সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

'গল্পবৈঠক' ৩৩ @ চন্দননগর





১৪ ই সেপ্টেম্বর, শনিবার "গল্পবৈঠক ৩৩" অনুষ্ঠিত হল শতাব্দ-প্রাচীন হুগলী জেলার চন্দননগর বঙ্গ বিদ্যালয়ে। 
চুঁচুড়া-চন্দননগরের বিশিষ্ট দশজন গল্পকার ও তিনজন অলোচককে "গল্পবৈঠকের" পক্ষ থেকে ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। 

বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ স্কুলটির একতলার এক শ্রেণীকক্ষে, বাঁশবেড়িয়ার প্রখ্যাত গল্পকার নব বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি চরিত্র ভিত্তিক গল্প 'কোন এক হরেনকে নিয়ে' পাঠের মধ্য দিয়ে আড্ডার সূচনা হয়। লেখক এক্ষেত্রে হরেন ও সুখেন দুটি চরিত্র পাশাপাশি রেখে গল্পটি নির্মাণ করেছেন। গল্পটি নিয়ে আলোচক তার আলোচনায় বলেন, স্মার্ট গল্প। তবে গল্পে সুখেনের ইচ্ছার অপমৃত্যু ঘটেছে।

দ্বিতীয় গল্প 'পাঁচ নম্বর গোধূলি' পাঠ করলেন চুঁচুড়ার গল্পকার সিক্তা গোস্বামী। গার্হস্থ্য জীবনের অণু পরিবারের গল্প, যেখানে মা-বাবার বয়স হলে তাঁরা ব্রাত্য হয়ে যান সংসারে। তাদের ঠাঁই হয় বৃদ্ধাশ্রমে। শেষে অনিচ্ছা সত্বেও ছেলে তার মাকে জোর করে নিয়ে আসছে বৃদ্ধাশ্রমে, এই ছবি এঁকে লেখিকা পাঠকের কাছে প্রতিটি মা প্রতিটা ছেলের সামনে একটা আয়না তুলে ধরেছেন। আলোচক, গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র অশোক ও ঝর্ণার জীবনের ক্রাইসিসের শেষে ট্রাজেডিতে পরিণত হবার কথা বলেছেন। 

এরপর, চুঁচুড়ার প্রখ্যাত গল্পকার বিমল গঙ্গোপাধ্যায় গল্প পাঠ করেন। 'ছায়াসূর্য' নামের এই গল্পটিতে বাবা থেকে রাক্ষস, রাক্ষস থেকে মনুষ্যত্বে নেমে আসার এক ছবি এঁকেছেন। মায়ের আত্মহত্যা, বাবার নোটবই, তাতে ছায়ার খোঁজ, সবই স্বাভাবিক ছন্দে, অন্তরঙ্গ ধারায় বয়ে গেছে গল্পের গতির সাথে। কাহিনীর শেষে মৃত মায়ের ছায়া আর বাবার ছায়ার দূরত্ব কত তা নিরূপণের দায়িত্ব গল্পকার পাঠকের হাতে অর্পণ করে এক দার্শনিক পরিসমাপ্তি ঘটান। আলোচক তাঁর আলোচনায়, গল্পটির ভরবিন্দুর কথা, গল্পটি যে ট্র্যাজেডির তুঙ্গে পাঠকদের নিয়ে চলে গেছিল তা উল্লেখ করেন।

গল্পবৈঠকের নিয়ম অনুযায়ী প্রথম তিনটি গল্প পাঠের শেষে সেই গল্প তিনটি নিয়ে আলোচক মানস সরকার আলোচনা করেন।

চতুর্থ গল্প 'পাগলী'। গল্পকার ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের স্বকন্ঠে শোনার অভিজ্ঞতা শ্রোতারা বহুদিন মনে রাখবেন সেই বিষয়ে সন্দেহ নেই। 'অষ্টুমী' নামের পাগলী চরিত্রটি আপাতদৃষ্টিতে নিজেই নিজের দ্বারা লাঞ্ছিত একটি চরিত্র। শ্রোতারা গল্পটিতে লক্ষ্য করেছেন, চরিত্র সৃষ্টিতে লেখিকার সহানুভূতি, নারীর প্রতিবাদ, পুরুষের অনুভূতিহীনতার প্রতি লেখিকার ধিক্কার। আলোচক,  তাঁর আলোচনায় গল্পটিকে একটি বাস্তবের ছবির গল্প রূপে চিহ্ণিত করেন। তিনি গল্পের ভিতরের গল্পটিকে দেখিয়ে দেন তাঁর আলোচনায়। 

চুঁচুড়ার গল্পকার সুব্রত বসু  শোনালেন আসরের পঞ্চম গল্পটি- 'তবু অনন্ত জাগে'। একটি ট্রেন দুর্ঘটনায় বাবার মৃত্যুর সম্ভাবনা। মৃত(?) বাবাকে ভুল চিহ্ন দিয়ে সনাক্তকরণ করার জন্য ছেলে অনিরুদ্ধকে এক মানসিক টানাপোড়েন ও বেদনার মধ্যে দিয়ে যাত্রা করিয়েছেন লেখক। শেষে বাবার মতো করে বেল বাজানোর শব্দে চমকে ওঠে পরিবারের সকলে। আলোচক, গল্পটির আরো বিস্তারের সম্ভাবনার কথা ব্যক্ত করেন।

এরপর চন্দননগরের ভ্রমণপিপাসু গল্পকার নীতিশা রায়  'মায়াজাল' নামক একটি শহুরে জীবনের গল্প পাঠ করেন অত্যন্ত ধীর স্থির ও মৃদু কন্ঠে। নাম পরিচয়হীন কেন্দ্রীয় চরিত্রটির মধ্যে শ্রোতারাও যখন ধীরে প্রবেশ করছেন, ঠিক তখনি চরিত্রটি ঠিক যেভাবে নিজেকে সকলের থেকে দূরে রেখে একাকী জীবনে গল্পটির চরিত্র হয়ে উঠেছে সেভাবেই অনেক প্রশ্ন শ্রোতাদের মনে রেখে গল্পটি শেষ হয়ে গেল। আলোচক, গল্পটির রহস্যময়তার কথা ও গল্পটির চলনপথের ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা করেন।

বৈঠকের উপরোক্ত  চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ গল্পটি নিয়ে তাঁর সুচিন্তিত মতামত দেন সাহিত্যিক, সুআলোচক গৌর বৈরাগী মহাশয়।

আসরের সপ্তম গল্প কাকলি দেবনাথের 'নিরাশার আশা' একটি আবেগ প্রধান গল্প। গল্পের নিরাশাবালার চরিত্রটি নির্মমভাবে আহত একটি চরিত্র। চরিত্রটির যে ব্যথা পূর্বে ছিল তা তার একলারই ছিল, সেই ব্যথায় যখন সবাই সাড়াও দিল ততদিনে তার ব্যথা বদলে গেছে। শেষপর্যন্ত বদলে যাওয়া সময়েও তার ব্যথা একলারই থেকে গেছে। আলোচক, গল্পটিকে সংসারের জলছবি বলেছেন। যে সংসারে মৃত্যুর জন্য স্বামী চুম্বন দেন স্ত্রীকে।

চুঁচুড়ার গল্পকার অরিন্দম গোস্বামীর গল্প 'তাসের ঘর' একটি সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত। গোলাপী বাড়িগুলোর ফাটল, সরকারি প্রতিশ্রুতি, মিতুলের পুতুল আর দিম্মার সংসার ভেঙে পড়া সবই ধরা পড়ছে, যার কারণ শহর আধুনিক হয়ে উঠছে। আলোচক, দুটি প্রজন্মর একসাথে বাড়ি ও খেলাঘর ভেঙে যাবার দৃশ্য দেখার কথা বলেছেন।

আসরের নবম গল্পকার চুঁচুড়ার রাজীব কুমার ঘোষ  'ঘোষ স্যারের গল্প' নামক একটি গল্প শুরু করেন এই বলে,'আলো মানে হাতি'। ধর্মান্ধতার শিকার যেসব মানুষ, হানাহানির সময়ে বাস্তুছাড়া বা প্রকৃতির রোষে ছিন্নমূল তাদেরই গল্পকার একই ফ্রেমে ফেলে এক রূপক চরিত্র বুনেছেন। তথ্য ও গল্প নির্মাণ এক্ষেত্রে চরিত্রের উর্দ্ধে উঠে এক নতুন ঘরানার গল্পের সূচনা করেছে তা বলাই বাহুল্য। আলোচক, গল্পটিকে, বিপন্নতার গল্প বলেছেন। আলোচক, গল্পটির চরিত্রগুলির নাম নির্বাচণের দিকে শ্রোতার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

আসরের শেষ গল্প পাঠের আগে, সাহিত্যিক সর্বানী বন্দ্যোপাধ্যায় এই তিনটি গল্প নিয়ে আলোচনা করেন।

চন্দননগরের গল্পকার শতদ্রু মজুমদার আসরের শেষে 'এক হাজার শব্দের গল্প'  নামক একটি কৌতুকধর্মী গল্প পাঠ করেন। গল্পটির প্রধান গুণ ছিল এর উপভোগ্যতা। আলোচক মানস সরকার বলেছেন, গল্প পাঠে স্যাটায়ার ছিল ও গল্প ল্যান্ডিংএর সময় টুইস্ট ছিল।

গল্পবৈঠকের তিন বছরের পথচলার ইতিহাস ও গল্পকারদের গল্পজীবনের পরিচয় দিয়ে সাজিয়ে অনুষ্ঠানটিকে গেঁথেছিলেন সঞ্চালিকা মৌসুমী ঘোষ। এটি ছিল কলকাতার বাইরে গল্পবৈঠকের চতুর্থতম জেলা সফর এবং হুগলী জেলায় দ্বিতীয় সাহিত্য আড্ডা।
রিভিউ লিখলেন মৌসুমি ঘোষ 

শুক্রবার, ২ আগস্ট, ২০১৯

গল্পবৈঠক ৩২ @ ইসক্রা পত্রিকা দফতর, কলেজস্ট্রীট



আজকাল 


ল্পবৈঠকের সঙ্গে আলাপ হয় ফেসবুকের বিজ্ঞাপন দেখে। ভাবতাম কবে আমারও ডাক আসবে গল্পবৈঠকে গল্প পড়ার। এবার বৈঠক ছিল কলেজ স্ট্রীটে, ইসক্রা পত্রিকা দপ্তরে। কলেজস্ট্রীটে গল্পবৈঠক প্রথম অনুষ্ঠিত হল।  
কলেজ স্ট্রীটে সম্পাদক প্রগতি মাইতির ইসক্রা পত্রিকার দফতরে হাজির হতেই 
গন্ধ আসে তাজা তাজা নতুন বইয়ের, পুরনো কলকাতার। 
যাইহোক যখন পৌঁছলাম, দেখলাম আসন এক্কেবারে ঠাসাঠাসি করে পূর্ণ।আমার জায়গা হল দরজার বাইরে, অনেকটা আগেকার দিনের মহিলাদের চিকের আড়াল থেকে অনুষ্ঠান দেখার মত।
সঞ্চালনা করছিলেন মানস সরকার, গল্প পাঠে উপস্থিত ছিলেন, অমিতাভ দাস, আয়োজক প্রগতি মাইতি, ভজন দত্ত, সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়, রুমকি রায় দত্ত, ইন্দ্রনীল বক্সী, অরূপ আচার্য, মানস সরকার, দেবশ্রী ভট্টাচার্য  এবং যাঁর উদ্যোগে গল্প বৈঠকের প্রথম সূচনা, সেই ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। আলোচনায় ছিলেন শ্যামল ভট্টাচার্য, বুবুন চট্টোপাধ্যায় এবং তৃষ্ণা বসাক।
প্রথম গল্প পাঠ হাবড়ার অমিতাভ দাসের। এক নব দম্পতির অন্তরঙ্গ ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে বারবার ফোন আসে মেয়েটির মায়ের। স্বাভাবিক ভাবেই অসন্তুষ্ট হয় স্বামী। এ এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। সবাই সবাইকে ভালোবাসে , কারো দাবীই অন্যায্য নয় তবু অজান্তেই নিজের প্রিয়জনকে আঘাত দিয়ে ফেলে মানুষ। এই আসরে গল্পের শব্দ সংখ্যা বেঁধে দেওয়া হুয়েছিল ৮০০ শব্দে। কিন্তু লেখকের এই গল্পটির মনে হয় আরো কিছু শব্দের প্রয়োজন ছিল। তাই শেষটা মনে হল হঠাৎ করেই এসে গেল। একটা সুন্দর গল্প যেন দানা বাঁধতে বাঁধতেও বাঁধল না।
এর পরেই ছিল দেবশ্রীর গল্প পাঠ। আমার গল্পটি ছিল এক পথ শিশুকে নিয়ে। এক স্কুলের সামনে একটি ফ্ল্যাট বাড়ি উঠছে। মেয়েটির মা সেখানে কাজ করে আর মেয়েটি নীচে মাটিতে খেলা করে। যাকে দেখে তার কাছেই ছুটে গিয়ে সে বলে 'তুইঙ্কল তুইঙ্কল লিতিল এস্তার' ।সবাই বিরক্ত, আসলে মেয়েটি বোঝাতে পারে না, সে পাগল নয়, ভিক্ষাও করতে চায় না। সে শুধু জানতে চায় এর পরের লাইনটা কী!
প্রগতি মাইতির গল্পের নাম কান। গল্পের নায়ক দু একবার তার পরিবারের লোকজনদের কথায় বিরক্ত হয়ে কথা না শোনার ভান করেন, তাতেই তাঁর পরিবারের লোকজনের ধারণা হয় তিনি কানে কম শুনছেন। তাঁকে ডাক্তার দেখানোর কথা চলে।
বাঁকুড়া থেকে আসা ভজন দত্তর গল্প শুনে সত্যি অবাক হলাম । ওনার গল্পের শুরুটা অসাধারণ লাগল, লেখিকার লিখতে লিখতে হঠাৎই মনে পড়ল তিনি গ্যাসে ভাত চাপিয়ে এসেছেন। গিয়ে দেখলেন যথারীতি ভাত পুড়ে গেছে। এরকম ঘটনার সঙ্গে  আমরা প্রায়ই সম্মুখীন হই, অবশ্য এতে লেখক কূলের অনেক আপত্তি শোনা গেল, তাঁদেরও লেখার সময় প্রায়ই ছটা ডিম এনে দেওয়ার হুকুম শুনতে হয়। যাই হোক ফিরে আসি লেখকের গল্পে। যে ঘটনা দিয়ে তাঁর গল্প শুরু হয়েছিল , শেষ হল কিন্তু একটু অন্যভাবে। লেখিকা যেন তাঁর কল্পনার চরিত্রকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন। বেশ অন্যরকম লাগল গল্পটি।

অগ্রজ লেখিকা সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পটি অত্যন্ত চেনা জানা। কিন্তু উপস্থাপনা সত্যিই অসাধারণ। দুই পুরনো বন্ধুর দেখা হয়ছে। দুজনেই বেশ বৃদ্ধ। এক বন্ধু চোখে কম দেখেন, আরেক জন কানে প্রায় কিছুই শোনেন না। যে বন্ধু চোখে দেখেন না, তিনি বন্ধুকে না চিনেও অনায়াসে আরেক বন্ধু ভেবে কথা বলে যান। আরেক জন কানে না শুনেও তার উত্তর দিয়ে যান। দুজনেই জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত সৈনিক। নিজেদের জীবন উজাড়  করে দিয়েছেন সন্তানের জন্য, আজ তাঁরা ক্লান্ত , একা ।
দীর্ঘদিনের একান্তর পত্রিকার সম্পাদক অরূপ আচার্য পড়লেন তাঁর গল্প। সেটি কবিতার মত সুন্দর ভাষার বুননে মাত্রা পায়। সমালোচকের ভাষায় একটু কাব্যিক ব্যাঞ্জনার ভাগ যেন বেশিই  ছিল।
বর্ধমানের  ইন্দ্রনীল বক্সির 'জড়ুল' গল্পটি বেশ ভালো লাগল, গল্পের নায়ক তার স্ত্রীকে ভালোবাসতো, কিন্তু সে বহুদিন অসুস্থ।এমন রুগ্ন স্ত্রীকে আর কোন পুরুষের ভালো লাগে। নায়কের মাঝে মাঝে খুন করে এই ধুকপুক করতে থাকা জীবন কে শেষ করে দিতে ইচ্ছে হয়। সে আকৃষ্ট হতে থাকে আয়ার কাজ করতে আসা মেয়েটির দিকে।স্ত্রীর পিঠে থাকা জড়ুল ,যা একসময় তাকে আপ্লুত করে রাখত, তা ছেড়ে সে ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হতে থাকে আয়ার কাজে আসা মেয়েটির উল্কির দিকে। গল্পটির চমক একেবারে শেষে, যখন প্রায় মৃত্যু পথযাত্রী স্ত্রী তার স্বামীর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলে 'আমি জানি'।
হুগলীর রুমকি রায় দত্তর গল্প অভিসারিকা এক না পাওয়া প্রেমের কাহিনী। জন্ম থেকে মুক ও বধির মেয়েটির জীবনেও প্রেম এসেছিল, কিন্তু সে প্রেম স্থায়ী হতে পারেনি। তবু মেয়েটি বিরহিনী রাধার মত , সেজে গুজে এসে দাঁড়ায় শেষ ট্রেনটি যাওয়ার সময় । তার প্রতীক্ষা যদি সেই প্রেম কখনো ফিরে আসে।
চন্দননগরের মানস সরকারের গল্পটি একটু অভিনব। ভূত, ফ্যান্টাসি সব মিলিয়ে এক অন্য রূপ নিয়েছে। বাবা মা সন্তানের জন্য চিন্তা করেন, খুব স্বাভাবিক ব্যাপার । মাঝে মাঝে এটা একটা বিরক্তির পর্যায়ে পৌঁছে যায়। অথচ অবচেতনে চাই বাবা মা আমাদের কথা চিন্তা করুক। এই গল্প শুনতে শুনতে অনেক পুরনো কথা মনে পড়ে গেল। তখন পার্ট ওয়ান পরীক্ষা দিচ্ছি। যথেষ্ট বড় হয়েছি বাবা ,মা দিতে যায় না। কলেজে বাবা মাকে নিয়ে যাওয়া বড্ড লজ্জার ব্যাপার। অথচ কেজানে কেন পরীক্ষা দেওয়ার সময় ভীষণ শরীর খারাপ লাগল, মাথা ঘুরছে শরীর অবশ হয়ে আসছে। কোনমতে পরীক্ষা শেষ করে ভাবছি এই অবস্থায় বাড়ি ফিরব কী করে ! ইস্ ! এই সময়ে যদি বাবা থাকত, হল থেকে বেরিয়েই দেখি সামনে বাবা। জীবনে এত অবাক কোনদিন হইনি। বলল , এখানে কাজে এসেছিলাম ভাবলাম তোকে নিয়ে ফিরি। গল্পটার সাথে সেদিনের সেই ঘটনার মিল পাই।
শেষ গল্প ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের" প্লামকেক এবং" । ভূতের গল্প। এই গল্পটিও বাবা মা ও মেয়ের। তবে গল্পটি এই জগৎ ছেড়ে অন্য জগতে পাড়ি  দিয়েছে অন্য এক জগতে। যে স্নেহ ইহ জগতে পূর্ণতা পায়নি , সেই স্নেহই যেন সদ্য করা প্লামকেকের গন্ধ মেখে মৃত্যুর পরেও ফিরে ফিরে আসে।


প্রতিটি গল্পের খুব সুন্দর বিশ্লেষনাত্মক আলোচনা করলেন বুবুন চট্ট্যোপাধ্যায়, শ্যামল ভট্টাচার্য এবং তৃষ্ণা বসাক। 

প্রগতি বাবুর আতিথেয়তা অতুলনীয়। গল্পের মাঝখানেই এল চা ও সিঙ্গারা। প্রত্যেকের হাতে প্রগতি বাবু সামান্য উপহার তুলে দিলেন। দূর দূর থেকে আসা গল্পকার দের মন তখন কানায় কানায়। 
আমার গল্পটি ফুরলো তবে নটে গাছটি মুড়লো না। আড্ডা শেষ হল আরো একটা আড্ডার পরিকল্পনার মাধ্যমে। তবে সেটা এখন গোপন থাক, সে গল্প পরে হবে।

বৃহস্পতিবার, ১১ জুলাই, ২০১৯

গল্পবৈঠক ৩১ @ বেঙ্গল ঘরানা



আমন্ত্রণ পত্র ডিজাইনেঃ  নন্দিনী সেনগুপ্ত 

থের দিন, ৪ঠা জুলাই। ভরা আষাঢ় অথচ মেঘের ছিটেফোঁটা নেই। বৃষ্টি তো দূরস্থান। তবু উত্তেজনা চরমে। গল্পবৈঠক ৩১ তম পর্বের ডাক এসেছে যে! এবার দশ জন গল্পকার তৈরি তাঁদের দশটি মৌলিক গল্প নিয়ে। সকাল এগারোটা থেকে গল্প পড়ার পালা। তারপর ভুরিভোজ।

দিনটি অবশ্য আরও আগেই নির্ধারিত ছিল। কিন্তু রাজ্যে তখন মহা হট্টগোল। জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন, কর্মবিরতি। এই পরিস্থিতিতে সংবেদনশীল যে কোনও মানুষ সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন এ আর নতুন কথা কি? খুব প্রত্যাশিত ভাবেই পিছিয়ে দেওয়া হল গল্পবৈঠকের তারিখ। রাজ্যের চিকিৎসাব্যবস্থার জট কাটল, সমস্যা একটা সমাধানের পথ পেল... তারপর ভাবা হল, এবার হোক গল্পবৈঠক।

স্রবন্তী বসু বন্দ্যোপাধ্যায়ের “বেঙ্গল ঘরানা”তে সেদিন ছিল খাওয়াদাওয়ার এলাহি আয়োজন। কিন্তু সে কাহিনি ক্রমশ। তার আগে সকাল ঠিক এগারোটাতেই ল্যান্সডাউন পদ্মপুকুরের “বেঙ্গল ঘরানা”য় জড়ো একে একে গল্পকারেরা। অন্য অনেক পরিচয়ের মধ্যে থেকে তাঁদের সেদিন একমাত্র পরিচয় তাঁরা প্রত্যেকেই গল্পকার। “গল্পবৈঠক”-এর ৩১তম পর্ব। মুখ্য উদ্যোক্তা এবং কর্ণধার ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সেদিন গল্প নিয়ে হাজির বুবুন চট্টোপাধ্যায়, চুঁচুড়া থেকে মৌসুমী ঘোষ, চন্দননগর থেকে কাকলি দেবনাথ, নন্দিনী সেনগুপ্ত, ডাঃ সোনালী মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণা রায়, শ্যামলী আচার্য এবং সুপ্তশ্রী সোম।

পদ্মপুকুরের ‘বেঙ্গল ঘরানা’য় স্রবন্তী বসু বন্দ্যোপাধ্যায়ের চমৎকার আতিথ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীতের আবহে শুরু হল মৌলিক গল্পপাঠ।

এইদিনের প্রথম আমন্ত্রিত গল্পকার মৌসুমী ঘোষ। মৌসুমীর ‘ফোনের মেয়ে’ এই সময়ের এক আশ্চর্য একাকীত্বের ছবি। এক নিঃসঙ্গ প্রাপ্তবয়স্কা নারী বকুল, পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মাতৃহীনা মহিলাদের ‘মা’ হয়ে ওঠেন। মায়ের নাম, বয়স, ছবি, পছন্দ-অপছন্দ, তিনি কী খেতে-পরতে ভালবাসতেন, মেয়ের জন্মদিন-বিবাহবার্ষিকী বা বিশেষ কোনও দিন বিস্তারিত জানিয়ে প্রথমে বুকিং করতে হয়। আর তার বিনিময়ে ক্লায়েন্টের সুবিধা অনুযায়ী মাসের নির্দিষ্ট দিনে চাহিদা অনুযায়ী ফোন করে খোঁজ নেন ‘ফোনের মেয়ে’দের। ক্রমশ একাকীত্ব আর নিরাপত্তাহীনতায় জড়িয়ে যাওয়া এই ভার্চুয়াল সমাজে ‘ফোনের মা-মেয়ে’র সম্পর্ক বাস্তব জীবনের এক নিখুঁত ছবি। এমনটিই তো হতে চলেছে।

কাকলি দেবনাথের ‘সে এবং প্রমা’তে নোয়াখালির মিষ্টি ভাষায় এক আদরের কাকিমার জীবনের বর্ণবৈষম্যের গল্প। তাঁর গায়ের রঙ কালো, দেখতেও অসুন্দর। তাই বোধহয় অপরূপ সুন্দর ‘ধলাকাকা’র পাশে কাকীর নাম হয়ে যায় ‘পেত্নিকাকিমা’। বারে বারে সেই কাকিমার সঙ্গে কথা হয় প্রমা’র, ধলাকাকার সোনার গৌরাঙ্গের মতো চেহারার পাশে স্বর্গের সুন্দরী অপ্সরাদের দেখা হবে বলেই যেন কাকার মৃত্যুতে কাকিমা বড় নিশ্চিন্ত! লোকের বাড়িতে ঘুরে জ্ঞান সঞ্চয় করেন তিনি, ক্যান্সারের মারণছোবলের মারাত্মক যন্ত্রণার মাঝেও আনন্দ পান, ভাবেন, এইবার আবার স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। এই জন্মের যন্ত্রণা কাটিয়ে আবার সেজেগুজে নতুন বৌয়ের মতো ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন বুনে চলা ‘পেত্নিকাকিমা’র গল্পে মানুষের মনের সৌন্দর্য্যের এক অপূর্ব বিশ্লেষণ।

রাকা-কুণালের সম্পর্কের মধ্যে এক কুন্দনের সেট নিয়ে জমে ওঠে সুপ্তশ্রী সোমের গল্প ‘অন্ধকারের উৎস হতে’। কুণাল কি আত্মকেন্দ্রিক? অন্য জগতে থাকে? রাকা, কুণাল আর তাদের চার বছরের ছেলে ইমনকে নিয়ে যোধপুরে বেড়াতে গিয়ে ঘনিয়ে ওঠে এই গল্পের পটভূমিকা। কুণালের বাঙ্কে রাখা ব্রিফকেস থেকে লাল জুয়েলারি বক্সে নীল ভেলেভেটে মোড়া আরও একটি কুন্দনের নেকলেসের সামনে দাঁড়িয়ে রাকা অনুভব করে অন্য কোথাও জট পাকিয়ে আছে দাম্পত্য। পরকীয়ার চেনা প্লটের আভাসেই গল্পটির পরিসমাপ্তি।



স্রবন্তী বসু বন্দ্যোপাধ্যায়



নন্দিনী সেনগুপ্তর জার্মান ভাষা থেকে অনূদিত গল্পে যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় থমকে থাকে ‘রান্নাঘরের ঘড়ি’। ১৯২১ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত আয়ু জার্মান লেখক ভল্‌ফগাং বোশার্টের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাঁর জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হওয়া তো সময়ের নিরিখে অবশ্যম্ভাবী ছিল। তাঁর গদ্য এবং কবিতায় মারিয়া রিলকে এবং হুইটম্যানের ছায়া, আর সেই ইঙ্গিত, প্রতীক আর রূপকের এক অসাধারণ মিশ্রণ “দ্য কিচেন ক্লক” গল্পে। অন্যতম সেরা ওয়ার-লিটারেচার এটি। যুদ্ধফেরত এক সৈনিক, রাত আড়াইটেতে তার রান্নাঘরের ঘড়িটা বন্ধ হয়ে আছে। ওই সময় কি বোমা পড়েছিল বাড়িতে? ওই সময়? যে সময়ে উলের কার্ডিগান আর লাল শাল গায়ে দিয়ে খালি পায়ে মা এসে দাঁড়াত খাবার টেবিলে, শুধু বলত রোজ, ‘আজ আবার দেরি’? পার্কের বেঞ্চে নীল-সাদা ঘড়িটা থেমে থাকে ঠিক আড়াইটেতেই। মা’কে মনে পড়ে। যুদ্ধে হারিয়ে গেছে বহুকিছু। পরিবার, সম্পর্ক। থেমে থাকা ঘড়িতে চুপ করে ঘাপটি মেরে বসে থাকে অপদার্থ অপ্রয়োজনীয় একটা যুদ্ধ। আহা! অনুবাদটি বড় স্বচ্ছ। বড় কাব্যিক।

রাজ্য মহিলা কমিশনের সদস্য হওয়ার সুবাদে সাংবাদিক স্রবন্তীর বহু অভিজ্ঞতা। তার কাছ থেকে তার মুখেই শোনা হল এক আশ্চর্য গল্প। ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন। এক প্রতিষ্ঠিত নারী আর তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের মধ্যে এসে দাঁড়ায় সেই পরিবারের আরেক সদস্য। ভদ্রমহিলার স্বামী। ব্যস্ত অধ্যাপিকার জীবনে অত্যাচারী অথচ অত্যন্ত সুপুরুষ স্বামীর প্রতি তাঁর ডেডলি অ্যাডিকশান— গার্হস্থ্য হিংসা এবং সাইকোপ্যাথির এক গায়ে কাঁটা দেওয়া কাহিনি। গল্প হলেও সত্যি।

শ্যামলীর ‘পাপবোধ’ গল্পটি মেয়েমানুষের মনের কোন অন্ধকার দিকে আঙুল তুলে দেখায়। আপাতভাবে খুব সাদামাটা গল্পটি অরণ্যা নামে এক মেয়ের যেন মধ্যবিত্তের বাস যাত্রার ডায়েরী বলে শুরু হয়। লেখকের হাতে সেই সামান্য বাসযাত্রা অসামান্য হয়ে ওঠে তাঁর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে। শ্যামলীর শব্দ বন্ধন নাড়া দেয় গল্প শুনতে শুনতে। সবশেষে অন্য একটি মেয়ের পড়ে যাওয়া পার্স টি কুড়িয়ে নিয়ে অরণ্যা ভাবতে থাকে তার মধ্যে রাখা টাকা দিয়ে নিজের অতি পছন্দের শাড়ি কিনবে কি না। অন্যদিকে সেই পার্সের মালকিন তখন বাস থেকে নেমে রাস্তায় খুঁজতে থাকে সেই পার্স। এই দু-তরফের মানসিক টানাপড়েন শ্যামলীর কলমে বাস্তবিক হয়ে উঠল। সেদিক থেকে গল্পের নাম পাপবোধ সার্থক।  

বুবুন চট্টোপাধ্যায় শোনালেন “বাসনা”। এক মুসলমান সাংবাদিকের শিকড়ের খোঁজ আবার দেশভাগের যন্ত্রণাকেই যেন মনে করিয়ে দেয়। অগাধ পড়াশোনা করা শামিম মদ্যপান ছাড়তে চায়, চাকরি চলে যাওয়ার পরে সে লিখতে চায় এক আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। তার দাদু ফরিদপুর থেকে এদেশে আসেন ১৯৫৭ সালে। দাদু আসিফ আফসারের সঙ্গে জড়িয়ে যায় মাজদিয়া গ্রামের অম্বিকা দাশগুপ্তর নাম। শামিমের বাবা সমীর আফসার, মা নীলিমা আফসার কিন্তু স্ত্রী নন্দিনী হিন্দু। জাহিদুলের সঙ্গে ফরিদপুরের গ্রামে গিয়ে শামিম জানতে পারে এক নির্মম সত্য। তাদের পরিবারে লুকিয়ে থাকা এক মর্মান্তিক অপমানের কাহিনি।

সোনালী মুখোপাধ্যায়ের ‘আকাশের মতো নীল’ এক দুর্দান্ত রোম্যান্টিক রিলিফ। ক্যাব-চালক আজিজুল আর তার সদ্যবিবাহিত বিবি রেশমার দিওয়ানাপন। দেশে ফুফার মেয়ের বিয়ে। মেহেন্দির রঙ লাগছে মনে, কাঁচের চুড়ির গোছায় ‘পিয়া বিনা জিয়া তরসায়’। চাচার দেওয়া চাকরি থেকে ছুটি পাবে না আজিজুল। কোম্পানির গাড়ি চালানো ছেড়ে ছুটি পাওয়া এতই সোজা? অনন্ত ফোনে প্রেমালাপ আর মধুর বিরহের উঁকিঝুঁকি। দো টাকিয়া কি নৌকরি ছেড়ে কি আজিজুল ফিরে গেল রেশমার কাছে? মাত্র তো কয়েকদিন। আবার না হয় আজিজুল ফিরে আসবে এই ইঁট-কাঠ-পাথরের জঙ্গলে। ফোনে ফোনে রচিত হবে বিরহের মেঘদূত।

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের কুশলী কলমে ‘এক পাগলের গল্প’ যেন সমাজের এক টুকরো যন্ত্রণার নিটোল ছবি। ছেঁড়া প্যান্ট, খালি পা, মাঝবয়সী বিজয় পাল আর তার মাতৃহীন ছেলের গল্প। একমাত্র ছেলেকে তার মানুষ করতেই হবে। সেই ছোট্ট নুটুকে নিয়েই পাগল লোকটার যতরাজ্যের চিন্তা। সে কি সত্যিই পাগল? পাগলেরা কি চিন্তাশূণ্য হয়? লেখকের জবানিতে নুটু আর তার বাবার এক সামাজিক উত্তরণ হয়। একটু একটু করে খোসা ছাড়িয়ে দেখা যায়, কে কেন কবে কোথায় বঞ্চিত করেছে তাদের। অল্প কথায় এক বিরাট উপন্যাসের সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে ‘এক পাগলের গল্প’তে।

কৃষ্ণা রায়ের ‘শতবর্ষ পরে’ কল্পবিজ্ঞানের এক আশ্চর্য যাত্রাপথ, স্বাধীনচেতা রিনির অস্থায়ী দাম্পত্যের পাশাপাশি ২১১৫ সালে ৭৫ বছরের জন্মদিনের প্রস্তুতি। যখন মানুষের গড় আয়ু ১৩০ থেকে ১৪০ বছর। এখন ক্লোরোজিন থেরাপিতে ক্লোরোফিলের জিন দেওয়া হচ্ছে হাত-পায়ের চামড়ায়। দিনে কয়েকঘন্টা রোদ। ব্যস। ফিকে সবুজ হাত-পা কিছুদিন। তারপর সব স্বাভাবিক। নিঃসঙ্গ সমুদ্রপাড়ে গাছ-মানুষীকে ছুঁয়ে যায় গাঢ় মধ্যরাতের আকাশ। ভিজে ভিজে অনুভূতিতে কোনও সম্পর্কের জন্য বাড়তি সময় নেই। জানালার বাইরের অন্ধকারে, হাওয়ার ঝাপটায় এক ভবিষ্যতের কাঁপন। 



 
খুদে গল্পকার শ্রীপর্ণা ঘোষের স্বরচিত গল্প পাঠ
যুগশঙ্খ রবিবারের বৈঠক ২১শে জুলাই ২০১৯ 


দশ গল্পের শেষে কবজি ডুবিয়ে খাওয়া। কাঁসার থালা-গ্লাস-বাটিতে চিংড়ি-পোলাও, মাছের পুর ভরা পটলের দোরমা, খাসির কষা মাংস, রথের পাঁপড়, কাঁচা আমের চাটনি আর সিমুইয়ের পায়েসে এক মায়াময় শিকড়ের টান। বাঙালি খাবারের আন্তরিক পরিবেশনে মনের মধ্যে জাঁকিয়ে বসে নস্ট্যালজিয়া। গুণী শিল্পী অরিন্দম-স্রবন্তী যুগলে গেয়ে ওঠেন ‘খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি আমার মনের ভিতরে’। বাইরে তখনও রোদ ঝলমল। রথ বেরিয়েছে পথে। ধূলামন্দিরের পাশ দিয়েই আমাদের ঘরে ফেরার পথ।

প্রতিবেদন লিখলেন শ্যামলী আচার্য 



বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন, ২০১৯

গল্পবৈঠক "৩০" @ ‘আড্ডা’ নিউ জার্সি র পত্রবৈঠক, উনিশে মে, ২০১৯




শুরুটা হয়েছিল নিতান্তই সাদামাটা । পূর্ণেন্দু পত্রীর ভালোলাগা কবিতা মুখপুস্তিকায় পোস্টিয়ে 'আড্ডা' লিখেছিলো - “তোমার চিঠি আজ বিকেলের চারটে নাগাদ পেলাম /দেরী হলেও জবাব দিলে সপ্তকোটি সেলাম........আসবে কি সেই রেস্টুরেন্টে শীতাংশু  যার মালিক?/রুপোলী ধান খুঁটবে বলে ছটফটাচ্ছে শালিক ।”সেখান থেকেই বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া ।  সুস্মিতা রায়চৌধুরী লিখলো - 'চিঠি নিয়ে একটা বৈঠক করলে কেমন হয় ?' সঙ্গে সঙ্গে সোৎসাহে উত্তর - 'হোক, হয়ে যাক তাহলে' ।  সোনায় সোহাগা হলো কলকাতার নামী লেখিকা ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের এদেশে উপস্থিতি ।  ঠিক হলো পত্রসাহিত্যের ডালি নিয়েই 'আড্ডা' ইন্দিরা আর দেবজ্যোতি চ্যাটার্জীদা-র সঙ্গে বৈঠকে বসবে উনিশে মে, রবিবার বিকেলে ! উনিশে মে দিনটি বিশেষ করে স্মরণীয় কারণ এই দিন ভাষা আন্দোলনের আর এক শহীদ দিবস ।  বাংলা ভাষার অধিকারের দাবীতে এ দিন আসামের বরাক উপত্যকায় রক্ত ঝরেছিল  ।  

প্রদীপ জ্বালার আগে সলতে পাকানোর কাজ শুরু হলো পুরোদমে। পত্রবৈঠকের আয়োজন হবে আর রবীন্দ্রনাথের ‘স্ত্রীর পত্র’ মনে পড়বে না - তাও কি হয় ? সেই যে 'চরণতলাশ্রয়ছিন্ন' মৃণাল নিজের মতো করে বাঁচার আনন্দ তার চিঠির ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে দিয়েছিলো, সেখান থেকেই তো বাংলাভাষায় প্রথম সার্থক পত্রসাহিত্যের শুরু ।  তারপর তাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেলেন বুদ্ধদেব গুহ - 'সবিনয় নিবেদন' ।    পত্রবৈঠকের আগের সপ্তাহে প্রতিদিন ‘আড্ডা’ প্রকাশ করেছে সুপরিচিত লেখক /লেখিকার পত্রসাহিত্য ।  ছিলেন শামসুর রহমান, তসলিমা নাসরিন, রাজা সিংহ এবং এমন কি সলিল চৌধুরী !

বাঙালী ভোজনরসিকও বটে, সাহিত্যরসিকও বটে ।  এহেন বাঙালির মনোরঞ্জন করার জন্য ‘আড্ডা’  এক অভিনব উপায়ে পত্রবৈঠকের খাদ্যতালিকা পেশ করে ।  সে এক রূপকথার কাহিনী যেখানে ভোজনরাজ্যে রাজকন্যা লুচির স্বয়ংবর সভায় উপস্থিত থাকেন রাজকুমার ছোলার ডাল, মহারাজ ডিম্ব, প্রেমিক মালপোয়া কুমার ।  সুরসিক পাঠক পাঠিকা তৎক্ষণাৎ লক্ষ্য করেন লুচিকুমারীর আবাল্য সহচর রাজকুমার আলুর অনুপস্থিতি ।   জয়শ্রী পাইন প্রশ্নবাণ হানেন - 'রাজকুমার আলুর কি দম ছুটিয়া গিয়াছে ? সভায় অনুপস্থিত দেখিতেছি ?' এর পরের কাহিনীটি বিরাট ।  কেবল এইটুকু বলি, জনসমর্থনের চাপে পড়ে ভোজনরাজ, রাজপুত্র আলুকে স্বয়ম্বর সভায় শেষমুহূর্তে আমন্ত্রণ জানাতে বাধ্য হয়েছিলেন । আলু রাজকুমার একটি ধুরন্ধর কূটনীতির চালে মালপোয়া কুমারকে  ধরাশায়ী করেন ও রাজকন্যা লুচির বরমাল্য লাভ করেন ।  বিশদ বিবরণের জন্য ‘আড্ডা’র মুখপুস্তিকা দ্রষ্টব্য । 

পত্রবৈঠক বসেছিল দুপুরবেলা, সবুজ ঘাসে ছাওয়া, খোলা ব্যাকইয়ার্ডে, গাছগাছালির মাঝে, পাখির কূজনকে সঙ্গী করে ।  প্রকৃতিদেবী দুহাত ভরে  দিয়েছিলেন তাঁর আশীর্বাদ ।  রোদ্দুরে ধোয়া দিন, প্রথম গ্রীষ্মের মনোরম আবহাওয়া আর  ব্যাকড্রপে ‘আড্ডা’র ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, ফুটবল, মাছের ছবি আর আল্পনা - বৈঠকের সব আয়োজনই সারা ।  বিদিশা মুখোপাধ্যায়ের নিটোল মিষ্টি গলায় বেজে উঠলো - 'একটা গান লিখো আমার জন্য' ।   তারপর অমায়িক দেবজ্যোতিদার হাতে মাইক, তিনি উৎসাহ যোগালেন আরো আরো লেখার জন্যে, যাতে আরো আরো এমন বৈঠকের আয়োজন করা যেতে পারে ।  

ইন্দিরার বক্তব্যে প্রথমেই ছিল উনিশে মে, এই দিনের বৈশিষ্ট্য, ভাষা শহীদ দের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।  ইন্দিরা বরাবরই নতুন লেখকদের পৃষ্ঠপোষক ।  আমাদের উৎসাহ দিলো ।  নতুন লেখা লিখে নিয়মিতভাবে এমন পাঠের আসর আয়োজন করার গুরুত্ব যে কতখানি - সেটা বারবার মনে করিয়ে দিলো ।  ইন্দিরার অকুন্ঠ প্রশংসায় ‘আড্ডা’র এই প্রচেষ্টা ধন্য হলো ।   চন্দ্রিমা বন্দ্যোপাধ্যায় পড়ল নিজের বান্ধবীর লেখা চিঠি, সাহিত্যরসে ভরপুর ।  সম্পাদিকা অনসূয়া সেন ছোট্ট বক্তব্যে নিজের জাত চেনাল, পরিচয় করিয়ে দিল 'সংবাদ বিচিত্রা'র সঙ্গে ।  নতুন নতুন লেখা পাঠাতে অনুরোধ করল ।  আমরা উৎসাহিত হলাম, সম্মানিত হলাম ।  সুদীপ্তা চট্টোপাধ্যায় বলে ওর সব লেখারই উৎস নাকি কোন না কোন দু:খ ।   পত্রবৈঠকে পাঠ করা ওর লেখাটি মানুষের মান আর হুঁশটাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়ে গেলো । মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী এসেছিলো তিনটি ভিন্নস্বাদের চিঠি নিয়ে ।  তার একটিতে মা তার এখনো-ভূমিষ্ঠ-না-হওয়া গর্ভের সন্তানকে লেখা চিঠিতে মনের আগল খুলে দেয় ।   আরেকটি চিঠিতে থাকে দ্রুতগামী পৃথিবীকে দূর থেকে দেখা আর অনুভবের মায়া ।  এরপর ইন্দিরা ।  তার নিজের উপন্যাস কলাবতী কথা থেকে পড়ে শোনালো নতুন দেশে গিয়ে এক মেয়ের বিস্ময়ভরা চিঠি, তার মাকে লেখা ।  সে চিঠির ছত্রে ছত্রে জেগে ওঠে এক অন্ত্যজ মেয়ের চোখে দেখা এক নতুন পৃথিবী - বিস্ময়ে জাগে আমার প্রাণ ।  পদ্মাসনা বন্দ্যোপাধ্যায় এলো তার মায়ের লেখা পত্রসাহিত্যের উপহার নিয়ে ।  স্বদেশে বসে এক প্রজন্ম আগের লেখিকার কলমে সে গল্প আমাদের গতানুগতিক ফীল-গুড ভাবনাচিন্তা কে আপাদমস্তক ঝাঁকিয়ে দিয়ে যায় ।  মাকে লেখা এক মেয়ের চিঠি, যে মেয়ে শুয়ে আছে মর্গের ঠান্ডা, হিমশীতল ঘরে ।  জীবন থেকে পাওয়া বঞ্চনা আর যন্ত্রণার কথা মা ছাড়া আর কাকেই বা সে বলবে ? মায়ের লেখা গল্প-চিঠি পাঠ করলো বিদেশবাসী কন্যা ।  জীবনের কোথাও এক বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো ।  

এরপর ভোজনরাজ্যে নিমন্ত্রণ রক্ষার পর্ব, যদিও সংক্ষেপে, কারণ সময় কম, সাধ অনেক ।  লুচিকুমারীর স্বয়ংবর সভায় ছিল শব্দছক, ছিল সাহিত্য নিয়ে প্রশ্নোত্তরের আসর ।  সুরসিক শুদ্ধসত্ত্ব আচার্য তার প্রশ্নবাণে শ্রোতাদের ধরাশায়ী করতে চেয়েছিল কিন্তু পেরে উঠলো না ।  শ্রোতারা যারপরনাই বুদ্ধি ধরেন ।  

পত্রবৈঠক এবার দ্বিতীয়ার্ধে, দ্বিতীয় অধিবেশনের প্রথমেই অদিতি ঘোষ দস্তিদার তার ছেলেবেলার সই বিদীপ্তার কাছে চিঠিতে মন উজাড় করলো ।  দুই সখীর মান-অভিমান, আড়ি আর ভাব, স্কুলের সেই হালকা হাওয়ায় ভাসা দিনগুলি ফিরিয়ে দিলো শ্রোতার কাছে ।  ছেলেবেলা (নাকি মেয়েবেলা?) ফিরে পেলাম আমরা ।  সাহানা ভট্টাচার্য বাজলো এক্কেবারে অন্য সুরে ।   ছোট্ট তিন মিনিটের একটি লেখা, রসে টইটম্বুর ।  বক্তব্য - বঙ্গদেশ থেকে এক জননী তাঁর চির-অবাধ্য, পাঠে অমনোযোগী, কুলকলঙ্ক, বিদেশবাসিনী জ্যেষ্ঠাকন্যাটির মুখদর্শন করবার সুতীব্র বাসনায় শেষমেশ একটি স্মার্টফোন কিনে অতীব মনোযোগে হোয়াটস্যাপ শিক্ষা করে তাঁর ষষ্ঠীব্রত উদযাপন করলেন ।   সোফিয়া মিত্রর ছোট্ট লেখা । কিন্তু তাতে সব প্রবাসীর হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণার অভিব্যক্তি  ।   প্রবাসে উন্নত কিন্তু কৃত্রিম দুনিয়ায় নিজেকে দামী মুক্তোর গয়নায় সজ্জিত করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ চোখ যায় ঝাপসা হয়ে  ।  মনে পড়ে যায় দূর দেশে পড়ে থাকা মা বাবার কথা, যারা শুক্তির মত সব যন্ত্রণা ভোগ করে তিলতিল করে গড়ে তুলেছে আমাদের ! সংগ্রামী লাহিড়ী তার লেখায় উনিশে মে র ইতিহাস তুলে ধরলো ।  সুস্মিতা রায়চৌধুরী তার নৃত্যানুষ্ঠান সেরে পত্রবৈঠকে পৌঁছতে পারে নি, কিন্তু তার লেখাটি সে 'আড্ডা'র ডাকবাক্সে ফেলে দিতে ভোলেনি ।  বড়ো মন-কেমন করা চিঠি, নিজেরই মনের সঙ্গে আলাপচারিতা, জীবনের ঝাঁপি উজাড় করে একাকিত্ব ভোলা - ঠিক যেন একটি বিষাদমধুর কবিতা । 

'আড্ডা'র প্রথম সাহিত্য-বৈঠককে স্মরণীয় করে রাখতে 'টিম আড্ডা' তৈরী করেছিল ম্যাগনেট ।  হাতে আঁকা 'আড্ডা'র লোগো, তার সঙ্গে বৈঠকের দিনক্ষণ - সবাই পেলেন একটি করে ।  ম্যাগনেট মনে করিয়ে দেবে খোলা হাওয়া প্রাণে লাগিয়ে সাহিত্য বাসরের সুখস্মৃতি ।  আর ইন্দিরা ও দেবজ্যোতি-দা কে  সম্মান জানিয়ে উপহার ছিল কাঠের ফলক, একইরকম হাতে আঁকা ছবি দিয়ে সাজানো ।          

শেষে আবার ইন্দিরা ।  এবার তার নিজের লেখা একটি ছোট গল্প দিয়ে শেষ হলো পত্রবৈঠক ।  কিন্তু শেষ হয়েও যে হইল না শেষ ! গোধূলি আলোয় বসলো গানের আসর, সুর ছড়িয়ে গেল সাঁঝ আকাশে, পুকুর-ভরা টলটলে জলকে আলতো ছুঁয়ে, ইথার তরঙ্গে ভেসে বিলীন হলো মহাশূন্যে ।  রয়ে গেল ভালোলাগা, রইলো 'আড্ডা'র সংকল্প - আবার হবে, আবার আসবো গল্পের ডালি নিয়ে, আবার একসাথে মিলবো সবাই বাংলাভাষাকে ভালোবেসে । 














নিউজার্সি থেকে প্রতিবেদন টিলিখেছেনঃ সংগ্রামী লাহিড়ী 

শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৯

বর্ষশেষের গল্পবৈঠক ২৯


৪২৫  বাংলা বর্ষশেষের দিনটিতে সাহিত্যিক শ্রীমতী সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিউটাউনের গৃহে তাঁর আন্তরিক আতিথ্যে জমে উঠেছিল উনত্রিশতম গল্প বৈঠকের আসর।শুরুতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরমূর্ছনায় আসরের মূল সুরটি বেঁধে দেন সুগায়িকা শ্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর একে একে গল্প ও কবিতাপাঠে বৈঠকী মেজাজটি জমে ওঠে।

সেদিনের স্বরচিত গল্পপাঠে ছিলেন ন'জন। পূর্বা মুখোপাধ্যায়, দ্বৈতা গোস্বামী,সাবিনা ইয়াসমিন,মহুয়া মল্লিক,দীপা চ্যাটার্জী,সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়, যশোধরা রায়চৌধুরী, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়,ও সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের টানটান গল্প ‘আফটারম্যাথ’, সাবিনা ইয়াসমিনের ‘আহারে জীবন’, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের ‘ব্যাভিচারিনী’, মহুয়া মল্লিকের ‘শঙ্খলাগা’, পূর্বা মুখোপাধ্যায়ের ‘বীরত্ব’,সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জননী’,আর যশোধরা রায়চৌধুরীর ‘তরিবৎ’ যেন এই পরিবর্তিত সময়ের সমাজজীবনের নানা রূপ,নানা মুখ নিয়ে গড়ে ওঠা বিচিত্র সব সম্পর্কের রূপকথা। সেদিনের গল্পপাঠের আসরে হঠাত উপস্থিত দ্বৈতা গোস্বামীর ‘প্রবোধবাবুর বাবা’ বা দীপা চ্যাটার্জীর ‘শ্রীময়ী আদর সমীরণ’ ছিল রম্যগল্পের সার্থক পরিবেশন।

পরিবেশটি আরো সমৃদ্ধ হয় কবি সুতপা সেনগুপ্ত, কাবেরী গোস্বামী এবং বুবুন চট্টোপাধ্যায়ের একাধিক কবিতাপাঠে। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে তাদের কবিতাপাঠ খোলা জানলার মুক্ত বাতাসের স্নিগ্ধতা বয়ে আনে।

সবমিলিয়ে এবছরের শেষ গল্পবৈঠকটি যেন আগামী বছরের নতুন কলমে নতুন কালির শুভ সংযোজন হয়ে উঠল।   

প্রতিবেদনঃঃ সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

রবিবার, ৩১ মার্চ, ২০১৯

গল্পবৈঠক ২৮ @ সাঁইথিয়া, বীরভূম

আনন্দবাজার পত্রিকা
০১৯ এ গল্পবৈঠকের মুকুটে আরেকটি পালক সংযোজিত হল। গত ২৩শে মার্চ বীরভূমের সাঁইথিয়া শহরে শশীভূষণ দত্ত বালিকা বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হল গল্পবৈঠকের ২৮তম সাহিত্যবাসর। ২০১৬র হুগলী জেলার উত্তরপাড়ার পর এই নিয়ে দ্বিতীয়বার পশ্চিমবঙ্গের কোনও জেলায় আয়োজিত হল এই গল্পপাঠের আসর। কলকাতা থেকে হাজির হয়েছিলেন গল্পকার ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। সাঁইথিয়ার গল্পকার সুজাতা রায়ের তত্ত্বাবধানে অন্য্যন্য গল্পকারেরা ছিলেন মিলি মজুমদার, ব্রততী মন্ডল রায়, ঝিমকি বন্দ্যোপাধ্যায়, মিতালী দাস গোস্বামী, সুনেত্রা সাধু এবং সৌমী সিংহ । সমগ্র অনুষ্ঠানটি সুচারু হস্তে সঞ্চালনার দায়িত্ত্বে ছিলেন কবি, লেখক, নাট্যকার শ্রী বিজয় কুমার দাস। শনিবারের দুপুরে মধ্যাহ্নভোজের পর সুখনিদ্রায় ডুব না দিয়ে হাজির হয়েছিলেন সাঁইথিয়ার অজস্র মানুষ, যারা বাংলা ছোটগল্প শুনতে ভালোবাসেন।  
বিজয়কুমার দাস

বিজয়কুমার দাস অনুষ্ঠানের শুরুতেই বললেন সাঁইথিয়ার হারিয়ে যাওয়া ব্যাবসা বাণিজ্যের ঐতিহ্যের কথা। আর সেই লক্ষ্মীর হাত ধরেই এই অঞ্চলের মানুষ এখানে সরস্বতী বন্দনায় ব্রতী হতেন বহু যুগ আগে থেকেই। তাই সারস্বত চর্চায় বীরভূমের সাঁইথিয়া শহরের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। গ, ল আর প নিয়ে গল্প শব্দটির তাত্পর্য ব্যখ্যা করলেন তিনি। গ এর অর্থ গল্পের গমন, ল এর অর্থ লিখন এবং প এর অর্থ হল পঠন। তাই একজন গল্পকার কিভাবে গল্পের জ্বাল বুনছেন এবং কেমন তার বিন্যাস আর সর্বোপরি পাঠক বা শ্রোতা কেমন ভাবে তা নিচ্ছেন সেটা জানা বোধহয় সবচেয়ে প্রয়োজন গল্প লিখিয়েদের। একটি পাঠযোগ্য গল্প একজন পাঠক বা শ্রোতার কাছে গ্রহণযোগ্য হলেই সেই গল্প লেখার সার্থকতা। 
সৈয়দ হাসমত জালাল

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কবি, লেখক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসমত জালাল। স্বাগত ভাষণে শ্রীমতী সুজাতা রায় অনুষ্ঠানের মূল সুরটি বেঁধে দেন এবং তাঁকে অনুসরণ করেই এক অত্যন্ত আন্তরিক এবং অনাড়ম্বর পরিবেশ রচিত হয়ে ওঠে। স্বরচিত প্রতিটি গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র নারী। সমাজের প্রত্যন্ত স্তর থেকে শুরু করে মফঃস্বল এবং শহরের আধুনিকা নারীদের মনস্তাত্বিক এবং সামাজিক ওঠাপড়া কে ঘিরে আটটি ছোটগল্পের মনোজ্ঞ আলোচনা করেন সভাপতি সৈয়দ হাসমত জালাল। বলাই বাহুল্য তাঁর এই সাবলীল আলোচনা অনুষ্ঠানটিকে বিশেষ মাত্রা দেয়।কানায় কানায় উপচে পড়া শ্রেণীকক্ষে শব্দ বলতে শুধু ছিল চৈত্রের ঝরাপাতার খসখস আওয়াজ আর মাঝেমধ্যে ছিল ইতিউতি কোকিলের কুহুতান। শুধুমাত্র বাংলাভাষাকে ভালোবেসে গল্প শুনতে আসা এমন নিমগ্ন শ্রোতা যেকোনো অনুষ্ঠানের গর্ব। সাঁইথিয়াবাসীর কাছে সেই কৃতজ্ঞতার কথা জানাতে ভোলেন নি ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। 



কবি হাসমত জালাল বললেন, "আমরা যারা পুরুষ রচিত সাহিত্য নিয়ে চর্চা করে নিজেদের সাহিত্যমনস্ক করে তুলি তাদেরো বিস্মিত হতে হবে প্রত্যেক নারীর রচনা শুনলে বা পড়লে। প্রতিটি গল্পে নিম্নমধ্যবিত্ত মধ্যবিত্ত থেকে এবং উচ্চবিত্ত মেয়েদের কথা উঠে এসেছে। গ্রামীন মানুষদের কথা বাদ দিয়ে সাহিত্য রচনা করলে একধরণের আত্মপ্রবঞ্চনা হবে বলে আমার মনে হয়। অধিকাংশ গল্পের মূল চরিত্র একজন নারী। গ্রাম্য মানুষ হয়ে তাদের যে সংবেদনশীলতা, মানবিকতা সেগুলি যেমন সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে তেমনি শহুরে মানুষদের চরিত্র চিত্রায়নেও সফল গল্পকারেরা। 

মিতালী দাসের চিঠির আঙ্গিকে লেখা "অর্ধেক আকাশ" গল্পটিতে শাশুড়ি বৌয়ের কথোপকথন উঠে আসে। সমাজের বহু চর্চিত বিষয়। নারী নিজের অজান্তে পুরুষতন্ত্রে বড় হতে হতে নিজেদের হাতে ক্ষমতা তুলে নেয়। সেই জেরে অমানবিক হয়ে পড়ে শাশুড়ি বীণাপাণি দেবী । হয়ে ওঠেন তাঁর সংসারের চিরন্তন ক্ষমতার কন্ঠস্বর।তিনি নিজে নারী হয়েও ভুলে যান যে তাঁর বৌমাও একজন নারী। তাকে প্রথম কন্যাসন্তান নষ্ট করতে বাধ্য করেন এবং দ্বিতীয় সন্তানটিও কন্যা হয়ে আসে আবারো। এবং সেখানেই গল্পের আসল মোচড়। এবার বৌমাটি মনে করছে এই দ্বিতীয় কন্যাটি‌ই ভবিষ্যতে শাশুড়িকে শিক্ষা দেবে এবং তার মনোস্কামনা পূর্ণ করবে। তার মানবিকতা দিয়ে হয়ত সে পূর্বনারীকে জয় করতে পারবে।     
পরের গল্পটি ব্রততী মন্ডল রায়ের "অভিশাপ" অত্যন্ত কঠিন, নির্মম বাস্তবতার কাহিনী।  দিন আনা দিন খাওয়া ঝুপড়িবাসীকে কেন্দ্র করে।
তাদের ঘরের মেয়েরা অভাবের তাড়নায় বড় হয়ে রোজগার করে আনে। বাড়ির লোকেরা জানতেও পারেনা কি করে সংসারে এত টাকা আসছে। ভালোই তো মেয়ে টাকা রোজগার করে আনছে। তারা বুঝতেও পারেনা সেই মেয়েকে একদিন বিয়ের নাম করে বয়স্ক পাত্রের হাতে তুলে দেয় কেউ। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে সে একদিন বিক্রী হয়ে যায়। দেহ ব্যবসায়ী হয়ে যায়। বাড়ির লোকেরা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনা। বেচারা, নিরীহ মেয়েটি বুঝতেও পারেনা তার জন্য কি অপেক্ষা করে আছে। সেখানে তার দেহের ওপর অমানবিক নির্যাতন হবে, যা ছিল মেয়েটির কল্পনার অতীত। ক্লাসরুম উপচানো উপস্থিত প্রত্যেকে যে গল্প মন দিয়ে শুনেছেন সেটাই গল্পবৈঠকের পরম প্রাপ্তি। লেখক এবং শ্রোতার মধ্যে এই নিবিড় সম্পর্ক আমাকে মুগ্ধ করেছে।  আমি নিজেও খুব আশ্বস্ত বোধ করছি বাংলাসাহিত্য, বাংলাভাষায় রচিত ছোটগল্প নিয়ে।
সৌমী সিন্‌হার গল্প "পিছুটান" সেখানে প্রধান নারী চরিত্রটি যার নিজের খাবার সামর্থ্য নেই সে পরিচারিকার কাজ করে । তার কাজের বাড়িতে পোষা বেড়ালটি বাড়ি ফেরেনি তিনদিন ধরে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আজকাল বড়োই কৃত্রিম। সেখানে পোষ্য বেড়ালটির প্রতি তার মমত্ববোধ, সংবেদনশীলতা অপূর্বভাবে ফুটে উঠেছে। সবচেয়ে ভাল লাগে শেষের অংশে যখন বেড়াল টি ঢাকা দেওয়া খাবার খেয়ে নেয়। মেয়েটির মন ভরে ওঠে কানায় কানায়।   

মিলি মজুমদারের গল্প "আতঙ্ক" তেও ছ 'বছরে মাতৃহারা মেয়ে গঙ্গার বিয়ে হল চব্বিশ বছরে। তাঁর পুত্র সন্তান হয়নি বলে বিচ্ছেদ ঘটেছিল। সেই গঙ্গাকে ধর্ষণ করে কেউ। আর পরে যখন তাঁর পুত্র সন্তান হল দেখা গেল সবাই তাকে লক্ষ্য করতে থাকে জমিদারের পুত্রর সঙ্গে সেই পুত্রের সাদৃশ্য দেখে । খুব বাস্তব চিত্র। যুগে যুগে দেখা যায় এমন ঘটনা। সমাজের তথাকথিত নিম্ন বর্গের মানুষ বড়লোকদের কাছে অস্পৃশ্য। কিন্তু তাকে স্পর্শ করে পুরুষের কামনা চরিতার্থ করার বেলায় সে আর অছ্যুত থাকেনা। বাধা থাকেনা তাকে ছুঁতে। এমনই সমাজের পরিহাস।

 ঝিমকি বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প "করমটিলার ইতিকথা" এক প্রত্যন্ত গ্রাম্য নারীকে কেন্দ্র করে যাকে দেবীজ্ঞানে পুজো করা হয়। ময়ূরাক্ষীর তীরে জঙ্গলাকীর্ণ করমটিলার হতদরিদ্র ভল্লা পরিবারে হঠাত করে আগত এক যুবতীকে সেই গ্রামের মেয়ে মরদ হাঁড়িয়ার ঘোরে তাকে দেবীজ্ঞানে পুজো করতে থাকে। মূহুর্তেই সেই যুবতীর মানবী থেকে দেবীতে উত্তরণ ঘটে।পুণ্য সঞ্চয়ের আশায় সবাই সেই দেবীকে কাজে লাগাতে চায়। দেবী রোগের উপশম করেন। বিশ্বাস জন্মায় সকলের। গোটা গ্রামে সবাই দেবীর মাহাত্ম্য অনুভব করে। সবাই জয় দেয় দেবীর নামে। দেবীর প্রতিপত্তি বাড়ে। ভক্তদের আনুগত্যে দেবীর অভাবও ঘোচে। হঠাত বর্ষার আগমনে ময়ূরাক্ষীতে বন্যার আশংকা। বাঁধ ভেঙে গ্রাম বানভাসি হবার আশংকা। তখন দেবীকে জাগানোর কথা মাথায় আসে। তিনি‌ই সেই মূহুর্তে একমাত্র ভরসা তাদের। রাতের বেলায় সবাই যখন ঘরে ফিরে যায় সেই গ্রামের শক্তপোক্ত বীরপুরুষ ধুঁধুল সবাইকে জেগে বাঁধ পাহারা দেবার কথা বলে। শীতলা জ্ঞানে পূজিতা সেই দেবীর থানে কাঠি, তেলের কুপি জ্বালিয়ে হাজির হয় ধুঁধুল। কিন্তু দেবীর রূপ দেখে নিজেকে সামলাতে পারেনা সে। ঝাঁপিয়ে পড়ে সে মানবী শীতলাদেবীর ওপর। নিজের বিচারবুদ্ধি লোপ পায় তার। দেহরসের টানাপোড়েনে জর্জরিত ধুঁধুল সব ভুলে যায়। ওদিকে নদীর জল নেমে প্রকৃতি শান্ত হয়। খরিস সাপে কাটে ধুঁধুলের ছেলেকে। তার বৌ রাইমণি ছেলেকে নিয়ে ছুটে যেতে চায় মায়ের থানে। বাধা দেয় ধুঁধুল। বলে ও দেবী নয়, মানবী। ততক্ষণে ছেলে সাপের বিষে মারা যায়। রাইমণি দোষারোপ করে স্বামীকে। দেবীর রোষেই সে পুত্রহারা হয়েছে সে জানায়। এভাবেই একদিকে কুসংস্কার অন্যদিকে নারীকে ব্যাবহার করে তাকে কাজে লাগিয়ে গ্রাম্যজীবনের টানাপোড়েন পর্বের সমাধা হয়।  

সুনেত্রা সাধুর গল্প "বারোতলার বারান্দা"। সেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র দিতির সংসার অরণির সঙ্গে। বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ নয় তারা। তার মনখারাপের বারান্দা বারোতলার ওপরে বসে সে শীত, গ্রীষ্ম বর্ষা অনুভব করে। কোথাও যেন ফাঁক তার জীবনে। স্নানঘরে ঢুকে সে কেঁদে ভাসায়। এ জীবন তাকে বিষণ্ণ করে। কেন এমন হয় তার?  চলে যেতে হবে তাকে এই বারোতলা থেকে। অরণি আর আগের মত ভালোবাসেনা তাকে, সেটাই কেবলি ভাবায় দিতি কে।  কিন্তু বারান্দায় লাগানো গাছগুলোর প্রতি মায়া। জল দেবার কথা বলে যেতে হবে অরণি কে। কি অপূর্ব এক মমত্ববোধ আর আকর্ষণ এই যাবার বেলায়। পিছু ডাকে দুজনের হাতে কেনা উইন্ডচাইমের মৃদু শব্দ। আধুনিক জীবনের মধ্যে প্রবেশ করেছে লিভ-ইন সম্পর্ক। দিতি আর অরণিও তার স্বীকার। তবুও যদি প্রকৃত বন্ধন হত। তাই সে চলে যেতে চায়। মনের টান নেই আর।  আর তারপরেই  দিতির জন্মদিনের সারপ্রাইজ পার্টি অর্গানাইজ করে অরণি। এলাহী আয়োজন অথচ সবটাই অজানা ছিল। সব আত্মীয়স্বজনকে নিমন্ত্রিত করেছে অরণী সেই জন্মদিনের পার্টিতে। কিন্তু সবটাই দিতির অজান্তে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে দুটি সম্পর্কে জোড়া লেগে যায়। দিতি মুগ্ধ হয় অরণির ভালোবাসায়। আর গল্পের মধ্যে এই পজিটিভ বার্তা এখনকার ভেঙে যাওয়া বহু বিচ্ছেদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে" এভাবেও ফিরে আসা যায়" 

সুজাতা রায়ের গল্প "আমরা ওরা" একজন শহুরে এবং একজন গ্রাম্য নারীকে কেন্দ্র করে। শহুরে এক মহিলার বাড়িতে পুরোণো পরিচারিকা বিজুরী হাজরার মেয়ে বকুলমণি তার সংসার সামলাত । গৃহকর্ত্রীর আদরের বিদুষী কন্যারত্ন তুতু বিদেশে চাকরীরতা। বকুলকে ছোট থেকে পড়ানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। প্রথম প্রথম সমাজসেবী হয়ে উঠছেন ভেবে শুরু করেও ছেড়ে দিলেন অচিরেই। এবং ছোটঘরের মেয়েটির যেন পড়াশুনো না শিখলেও চলবে সেইরকম মনোভাব। নিজের মেয়ের সঙ্গে বড় করতে গেলেন কিন্তু কোথাও যেন কাজ করল তাঁর আত্মম্ভরিতা। সেই বকুলের ভরভরন্ত যৌবনে বিয়ে হল একদিন। সে চলে গেল শ্বশুরঘরে। তুতু বিদেশ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা পাঠালো তার বিয়েতে। ক্রেডিট নিলেন সেই কর্ত্রী। যেন তাঁর মেয়ের দয়াতেই আজ বিয়েতে এত ঘটা হল বুঝি। একদিন নিজে যখন হাজির হলেন বকুলের নতুন সংসার দেখতে সেখানে গিয়ে অবাক তিনি। তাঁদের ধনী পরিবারের সব অনুষঙ্গ অণুকরণ করেছে বকুল। আবারো রীতিমত ঈর্ষাণ্বিত হলেন। মনে হল যা হবার নয় তাই হয়েছে। তাঁর মেয়ে তুতুর পাঠানো মহার্ঘ্য ডলারে সুখে স্বচ্ছন্দ্যে ঘরকন্না করছে পরিচারিকার মেয়ে এহেন বকুল? সুখী গৃহকোণে লক্ষ্মীশ্রী যেন উথলে উঠছে। কি পরিপাটি তার সংসারে। অথচ তাঁর মেয়ে তুতুকে কিছুতেই রাজী করানো গেল না বিয়েতে।  আর সেখানেই গল্পকার হিসেবে সার্থক সুজাতা। ট্যিপিকাল একজন মহিলার অন্য আরেকজনের প্রতি ঈর্ষাণ্বিত হবার ঘটনা, যা আমাদের অতি পরিচিত। অথচ এই বকুল কর্ত্রীর দুর্দিনে বুক দিয়ে আগলেছে তাঁর সংসার। কিন্তু মেয়েদের ঈর্ষা, হিংসার কাছে বিচারের সব বাণী অচিরেই ভেসে যায়। তার বাড়িতে গৃহকর্ত্রীর আতিথেয়তার কোনো ত্রুটি রাখেনি। তবুও তাকে হঠাত খারাপ লাগতে শুরু করল সেই গৃহকর্ত্রীর। নারীমনের চোরাকুঠুরি থেকে বুদবুদ কেটে বেরিয়ে আসে শুধুই হিংসে।মনে পড়ে যায় সেই টুনটুনির গল্পের হিংসুটে রাজার কথা। রাজার ঘরে যে ধন আছে তা পাখীর ঘরে থাকাটা অবাস্তব। বকুলের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করে তাঁর। আর গল্পটি সেখানে শেষ হয়েও শেষ হয় না।    

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের গল্প "প্রেমপিল" একটি কল্পবিজ্ঞানের গল্প। কিন্তু গল্পের শেষে আমরা আবিষ্কার করি নারী পুরুষের জোরা লেগে যাওয়া বিবাহিত সম্পর্কটিকে।
"বাস্তাবিক ভাবে একটি সার্থক গল্প" বললেন আলোচক সৈয়দ হাসমত জালাল। "মেয়েরা কল্পবিজ্ঞান সেভাবে লেখেনা। কিন্তু সেখানে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন ইন্দিরা। গল্পের নামটিও চমৎকার। দৈনন্দিন জীবনে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যে চরম উদাসীন্য সৃষ্টি হয়েছিল সেটার পরিসমাপ্তি ঘটে গল্পের শেষে।শুক্তির বিজ্ঞানী স্বামী অনিমেষ দুধরনের প্রেমের বড়ি আবিষ্কারে মগ্ন। একটি ওষুধে বহুদিনের অধরা প্রেম পুনরুজ্জিবীত হবে আর অন্যটি হল প্রেম রোধক। অর্থাৎ প্রেমের বাড়াবাড়িকে রুখে দেবে। আর অনিমেষের স্ত্রী শুক্তির প্রতি সন্দেহভাজনতা তার ছাত্র প্রিয়মকে জড়িয়ে। তাই বুঝি সেই প্রেমের নিষ্পত্তি করতেই উঠে পড়ে লেগেছিলেন বিজ্ঞানী অনিমেষ। কিন্তু বুদ্ধিমতী শুক্তি ধরে ফেলেছিলেন যে তিনি‌ই হচ্ছেন তাঁর স্বামীর গিনিপিগ অর্থাত তাঁর ওপরেই পরীক্ষা চালাবেন অনিমেষ। কিন্তু শেষে শুক্তি জানিয়ে দিলেন যে প্রিয়মের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা কেবলি তাঁর এক ছাত্রীকে ঘিরে যার সঙ্গে প্রিয়মের হার্টব্রেক হয়েছে। অতএব সেই প্রেম কে জোড়া লাগানোর প্রেমপিল কি অনিমেষ তাকে দিতে পারে? সেখানেই গল্পের ইতি আর অনিমেষ-শুক্তির ভাঙা সম্পর্ককে জোড়া লাগানোর পজিটিভ ইঙ্গিত"  



সংবাদ প্রতিদিন

যুগশঙ্খ, রবিবারের বৈঠক 


প্রতিবেদন লিখলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

সোমবার, ২৫ মার্চ, ২০১৯

বসন্তে গল্পবৈঠক - মদনমোহন মন্দির, বেলঘরিয়া

সন্তে গল্পবৈঠকের আসর বসেছিল বেলঘরিয়ার মদনমোহন মন্দিরে। এটি ছিল গল্পবৈঠকের ২৭ তম আসর। প্যারীচাঁদ মিত্রর ঐতিহ্যমণ্ডিত ঠাকুরবাড়িতে মনোরম এক বসন্ত সন্ধ্যায় ১০ই মার্চ নবীনা ও প্রবীণা নজন লেখকের স্বরচিত গল্পপাঠ অনুষ্ঠিত হল। গল্পগুলির নির্দিষ্ট একটি সূত্র ছিল। সংস্কৃত নাটকে যে নয়টি রসের উল্লেখ আছে, নটি গল্প সেই নবরসের উপর আধারিত। সঞ্চালকের ভূমিকায় ছিলেন ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় । তাঁর সঞ্চালনার বিশেষ দিকটি হচ্ছে তিনি অপূর্ব সুকণ্ঠের অধিকারিনী। গল্পের মাঝে মাঝে তিনি রবীন্দ্রগান পরিবেশন করে অদ্ভুত আবহের সৃষ্টি করেছেন। গল্পবৈঠকের কর্ণধার এবং অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠান সার্থক হওয়ার পেছনে তাঁর সুচারু ভুমিকা নজরে পড়ে।
ওপর থেকে - অনিন্দিতা মণ্ডল, নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত, বুবুন চট্টোপাধ্যায় , সুবর্ণা রায়, নন্দিনী সেনগুপ্ত, আইভি চট্টোপাধ্যায়, পৃথা কুণ্ডু, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণা রায় 

     শ্রীকল্যাণ নামের গল্পটি ছিল লেখক আইভি চট্টোপাধ্যায়ের । শান্ত রসের গল্প এটি। উত্তাল এবং বিধ্বংসী সম্পর্কের শেষে অভিষেকের অদ্ভুত এক উপলব্ধির জগতে প্রবেশ। পার্থিব মায়ার জগত ছেড়ে এক শান্ত নিস্তরঙ্গ মহাসমুদ্রে প্রবেশ করেছে তার মন। গল্পের শেষে মন আপনিই শান্ত হয়ে যায়। 
সুবর্ণা রায় পরিবেশন করলেন গোলাপি ক্ষত। রৌদ্র রসের গল্প। রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়। স্বপ্নে ইচ্ছেপুরণের গল্প এক অত্যাচারিত মেয়ের। রোজ যে স্বামীর হাতে মার খায়। 
পৃথা কুণ্ডুর গল্প অজ্ঞাতবাস। বীররসের গল্প। এ গল্প শুনলে আমাদের চিত্রাঙ্গদাকে মনে পড়তে বাধ্য। 
ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় , গায়ক, সঞ্চালক, পরিকল্পক  

ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় গানও গেয়েছেন চিত্রাঙ্গদা থেকেই। এই গল্পের অধিকারী মহাশয় ও বিপ্লবী পার্থকে মনে থাকবে বহুদিন। নন্দিনী সেনগুপ্ত লিখেছেন বীভৎস রসের গল্প, সীমান্ত ক্ষত। দূর বিদেশে দুটি মানুষের সম্পর্কের মধ্যে ঢুকে পড়ে সীমান্তের কাঁটাতার। যেখানে ব্যক্তিমানুষের সম্পর্ককে দুষিত করে তোলে যুদ্ধ ও ঘৃণার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। 
নিবেদিতা ঘোষ মার্জিতের গল্প উদ্ভট। অদ্ভুত রসের গল্প। সাহিত্যের অঙ্গনে প্রতিভাবান অথচ নবীনদের হেনস্থার একটি অপূর্ব শ্লেষাত্মক রচনা লিখেছেন নিবেদিতা। কিন্তু ক্রমশ চেপ্টে যাওয়া মানুষও যে ইচ্ছেপূরণের জন্য নিজের ভাবনা অনুযায়ী পাল্টে যেতে পারে তার প্রমাণ অন্তু। শেষ পর্যন্ত তার ইচ্ছেতে সে হয়ে যায় একটা ট্রাক, যার পিঠে হলুদ আলোর টুনি। লেখা আছে দেখবি আর জ্বলবি, লুচির মতো ফুলবি। সত্যিই অন্তু চরিত্রটির  বন্ধু সাহিত্যিকদের বিদ্বেষের উত্তরে। তার ট্রাক হয়ে ওঠা ছাড়া আর কিছু ছিলনা ! কৃষ্ণা রায় লিখেছেন নিশি স্পর্শ। ভয়ানক রস। এ গল্পটি শুনে শিউরে উঠতে হয়। সম্পত্তির জন্য বাবাকে চাপ দিতে থাকা, অসুস্থতাকে বাড়িয়ে দেওয়া, এ পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু ল্যাবরেটরিতে কোমায় আচ্ছন্ন বাবার শরীর থেকে মাপ মতন মাংস তুলে আনা, এক লহমায় আমাদের নরখাদক বানিয়ে দেয়। সত্যিই ভয়ানক। বুবুন চট্টোপাধ্যায়ের গল্প ‘মৃত্যু’। করুণ রসের গল্প। আত্মজার আত্মহনন। এক আপাত নির্লিপ্ত পিতার মেট্রোয় আরেকটি সুইসাইড শুনে প্রথমে বিরক্তি, ‘কেন যে এরা মেট্রোকেই বেছে নেয়?’ থেকে শেষে অশ্লীল খসখসে গলার ফোনে জানতে পারা, মৃত্যু হয়েছে মেয়ের। বন্ধুদের সঙ্গে পাবে যাওয়ার অনুমতি না পেয়ে অভিমানে সে সুইসাইড করেছে। সত্যিই করুণ! কি অদ্ভুত অন্তঃসারশূন্য সমাজ তৈরি করেছি আমরা! 
গল্পটি অবশ্য আকস্মিক পাওয়া সংবাদে পিতার স্তব্ধ হয়ে যাবার কথা বলে। 

শৃঙ্গার রসের গল্প লিখেছেন অনিন্দিতা মণ্ডল। তাঁর গল্পের নাম হিয়ার মাঝে। এক যৌবন অতিক্রান্ত অধাপিকার প্রথম প্রেমের খোঁজে ছুটে বেড়ানোর গল্প। ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় এ গল্পের রেশে গেয়েছেন ‘আমি তোমার প্রেমে হবো সবার কলঙ্কভাগী’। মন ভেসে যায় সে গানে। 
হাস্য রসের গল্পে পটু ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। তাঁর গল্পের নাম ফেসবুকেন সংস্থিতা।এই ভার্চুয়াল জগত নিয়ে কি অপরিসীম আগ্রহ আমাদের! জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে ফেসবুক। ফেসবুকের আড়ালে কল্পিত এক দেবীর পুজো নিয়ে গল্পের অন্তর্বর্তী শ্লেষ ধরা পড়ে। 
গায়িকা ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় এ গল্পের অনুষঙ্গে গেয়েছেন সুউপযুক্ত গান ‘ও ভাই কানাই’। অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে বিদ্যাপতির ‘মাধব বহুত মিনতি করি তোয়’ পদটি দিয়ে। এ পদের সুর দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। মদনমোহন মন্দিরে এমন নিবেদনের পদ গেয়ে ইন্দিরা উপস্থিত সকলকে আবিষ্ট করেছেন। এভাবেই এই পর্বের বসন্তের গল্পবৈঠক রূপে রসে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল।          
     
প্রতিবেদন লিখলেন অনিন্দিতা মণ্ডল