল্পটি স্মৃতি থেকে বলে চললেন। 
স্বপ্না বন্দোপধ্যায় শোনালেন গল্পের ছায়ায় অনেক অজানা তথ্য দেশ বিদেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাসকে কেন্দ্র করে। গল্পের শুরুতে একটা চমকপ্রদ রেসিপি কিশোর কিশোরীদের অভিভাবকদের জন্য বেশ মিষ্টি চমক।
নন্দিনী সেনগুপ্তর লেখায় ফুটে উঠল  কিশোর মনের  মাধুর্য্য। স্কুল প্রজেক্টে ভাল নম্বর পাওয়ার আকাঙ্খা , প্রত্যাশা না পূরণ হওয়ার দুঃখ এবং সব শেষে আচমকাই কিশোর মনটির মধ্যে সাফল্যের খুশি ফিরে আসার এই গল্পও শ্রোতাদের শিকড় ছুঁয়ে যায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "ভুলুরাম শর্মা"  ছড়াটি  শোনালেন কৃষ্ণা মজুমদার। ছড়াটি নিজগুণেই বড় মিঠে তায় তায় কৃষ্ণার পরিবেশনার গুণে  একবার শুনলে ভোলা অসম্ভব।
এর পর ছিল  সুকন্যা সাহার লেখা এক কিশোরের গল্প যে স্বপ্নে বেড়িয়ে আসে ২০৪০ সালের কিছু মুহূর্ত ছুঁয়ে। গল্পটি শুনতে শুনতে মনে হয় সত্যিই হয়ত ২০৪০ সালের কিশোর কিশোরীরা বড় একলা হয়ে যাবে। সত্যিই হয়ত মানুষের সব চেয়ে বড় বন্ধু সহায়ক এবং সঙ্গী হবে শুধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। যদি তাই হয় তো সে  আগামী বড় একাকীত্বের আগামী।
বুবুন চট্টোপধ্যায় শোনালেন  এক  কিশোরীর গল্প  যে তার জন্মদিনে পেয়েছে আস্ত একখানা ঘর সুন্দর করে সাজানো  আর তার পরদিনই  পেয়েছে এক বিশ্রী অভিজ্ঞতা যা হয়ত এক ঝটকায় কেড়ে নিল তার কৈশোর।
শিবানী পান্ডে মুগ্ধ করলেন দীপ মুখোপধ্যায়ের লেখা "কেয়ার অফ ফুটপাথ" ছড়াটি আবৃত্তি করে । এ  ছড়া সেই সব কিশোরদের নিয়ে যারা আমাদের শিশুপাঠ্য  বইয়ের বাইরে এবং যাদের শৈশব এবং কৈশোর হারিয়ে গিয়েছে সমাজের  যন্ত্রণার ফুটপাথে।
পায়েল সেনগুপ্ত শোনালেন দিয়েগো নামের ভারি মিষ্টি এক ছেলের গল্প যার পরিত্রাণ নেই বাবা কাকা মামাদের উচ্চাকাঙ্খার স্বপ্ন থেকে।
সবশেষে ইন্দিরা মুখোপধ্যায় অপূর্ব দক্ষতায় রূপকথায় মিশিয়ে দিলেন সৌরবিজ্ঞান। কিশোর কিশোরীরা এ গল্পটি একবার শুনলে সৌর বলয়ে গ্রহের অবস্থান এবং তাদের বাহ্যিক কিছু বিবরণ এবং পৃথিবী ছাড়া বাকী গ্রহদের মধ্যে বৃষ্টির হাহাকার আর কখনও ভুলতে পারবে না।
অনুষ্ঠানের প্রায় শেষ ভাগে এসে রিনা গিরি শোনালেন স্বরচিত ছড়া।
শেষ পাতে ছিল পৃথা বলের গাওয়া রূপকথার মিশেলে ছড়ার গান। অপূর্ব এ উপস্থাপনা কিছুক্ষনের জন্য শ্রোতাদের ছেলেবেলায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
আর এই সবের মাঝে ছিল জয়া চৌধুরীর টকঝালমিষ্টি মন্তব্য এবং কখনও সুচিন্তিত মতামতও।  অনুষ্ঠানের রাশ টানা ও ছাড়ার যে অনুপম দক্ষতা জয়া দেখিয়েছেন তা প্রশংসার দাবী রাখে নিশ্চিতভাবে। 



গান গল্প ও ছড়ার ঠাসবুনোটের এই গালিচায় বসে দুদন্ড জিরিয়ে নেওয়ার অবসরটি সাজিয়ে দেওয়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ গল্পবৈঠকের সমস্ত লেখক পাঠক ও অতিথিদের। আর ছিল চা সিঙ্গারার আয়োজন। 

প্রতিবেদন লিখলেনঃ সঙ্গীতা দাশগুপ্ত রায়  

যুগশঙ্খ রবিবারের বৈঠক 

বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

গল্পবৈঠক ২৩, সেপ্টেম্বর সোনাটা



বালিগঞ্জের নন্দী স্ট্রীটের ক্যাফে স্ট্রিংসে হয়ে গেল গল্পবৈঠকের ২৩ তম পর্ব। গত ১৬ই সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠানের নাম ছিল সেপ্টেম্বর সোনাটা। কিন্তু থাকিয়া গেল রেশ। শেষ  হইয়াও হইল না শেষ। গল্পবৈঠকের অভিধানে 'শেষ' শব্দটি অবান্তর তার আভাস পাওয়া গেল প্রধান উদ্যোক্তা ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের ২৪তম গল্প বৈঠকের সানন্দ আগাম ঘোষণায়। সেপ্টেম্বরের ছুটির বিকেলে
ক্যাফের আনাচকানাচ ভরপুর ছিল সেদিনের নিমগ্ন শ্রোতায় ।
 

সেদিন সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটির ভাবনায়,পরিকল্পনায় এবং সঞ্চালনায় ছিলেন কবি, বাচিক শিল্পী মৌমিতা ঘোষ। শারদ অর্ঘ্য দিয়ে সূচনা হল গল্প বৈঠকের।নবীন প্রবীণ কবিদের শরতের কবিতার ফাঁকে ফাঁকে আগমনী গান গাইলেন তপশ্রী পাল। কিবোর্ড অনুষঙ্গে ছিলেন নীলাদ্রি। বাজল তোমার আলোর বেণু ঝংকৃত হল সঞ্চালিকার প্রাসঙ্গিক কবিতা-ছড়ার কোমল সংযোজনায়। শব্দ-যোজনায় তপোদা।
এবার গল্পপাঠের শুরু। ওইদিন থিম অণুগল্পের বিষয় ছিল দুটি, ঝগড়া অথবা হাসি। ৩০০ শব্দের মধ্যে প্রত্যেকে হাসি অথবা ঝগড়া বিষয়ে গল্প লিখে এনেছিলেন। মূল পর্বে লটারিতে প্রথমেই এলেন সাঁইথিয়ার সুজাতা রায়। অত্যন্ত সাবলীলতায় দোলপূর্ণিমা নিশি'   গল্প আমাদের নিয়ে গেল লক্ষ্মীর পাঁচালীর অন্তর্নিহিত কুপ্রথা-বিরোধিতার আঙিনায়। বেশ সুচারু ভঙ্গিতে পাঁচালীকারের দাঁড়িতে টান মেরেছে সুজাতা। কস্তুরী চট্টোপাধ্যায়ের মজার 'নাইটি কাহিনী'র ফোঁটা ফোঁটা জলে ভিজল গল্প বৈঠকের বারান্দা। 


বুবুন চট্টোপাধ্যায়ের গল্পে আবারো দেখি 'গরু'র দুধে চোনা ফেলে সগর্বে বেরিয়ে গেল ছোট্ট শালিখ। সাদামাটা ঘরোয়া কাহিনী অনবদ্য হয়ে উঠল তাঁর লেখায়। 
স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'জেরাতে মোর' গল্পটিতে বিবদমান এক স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সেতু হল দুঃসময়। সোনালীর গল্প 'আধুনিক ভজনের কেচ্ছা' বেশ উপভোগ্য। কেচ্ছাকাহিনীতে কুতূহলী নই কোন বাঙালিবাচ্চা বুক ঠুকে বলবে বাপু? ঘুমন্ত ভজন-বাবুরা জেগে উঠলে ক্যামেরা চলুক বুঝেশুনে। ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'থিম বিভ্রাট' কিন্তু আমাদের চেতনাকে কিঞ্চিৎ ঝাঁকিয়ে  দেয়। এ যেন তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি। থিম-ভরপুর পুজোমণ্ডপে কখনও যদি একচালার ঠাকুর ফিরে আসে তবে জেনারেশন এক্স তা গ্রহণ করবে তো? বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'জামবাটি' ও কখনও সখনও প্রান্তিক চাষী দম্পতির আপাত বচসার অন্তরালে নিরুচ্চার প্রেমের ইঙ্গিতবাহী হতে পারে বোঝা গেল। বেশ সুন্দর তাঁর গল্পের বয়ান।
'কালচার' গল্পটিতে রায়গঞ্জের শর্মিষ্ঠা ঘোষ দেখালেন মিঃ কমলাকান্ত বিশ্বাস একাধারে সংস্কৃতি-অপ-সংস্কৃতির মিশেলে একটি বর্ণময় চরিত্র বিশেষ। এরকম চরিত্র খোঁজ করলে দু'একটি মিলেও যায় আমাদের আশে-পাশে। কৃষ্ণা দাসের 'ঠেলার মাল'এ অফিসটাইমের বাদুড় ঝোলা বাসের নৈমিত্তিক একঘেয়েমি থেকে যাত্রীরা খানিক রৌদ্ররসের আভাস নিয়ে গন্তব্যে যায়। উপরি পাওনা।
জয়তী অধিকারীর 'পোষ্য' যখন দু'কেজির ইলিশ দিয়ে ভুরিভোজ সারে তখন মনিবনীর সাথে আমরাও খেপে উঠি। এ কী কাণ্ড! ইলিশ কি সস্তা?
অংশুপ্রতিম দে-র 'যুযুধান' এ আশার কথা শেষমেষ দু'পক্ষের আপোসমিলন। ঝগড়ার মধ্যেও হাসির আভাস। যদিও সাদামাটা গল্পের বিষয়টি তবুও স্বল্প পরিসরে মন কাড়ে।
নন্দিনী সেনগুপ্তর গল্প 'রুপুদের সংসার'-এ পাঠক এতটাই মুগ্ধ যে মনে হয় ওই সংসারের একজন সদস্য হতে পারলে অন্তত রুপুর মায়ের হাতের অরোরা খাওয়া যেত,বাবার ডার্লিং-এর গায়ে পড়ে নানান মস্করা করা যেত।
রজত শুভ্র ব্যানার্জির 'রাধাগোবিন্দবাবুর অভ্যাস' গল্পগুজব শেষে বাড়ি ফিরে দুটি চমচম খাওয়া। আমরা জানিনা কোনো বিশেষ মহিলার হস্তনির্মিত স্মৃতিবিজড়িত কিনা সেই চমচম। তবে তাঁর গল্পে এই অভ্যেস কথাটি যেন বড্ড চেনা মনে হল। যেন অগ্রবর্তিনী কোনও লেখিকার ছায়া দেখতে পাওয়া গেল।
'নৃপতিবাবুর নবীন জীবন'-এ তো নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত বিপত্নীক নৃপতিবাবুকে বেঘোরে স্প্যানিশ দৌড়বীর পুত্রবধূর দৌড়োনোর পোষাক পরিধান করাইয়াই ছাড়িয়াছে । তাহাকে যে দৌড় করায় নাই ইহাতেই পাঠককুলের স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়িয়াছে। টয়লেট পেপারের বাংলা প্রতিশব্দ 'হাগজ' লেখিকার অন্যতম স্বকীয়তার পরিচয় দেয় যা ব্যবহারে তাঁর কলমের দৌরাত্মে তিনি কুণ্ঠিত হন নাই ।
জয়া চৌধুরির 'শিশুপাঠ' এ শিশুর কাছে এখনও অনেক পাঠ নেবার আছে। বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুলের চাপান উতোর তা দেখাল। তবে গল্পের বুনটে আরেকটু মুনশিয়ানা দেখাতেই পারতেন তিনি।
কৃষ্ণা রায়ের 'গিলোটোলজিস্ট' গল্পে এক জবরদস্ত হাসির খোরাকের রসদ মজুত। একশ'দশ কেজি ওজনের পচাঁত্তর বছর বয়সী মহিলার উপস্থিতিই হাঁ হয়ে যাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। শ্যামলী আচার্যর গল্প 'কাঠি' রাজনীতির কলকাঠির ভাঁটায় সাক্ষাৎ জিয়নকাঠি।পরিশীলিত উপস্থাপনা।
বাংলার অধ্যাপক ঊর্মি দাসের 'লোহিত আকাশ পথে' মর্তের হিরোইন ফ্যাশন ডিজাইনার হিরো ভিলেন প্রভৃতিতে মজেছে স্বর্গের তথাকথিত দেবদেবীরা। স্বর্গের অপ্সরাতে তাদের এখন অরুচি। তবে গল্পটি নির্দিষ্ট শব্দ সীমা অতিক্রম করেছিল তা বলাই বাহুল্য। তমালী রায়ের 'ভুলো'র নায়ক এমনিতে ভালো মানুষ কিন্তু ভুলো। সায়া নামক মেয়েদের অন্তর্বাসে ছেলেদের পাজামা ভ্রম বা চানাচূরের সাথে দহি কম্বিনেশন বেশ অরুচিকর শোনায়। আর তাঁর এহেন শব্দচয়ন গল্পটিতে কোথাও যেন একটু তাল কেটে দেয়।
দীপা চ্যাটার্জি গল্প লেখেন না কিন্তু তাঁর মামীর খোঁপা মামায় বাঁধে সত্যি যেন গল্প ঘটে ছিল একটা পুরুলিয়ার ঘাটে। বেশ। এমন মামা সত্যিই দুর্লভ ।


ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের 'হামি' সাম্প্রতিক সময়োপচিত বিষয় নিয়ে। যা এক নিষ্কলুষ 'হামি' স্মরণ করায়। মধ্যবয়সী নন্দবাবু প্রেম-পিরিতি সন্দর্শনে বেজায় ক্ষুব্ধ। তার স্ত্রী যুগপন্থী। দুটি পায়রার চঞ্চুমিলন রুখতে যে বন্দুক তাক করতে পারে তাকে স্মরণ করাতে হয় তার নিজের যৌবনকালের অনেক মজা-মস্করার স্মৃতিকথা। পক্ষিপ্রেমের সরলতা তাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে বোঝাতে হয়। প্রকৃত প্রেম নিকষিত হেমস্বরূপ।
গল্প পাঠের শেষপাতে
টপ করে পড়ল তপশ্রী পালের 'নাড়ুর নাক'। পর্যাপ্ত হাস্যরস থাকলেও সকলের হজম হয় নি। কারও কারও অতৃপ্তির ঢেঁকুর উঠেছে গল্প শুনতে শুনতে। কারণ নাক থেকে নিঃসারিত বর্জ্য পদার্থের উপস্থিতি এবং তার সঙ্গে আমাদের সবার অতি প্রিয় নকুলদানার তুলনা।  
ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় দুটি রামপ্রসাদী গানের আবেশে মুগ্ধ করলেন সভা। শ্রাবণী ব্যানার্জি শোনালেন দুটি অনবদ্য রবীন্দ্র সঙ্গীত।
আর অনুষ্ঠান কানায় কানায় পূর্ণ হল মৌমিতাও জয়জিতের মজার অনু শ্রুতিনাটকে। আগাগোড়াই অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় যথেষ্ট মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন মৌমিতা ঘোষ।
আমাদের সকলের প্রিয় লেখিকা কণা বসু মিশ্রর মুখনিঃসৃত কিছু জরুরী কথায় আমরা সমৃদ্ধ হলাম। আশাতীত এবং অতিরিক্ত প্রাপ্তি ছিল সেদিন সিনথেসাইজার বাদক নীলাদ্রির কণ্ঠে আধুনিক বাংলা গান। যে গান সবাইকে চেয়ারচ্যুত করে প্রায় নৃত্যোন্মুখ করে ছেড়েছিল সব শেষে।
ক্যাফের এক কাপ করে চা আর শ্রদ্ধেয়া অগ্রজ সাহিত্যিক কণাদির আনা একটি পরমরোচক মিষ্টি দিয়ে ২৩ তম গল্প বৈঠকের সুখসমাপ্তি হল।




প্রতিবেদনটি লিখেছেন স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়
ফোটো সৌজন্যে, জয়তী ভট্টাচার্য অধিকারী                        
অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পত্র ডিজাইনে নন্দিনী সেনগুপ্ত