সোমবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০১৯

রূপোয় মোড়া গল্পবৈঠক ২৫

অ্যাদ্দিনে তো জেনেই গেছেন, ‘গল্পবৈঠক’ কী, কেন, কাদের। যাঁরা জানেন না, তাঁদের জন্য আরেকবার পুরনো পড়া ঝালিয়ে দেওয়ার মতো করেই বলি, এই বৈঠক গল্পকারদের এবং এই দল অধিকাংশই মেয়েমানুষের। আমন্ত্রিত পুরুষ থাকেন বৈকি, কখনও শ্রোতা হয়ে, কখনও লেখক পরিচয়ে। কিন্তু মোদ্দা কথা হল, যে কোনও বয়সের নারী-গল্পকার এই দলে আসেন, আসছেন, আসবেন। মঞ্চ-মাইক-আলো-পুরস্কারের দেখনদারি এড়িয়ে সহযোদ্ধা অক্ষরশ্রমিকের বৃত্ত ক্রমশ বড় হয়েছে। সাহিত্যিক শ্রীমতী ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের মনের ছাঁদে গড়া এই মুক্তমনের আঙিনায় আমাদের অনেকের যাতায়াত। আমিও এই দলে সম্প্রতি ঠাঁই পেয়েছি। এবং পাওয়া ইস্তক চেটেপুটে নিচ্ছি খোলা আকাশ। যাঁরা নিন্দেমন্দ করে বলেন, মেয়েমানুষ মানেই কূটকচালি আর কুঁদুলেপনা, তাঁদের জন্য একছড়া কাঁচকলা আর একঝুড়ি বাতিল ছেঁড়া কাগজের টুকরো উপহার রইল। ঐ ঝুড়িতে আমাদের কাটাছেঁড়া করা বাতিল গল্পের শব্দগুলো রয়েছে... ওগুলো হিংসুটে দুষ্টু লোকেদের জন্য।
    ২০১৯-এর জানুয়ারি; দেখতে দেখতে পঁচিশতম গল্পবৈঠক। রজতজয়ন্তী বলে কথা! সাহিত্যিক শ্রীমতী কণা বসু মিশ্রের ফার্ন রোডের ঐতিহাসিক বাড়িতে জম্পেশ ভোজের সঙ্গে জমে উঠল গল্পবৈঠক। এবার থিম ছিল ‘পিকনিক’। শীতের মরসুমে এর চেয়ে চমৎকার থিম আবার হয় নাকি! ছ’শো শব্দের বাঁধন আর সেইসঙ্গে এগারোজনের গল্পপাঠ। আহা! যেমন গল্প, তেমন সব উপস্থাপনা! তার সঙ্গে বাড়তি পাওনা সাহিত্যিক শ্রীমতী সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোজ্ঞ বিশ্লেষণ। এমন বিশ্লেষণ আর কাটাছেঁড়া করে ভুল শুধরে উৎসাহ দেওয়ার আশায় সমস্ত জীবন ধরে গল্প লিখে যাওয়া যায়!
    পন্ডিতিয়ার আর সি মাইতি’র দোকানের সিঙ্গাড়া বাড়তি অ্যাড্রিনালিন জোগান দেয় বলেই ইন্দিরাদি সিঙ্গাড়ার ঠোঙা আগে বাড়িয়ে ধরেন সকলের মুখের কাছে। ব্যস! উপচে পড়ে লাবণ্যে মোড়া এক-একটি মণিমুক্তো। শ্রীমতী সুতপা গুপ্ত গেয়ে ওঠেন “আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে”; ফার্ন রোডের বাড়ির হাওয়ায় তখন পিকনিকের গন্ধ। 
    জ্যোৎস্নারাতের গানের শেষেই শ্রীমতী জ্যোৎস্না কর্মকার শুরু করলেন তাঁর ‘পিকনিক প্রলেপ’। পাখি-মিমি-স্যান্টির গল্প। এই সময়ের গল্প। আজকের জেন-ওয়াইয়ের প্রেমের সম্পর্কের টানাপোড়েন আর ফোবিয়া নিয়ে একটি নিটোল গল্প। যদিও গল্পের ওঠাপড়া নিয়ে সর্বাণীদির পরামর্শ রইল। চৈতালি চট্টোপাধ্যায়ের কলমে কবিতা আর গদ্যের রঙের অপূর্ব মিশেল। তাঁর ‘দৈব-অদৈবের পিকনিক’ গল্পে যদু-রাজীব-অপালা-শমিত-মিমি এই পাঁচটি চরিত্রের মধ্যে তিনজন আত্মকথনে বলে যায় তাদের মনের কথা। বিষবৃক্ষের বীজের মতো গল্পের শেষে জ্যাক ড্যানিয়েলের বোতলের মধ্যে লুকিয়ে থাকে পরকীয়া আর প্রতিহিংসা।  সাবলীল লেখনী তাঁর। টানটান গল্পটি থেকে মন সরানো যায় না। স্টেটমেন্টের পাশাপাশি ডায়ালগ থাকলে বোধহয় আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠতে পারত। সে স্বাধীনতা একান্তই লেখিকার।   


    শ্রীমতী স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায় পড়েন ‘লাল গাড়ির যাত্রীরা’। ষোলজনের পিকনিকে এল পারফেক্ট পিকনিক মেনুর বর্ণনা। অনিমেষ-বাসব-মনোজ-তৃষ্ণা-মেঘা সকলে মিলে পাহাড় আর জঙ্গলের মধ্যে অনুভব করে এক অপার্থিব অভিজ্ঞতা। বিজ্ঞানে যার ব্যাখ্যা মেলে না। এককথায় ভূতের গল্প। দিব্যি। যদিও বাস্তব আর অলৌকিকের মধ্যে কোনও বিভাজন না থাকায় পাঠক একটু ধন্দে পড়তে পারেন।
কৃষ্ণা রায় শোনালেন ‘অরণ্যশীর্ষে সন্ধে’। পঁচাত্তর পেরোনো বাবা-মা নিজেদের এখন ছেলে পুপুর সংসারে শুকনো লতার মতো পরগাছা ভাবেন, সারাদিন বদ্ধ ঘরে তাঁদের স্মৃতিচারণ, ভারাক্রান্ত করে তোলে চারপাশের পরিবেশ। মফস্বল স্কুলের হেডমাস্টার এখন অবসরপ্রাপ্ত, বৃদ্ধ। তাঁর সঙ্গে এক বিষণ্ণ ডিসকোর্স তাঁর স্ত্রীয়ের। যেমন হয়, যেমন হচ্ছে চারপাশে। প্রায় একই চলনে শ্রীমতী সংযুক্তা সেনগুপ্ত শোনান ‘বিষাদসন্ধ্যা’। বিপ্লব সিকদারের স্মরণসভায় শাপলা-শালুকের পুকুরে ঢ্যালা ছুঁড়ে একটু একটু স্মৃতিবিন্দু তৈরি করেন, প্রবাসী খোকনের প্রিয় খাবার সরিয়ে রেখে পিকনিকে বসে ফিরে তাকান চড়ুইভাতির দিকে। গল্পের শেষে মনের মধ্যে কেমন চিনচিনে ব্যথা। পূর্বা মুখোপাধ্যায় ওরফে মুকুজ্যে গিন্নি যেন কৌটো থেকে অন্য কৌটোতে ঢালা-উপুড় করার মত নিখুঁত জার্ক অ্যান্ড মিক্স দিয়ে সাজিয়েছেন তাঁর লেখা ‘প্রেম অ্যাট দ্য রেট পিকনিক’। নিক্সের জীবনে কাব্যকলি থেকে ম্যাডোনা--  এক আশ্চর্য হালফিল প্রেমের জার্নি। অনেক উপচারের মধ্যেও একদলা নীল কষ্ট বুকের মধ্যে জমাট বেঁধে বসে থাকে। ঝরঝরে লেখনী, আর একটু গভীরে গেলেই চলকে পড়বে গাঢ় নীল রঙের যন্ত্রণা।  
সাহিত্যিক শ্রীমতী কণা বসু মিশ্রর অভিজ্ঞ লেখনী বড় কাব্যময়। ডোরাকাটা পাথরের নুড়ি নিয়ে টুকি খেলা কিশোর আর রাইকিশোরী দূরবীণ দিয়ে দেখে, তাদের পিকনিকের লুকোচুরি খেলা এখন স্মৃতির পাতায়। তারপরেই ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় গড়চুমুকে নিয়ে যান পাঠকদের। পিকনিকের চরিত্র, আলসেমি, ফূর্তি ভরপুর। তূণীরের অফিসের পিকনিকে দূরে আর এক দলের মধ্যে ছেড়ে যাওয়া প্রেমিকা রাকা। রাকা-তূণীর, রাকা-কৌশিক--  প্রাক্তন প্রেমিক তূণীর আর স্বামী কৌশিক, দু’জনের জীবনেই অপয়া রাকা। ‘আলোড়ন’ গল্পটির শেষে রাকার মনের কথা শুনতে পায় শুধু নদীর জল। একটা লাইনের মধ্যেই অন্য গল্পের মোচড়।  
নন্দিনী সেনগুপ্ত’র ‘সোনা তরঙ্গ নদীধারে’ গল্পটি শুনতে শুনতে মনে হয় যেন নাটক শুনছি। প্রবাসে বরফ ঢাকা প্রান্তরের সামনে এক বসন্তের খোঁজ। রূপক গল্পটিতে শুধুই আসা-যাওয়ার হাতছানি। স্মৃতি আর ব্যথাভরা বেদনার ভার। প্রতিদিনের প্রবাস-যাপনে স্মৃতিভ্রংশ স্থবির এক মানুষকে জাগাতে চায় আরেকজন। বৃষ্টির ফোঁটা ফেলার মতো স্মৃতি ঝরে পড়ে টুপ্টাপ। কাব্যিক, বাস্তব গল্পে বুঁদ হয়ে থাকি অনেকক্ষণ। সোনালী মুখার্জির অসাধারণ বর্ণনায় আধুনিক জীবনের ঝকঝকে বর্ণনা। তার আড়ালে দাঁত-নখ বের করে হঠাৎ হানা দেয় এক সাঙ্ঘাতিক মোচড়। ‘চড়ুইভাতি’ গল্পের শেষের বুনোট বেশ জোরালো ধাক্কা।
আর শ্যামলী আচার্যর গল্পের নাম ‘পিকনিক’। রতু আর শুন্টি কাজ করে বাজির কারখানায়। এই দুটি শিশুশ্রমিক জানে না ‘পিকনিক’ কী, পিকনিক জায়গাটা ঠিক কোথায়, কি কি হয় সেখানে। তাদের স্বপ্ন, কল্পনা, বাস্তব-অবাস্তবের ছায়াপথ এই গল্পে।
সুতপা’র মনভরানো গান আর কণাদির কবজি ডুবিয়ে খাওয়ানোর আয়োজনে দিশেহারা লাগে। ‘গল্পবৈঠক’ শেষ হয়। রেশ থেকে যায় বহুক্ষণ। ঠিক যেমন ‘পিকনিক’-এর স্মৃতি জেগে থাকে দীর্ঘ সময়। সবশেষে মধুরেণ সমাপয়েত সোনালীর আনা গল্পবৈঠকের ২৫ টি অনুষ্ঠান পূর্তিতে আনা কেক দিয়ে। 



প্রতিবেদন লিখেছেন
শ্যামলী আচার্য
     
  

      
   

   
   

   

বুধবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৮

গল্প বৈঠক ২৪, রূপশালীর ১০ বছর পূর্তিতে

রূপা মজুমদার ও চুমকি চট্টোপাধ্যায়


আমন্ত্রণপত্র ডিজাইন করলেনঃ নন্দিনী সেনগুপ্ত
শিশুদিবসের প্রাক্কালে রূপশালীর ১০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান হল দক্ষিণ কলকাতার শরত বাসভবনে। সেই উপলক্ষে আমন্ত্রিত ছিল গল্পবৈঠকতাঁদের ২৮ তম গল্পপাঠ নিয়ে। বেশ কিছু গল্প ছড়া আর এক সুন্দর আলোচনা চক্র নিয়ে সুচারু অনুষ্ঠানটি হয়ে গেল ১২ই নভেম্বর, ২০১৮য়।
ছিলেন রিনা গিরি রূপশালীর তরফ থেকে আর ছিলেন সাহিত্যিক ইন্দিরা মুখোপধ্যায় যার অসীম উৎসাহ ও উদ্দীপনা দিয়ে গড়ে তোলা গল্পবৈঠক আজ শুধু এক গল্পের আড্ডাই নয়, বরং গল্প অনুশীলনের এক সুন্দর সাবলীল চারণভূমি।
অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল নির্ধারিত সময়েই মরদান হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী  অনুষ্কা দাশগুপ্তর গান দিয়ে। অনুষ্কা প্রথমে আমাদের শোনাল অন্তরা চৌধুরীর বিখ্যাত গান "নাচো তো দেখি আমার পুতুল সোনা" এবং তারপর অত্যন্ত সাবলীল গলায় শোনাল "লাল নীল সবুজেরই মেলা বসেছে"। কিশোরী অনুষ্কার গানে মুগ্ধ যখন শ্রোতারা তখন সঞ্চালিকা জয়া চৌধুরী মঞ্চে ডেকে নিলেন কিশোরভারতীর সম্পাদক চুমকি চট্টোপধ্যায় ও শুকতারা এবং নবকল্লোলের সম্পাদক রূপা মজুমদারকে। বিশিষ্ট দুই অতিথি বক্তব্য রাখলেন অতি প্রাসঙ্গিক এক বিষয়ের ওপর -  "ডিজিটাল যুগে কিশোররা কি সাহিত্য পড়ছে?"

রূপা আমাদের শোনালেন আশার কথা। বললেন কিশোর সাহিত্যের ভবিষ্যৎ মেঘলা নয়। এখনও বহু কিশোর মোবাইল ফোন বা টিভির হাতছানি উপেক্ষা করেও বই পড়ে আর সেই কারণেই এখনও পর্যন্ত যথেষ্ট কিশোর সাহিত্য সৃষ্টি হয়েই চলেছে।
চুমকি বললেন কিশোর সাহিত্যের ফর্ম পাল্টেছে হয়ত অল্প তবে কিশোর সাহিত্যের সংজ্ঞা পালটে যায়নি আজো। এও বললেন শহরের তুলনায়  মফস্বলে কিশোর সাহিত্যের পাঠক এখন অনেক বেশি। তার কারণ হিসেবে পাঠমাধ্যম থেকে শুরু করে গ্যাজেট নির্ভরতা এবং অতিরিক্ত ভিস্যুয়ালের ব্যবহারে শিশু মস্তিস্কের অলস হয়ে ওঠা সবই উঠে এসেছিল। তবে দুই সম্পাদক এবং দর্শকাসনের বন্ধুরা অনেকেই একমত ছিলেন যে ভাল পাঠক তৈরি সম্ভব তখনই যখন বাড়িতে ভাল পড়ার পরিবেশ এবং আগের প্রজন্মের ভালো পড়ার অভ্যাসের ছায়া পড়বে আগামীর মননে।
শ্রোতা সঞ্চালক ও অতিথিরা সবাই একাত্ম হয়ে এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করায় সময় বয়ে গেল বড় তাড়াতাড়ি।
 
গল্প পাঠেঃ সুকন্যা সাহা, সঙ্গীতা দাশগুপ্ত রায়, বুবুন চট্টোপাধ্যায়, পায়েল সেনগুপ্ত, দেবযানী বসু কুমার, মিতা নাগ ভট্টাচার্য, স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়, নন্দিনী সেনগুপ্ত এবং ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

শুরু হল ছড়া ও গল্পপাঠের পালা। প্রথমে কবিতা শোনালেন সংস্কৃতি ব্যানার্জী। সুখপাঠ্য কবিতাটি আজকের দিনে বড় প্রাসঙ্গিক লাগে।অনুষ্ঠানের শুরুতে রিনা গিরির উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের উত্তরীয় গামছা দিয়ে বরণ করে নেওয়াটা নজর কেড়ে নেয়।
এর পর সঙ্গীতা দাশগুপ্তরায় শোনালেন একটি ছোট ছেলের বোধবিভ্রাটের গল্প।  ছোট বেলায় বড়দের সব কথার মানে খুব স্পষ্ট থাকে না। তেমনই এক কথা থেকে এক ছোট ছেলের বোঝার ভুল আর সে ভুল ভাঙ্গার এ গল্প আমাদের অনেকের ছোটবেলাকেই মনে করাবে সম্ভবতঃ। 
দেবযানী বসুকুমার শোনালেন "পাড়াবেলা"র কথা যে বেলা আমাদের সকলের ছেলেবেলার সাথে জড়িত কিন্তু দুর্ভাগ্য যে এখনকার শিশুরা এ স্বাদে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে প্রতিটি পরিবারেই। দেবযানীর আন্তরিক আর্তিটি যদি শিশুদের পাড়াবেলা ফিরিয়ে দিতে পারত তো  বেশ হত।
মিতা নাগ ভট্টাচার্য্য শোনালেন এক শিশুর গল্প যে আচমকাই এক চরম যন্ত্রণাময় সত্যর মুখোমুখি দাঁড়ায়। বাবার মৃত্যুসংবাদের যন্ত্রণা নিয়ে দুর্গার কাছে প্রার্থনারত শিশুটির কথা শুনতে শুনতে মন কেঁদে ওঠে। মিতা কিন্তু দক্ষতার সঙ্গে স্বরচিত গল্পটি স্মৃতি থেকে বলে চললেন। 
স্বপ্না বন্দোপধ্যায় শোনালেন গল্পের ছায়ায় অনেক অজানা তথ্য দেশ বিদেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাসকে কেন্দ্র করে। গল্পের শুরুতে একটা চমকপ্রদ রেসিপি কিশোর কিশোরীদের অভিভাবকদের জন্য বেশ মিষ্টি চমক।
নন্দিনী সেনগুপ্তর লেখায় ফুটে উঠল  কিশোর মনের  মাধুর্য্য। স্কুল প্রজেক্টে ভাল নম্বর পাওয়ার আকাঙ্খা , প্রত্যাশা না পূরণ হওয়ার দুঃখ এবং সব শেষে আচমকাই কিশোর মনটির মধ্যে সাফল্যের খুশি ফিরে আসার এই গল্পও শ্রোতাদের শিকড় ছুঁয়ে যায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "ভুলুরাম শর্মা"  ছড়াটি  শোনালেন কৃষ্ণা মজুমদার। ছড়াটি নিজগুণেই বড় মিঠে তায় তায় কৃষ্ণার পরিবেশনার গুণে  একবার শুনলে ভোলা অসম্ভব।
এর পর ছিল  সুকন্যা সাহার লেখা এক কিশোরের গল্প যে স্বপ্নে বেড়িয়ে আসে ২০৪০ সালের কিছু মুহূর্ত ছুঁয়ে। গল্পটি শুনতে শুনতে মনে হয় সত্যিই হয়ত ২০৪০ সালের কিশোর কিশোরীরা বড় একলা হয়ে যাবে। সত্যিই হয়ত মানুষের সব চেয়ে বড় বন্ধু সহায়ক এবং সঙ্গী হবে শুধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। যদি তাই হয় তো সে  আগামী বড় একাকীত্বের আগামী।
বুবুন চট্টোপধ্যায় শোনালেন  এক  কিশোরীর গল্প  যে তার জন্মদিনে পেয়েছে আস্ত একখানা ঘর সুন্দর করে সাজানো  আর তার পরদিনই  পেয়েছে এক বিশ্রী অভিজ্ঞতা যা হয়ত এক ঝটকায় কেড়ে নিল তার কৈশোর।
শিবানী পান্ডে মুগ্ধ করলেন দীপ মুখোপধ্যায়ের লেখা "কেয়ার অফ ফুটপাথ" ছড়াটি আবৃত্তি করে । এ  ছড়া সেই সব কিশোরদের নিয়ে যারা আমাদের শিশুপাঠ্য  বইয়ের বাইরে এবং যাদের শৈশব এবং কৈশোর হারিয়ে গিয়েছে সমাজের  যন্ত্রণার ফুটপাথে।
পায়েল সেনগুপ্ত শোনালেন দিয়েগো নামের ভারি মিষ্টি এক ছেলের গল্প যার পরিত্রাণ নেই বাবা কাকা মামাদের উচ্চাকাঙ্খার স্বপ্ন থেকে।
সবশেষে ইন্দিরা মুখোপধ্যায় অপূর্ব দক্ষতায় রূপকথায় মিশিয়ে দিলেন সৌরবিজ্ঞান। কিশোর কিশোরীরা এ গল্পটি একবার শুনলে সৌর বলয়ে গ্রহের অবস্থান এবং তাদের বাহ্যিক কিছু বিবরণ এবং পৃথিবী ছাড়া বাকী গ্রহদের মধ্যে বৃষ্টির হাহাকার আর কখনও ভুলতে পারবে না।
অনুষ্ঠানের প্রায় শেষ ভাগে এসে রিনা গিরি শোনালেন স্বরচিত ছড়া।
শেষ পাতে ছিল পৃথা বলের গাওয়া রূপকথার মিশেলে ছড়ার গান। অপূর্ব এ উপস্থাপনা কিছুক্ষনের জন্য শ্রোতাদের ছেলেবেলায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
আর এই সবের মাঝে ছিল জয়া চৌধুরীর টকঝালমিষ্টি মন্তব্য এবং কখনও সুচিন্তিত মতামতও।  অনুষ্ঠানের রাশ টানা ও ছাড়ার যে অনুপম দক্ষতা জয়া দেখিয়েছেন তা প্রশংসার দাবী রাখে নিশ্চিতভাবে। 



গান গল্প ও ছড়ার ঠাসবুনোটের এই গালিচায় বসে দুদন্ড জিরিয়ে নেওয়ার অবসরটি সাজিয়ে দেওয়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ গল্পবৈঠকের সমস্ত লেখক পাঠক ও অতিথিদের। আর ছিল চা সিঙ্গারার আয়োজন। 

প্রতিবেদন লিখলেনঃ সঙ্গীতা দাশগুপ্ত রায়  

যুগশঙ্খ রবিবারের বৈঠক 

বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

গল্পবৈঠক ২৩, সেপ্টেম্বর সোনাটা



বালিগঞ্জের নন্দী স্ট্রীটের ক্যাফে স্ট্রিংসে হয়ে গেল গল্পবৈঠকের ২৩ তম পর্ব। গত ১৬ই সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠানের নাম ছিল সেপ্টেম্বর সোনাটা। কিন্তু থাকিয়া গেল রেশ। শেষ  হইয়াও হইল না শেষ। গল্পবৈঠকের অভিধানে 'শেষ' শব্দটি অবান্তর তার আভাস পাওয়া গেল প্রধান উদ্যোক্তা ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের ২৪তম গল্প বৈঠকের সানন্দ আগাম ঘোষণায়। সেপ্টেম্বরের ছুটির বিকেলে
ক্যাফের আনাচকানাচ ভরপুর ছিল সেদিনের নিমগ্ন শ্রোতায় ।
 

সেদিন সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটির ভাবনায়,পরিকল্পনায় এবং সঞ্চালনায় ছিলেন কবি, বাচিক শিল্পী মৌমিতা ঘোষ। শারদ অর্ঘ্য দিয়ে সূচনা হল গল্প বৈঠকের।নবীন প্রবীণ কবিদের শরতের কবিতার ফাঁকে ফাঁকে আগমনী গান গাইলেন তপশ্রী পাল। কিবোর্ড অনুষঙ্গে ছিলেন নীলাদ্রি। বাজল তোমার আলোর বেণু ঝংকৃত হল সঞ্চালিকার প্রাসঙ্গিক কবিতা-ছড়ার কোমল সংযোজনায়। শব্দ-যোজনায় তপোদা।
এবার গল্পপাঠের শুরু। ওইদিন থিম অণুগল্পের বিষয় ছিল দুটি, ঝগড়া অথবা হাসি। ৩০০ শব্দের মধ্যে প্রত্যেকে হাসি অথবা ঝগড়া বিষয়ে গল্প লিখে এনেছিলেন। মূল পর্বে লটারিতে প্রথমেই এলেন সাঁইথিয়ার সুজাতা রায়। অত্যন্ত সাবলীলতায় দোলপূর্ণিমা নিশি'   গল্প আমাদের নিয়ে গেল লক্ষ্মীর পাঁচালীর অন্তর্নিহিত কুপ্রথা-বিরোধিতার আঙিনায়। বেশ সুচারু ভঙ্গিতে পাঁচালীকারের দাঁড়িতে টান মেরেছে সুজাতা। কস্তুরী চট্টোপাধ্যায়ের মজার 'নাইটি কাহিনী'র ফোঁটা ফোঁটা জলে ভিজল গল্প বৈঠকের বারান্দা। 


বুবুন চট্টোপাধ্যায়ের গল্পে আবারো দেখি 'গরু'র দুধে চোনা ফেলে সগর্বে বেরিয়ে গেল ছোট্ট শালিখ। সাদামাটা ঘরোয়া কাহিনী অনবদ্য হয়ে উঠল তাঁর লেখায়। 
স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'জেরাতে মোর' গল্পটিতে বিবদমান এক স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সেতু হল দুঃসময়। সোনালীর গল্প 'আধুনিক ভজনের কেচ্ছা' বেশ উপভোগ্য। কেচ্ছাকাহিনীতে কুতূহলী নই কোন বাঙালিবাচ্চা বুক ঠুকে বলবে বাপু? ঘুমন্ত ভজন-বাবুরা জেগে উঠলে ক্যামেরা চলুক বুঝেশুনে। ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'থিম বিভ্রাট' কিন্তু আমাদের চেতনাকে কিঞ্চিৎ ঝাঁকিয়ে  দেয়। এ যেন তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি। থিম-ভরপুর পুজোমণ্ডপে কখনও যদি একচালার ঠাকুর ফিরে আসে তবে জেনারেশন এক্স তা গ্রহণ করবে তো? বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'জামবাটি' ও কখনও সখনও প্রান্তিক চাষী দম্পতির আপাত বচসার অন্তরালে নিরুচ্চার প্রেমের ইঙ্গিতবাহী হতে পারে বোঝা গেল। বেশ সুন্দর তাঁর গল্পের বয়ান।
'কালচার' গল্পটিতে রায়গঞ্জের শর্মিষ্ঠা ঘোষ দেখালেন মিঃ কমলাকান্ত বিশ্বাস একাধারে সংস্কৃতি-অপ-সংস্কৃতির মিশেলে একটি বর্ণময় চরিত্র বিশেষ। এরকম চরিত্র খোঁজ করলে দু'একটি মিলেও যায় আমাদের আশে-পাশে। কৃষ্ণা দাসের 'ঠেলার মাল'এ অফিসটাইমের বাদুড় ঝোলা বাসের নৈমিত্তিক একঘেয়েমি থেকে যাত্রীরা খানিক রৌদ্ররসের আভাস নিয়ে গন্তব্যে যায়। উপরি পাওনা।
জয়তী অধিকারীর 'পোষ্য' যখন দু'কেজির ইলিশ দিয়ে ভুরিভোজ সারে তখন মনিবনীর সাথে আমরাও খেপে উঠি। এ কী কাণ্ড! ইলিশ কি সস্তা?
অংশুপ্রতিম দে-র 'যুযুধান' এ আশার কথা শেষমেষ দু'পক্ষের আপোসমিলন। ঝগড়ার মধ্যেও হাসির আভাস। যদিও সাদামাটা গল্পের বিষয়টি তবুও স্বল্প পরিসরে মন কাড়ে।
নন্দিনী সেনগুপ্তর গল্প 'রুপুদের সংসার'-এ পাঠক এতটাই মুগ্ধ যে মনে হয় ওই সংসারের একজন সদস্য হতে পারলে অন্তত রুপুর মায়ের হাতের অরোরা খাওয়া যেত,বাবার ডার্লিং-এর গায়ে পড়ে নানান মস্করা করা যেত।
রজত শুভ্র ব্যানার্জির 'রাধাগোবিন্দবাবুর অভ্যাস' গল্পগুজব শেষে বাড়ি ফিরে দুটি চমচম খাওয়া। আমরা জানিনা কোনো বিশেষ মহিলার হস্তনির্মিত স্মৃতিবিজড়িত কিনা সেই চমচম। তবে তাঁর গল্পে এই অভ্যেস কথাটি যেন বড্ড চেনা মনে হল। যেন অগ্রবর্তিনী কোনও লেখিকার ছায়া দেখতে পাওয়া গেল।
'নৃপতিবাবুর নবীন জীবন'-এ তো নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত বিপত্নীক নৃপতিবাবুকে বেঘোরে স্প্যানিশ দৌড়বীর পুত্রবধূর দৌড়োনোর পোষাক পরিধান করাইয়াই ছাড়িয়াছে । তাহাকে যে দৌড় করায় নাই ইহাতেই পাঠককুলের স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়িয়াছে। টয়লেট পেপারের বাংলা প্রতিশব্দ 'হাগজ' লেখিকার অন্যতম স্বকীয়তার পরিচয় দেয় যা ব্যবহারে তাঁর কলমের দৌরাত্মে তিনি কুণ্ঠিত হন নাই ।
জয়া চৌধুরির 'শিশুপাঠ' এ শিশুর কাছে এখনও অনেক পাঠ নেবার আছে। বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুলের চাপান উতোর তা দেখাল। তবে গল্পের বুনটে আরেকটু মুনশিয়ানা দেখাতেই পারতেন তিনি।
কৃষ্ণা রায়ের 'গিলোটোলজিস্ট' গল্পে এক জবরদস্ত হাসির খোরাকের রসদ মজুত। একশ'দশ কেজি ওজনের পচাঁত্তর বছর বয়সী মহিলার উপস্থিতিই হাঁ হয়ে যাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। শ্যামলী আচার্যর গল্প 'কাঠি' রাজনীতির কলকাঠির ভাঁটায় সাক্ষাৎ জিয়নকাঠি।পরিশীলিত উপস্থাপনা।
বাংলার অধ্যাপক ঊর্মি দাসের 'লোহিত আকাশ পথে' মর্তের হিরোইন ফ্যাশন ডিজাইনার হিরো ভিলেন প্রভৃতিতে মজেছে স্বর্গের তথাকথিত দেবদেবীরা। স্বর্গের অপ্সরাতে তাদের এখন অরুচি। তবে গল্পটি নির্দিষ্ট শব্দ সীমা অতিক্রম করেছিল তা বলাই বাহুল্য। তমালী রায়ের 'ভুলো'র নায়ক এমনিতে ভালো মানুষ কিন্তু ভুলো। সায়া নামক মেয়েদের অন্তর্বাসে ছেলেদের পাজামা ভ্রম বা চানাচূরের সাথে দহি কম্বিনেশন বেশ অরুচিকর শোনায়। আর তাঁর এহেন শব্দচয়ন গল্পটিতে কোথাও যেন একটু তাল কেটে দেয়।
দীপা চ্যাটার্জি গল্প লেখেন না কিন্তু তাঁর মামীর খোঁপা মামায় বাঁধে সত্যি যেন গল্প ঘটে ছিল একটা পুরুলিয়ার ঘাটে। বেশ। এমন মামা সত্যিই দুর্লভ ।


ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের 'হামি' সাম্প্রতিক সময়োপচিত বিষয় নিয়ে। যা এক নিষ্কলুষ 'হামি' স্মরণ করায়। মধ্যবয়সী নন্দবাবু প্রেম-পিরিতি সন্দর্শনে বেজায় ক্ষুব্ধ। তার স্ত্রী যুগপন্থী। দুটি পায়রার চঞ্চুমিলন রুখতে যে বন্দুক তাক করতে পারে তাকে স্মরণ করাতে হয় তার নিজের যৌবনকালের অনেক মজা-মস্করার স্মৃতিকথা। পক্ষিপ্রেমের সরলতা তাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে বোঝাতে হয়। প্রকৃত প্রেম নিকষিত হেমস্বরূপ।
গল্প পাঠের শেষপাতে
টপ করে পড়ল তপশ্রী পালের 'নাড়ুর নাক'। পর্যাপ্ত হাস্যরস থাকলেও সকলের হজম হয় নি। কারও কারও অতৃপ্তির ঢেঁকুর উঠেছে গল্প শুনতে শুনতে। কারণ নাক থেকে নিঃসারিত বর্জ্য পদার্থের উপস্থিতি এবং তার সঙ্গে আমাদের সবার অতি প্রিয় নকুলদানার তুলনা।  
ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় দুটি রামপ্রসাদী গানের আবেশে মুগ্ধ করলেন সভা। শ্রাবণী ব্যানার্জি শোনালেন দুটি অনবদ্য রবীন্দ্র সঙ্গীত।
আর অনুষ্ঠান কানায় কানায় পূর্ণ হল মৌমিতাও জয়জিতের মজার অনু শ্রুতিনাটকে। আগাগোড়াই অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় যথেষ্ট মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন মৌমিতা ঘোষ।
আমাদের সকলের প্রিয় লেখিকা কণা বসু মিশ্রর মুখনিঃসৃত কিছু জরুরী কথায় আমরা সমৃদ্ধ হলাম। আশাতীত এবং অতিরিক্ত প্রাপ্তি ছিল সেদিন সিনথেসাইজার বাদক নীলাদ্রির কণ্ঠে আধুনিক বাংলা গান। যে গান সবাইকে চেয়ারচ্যুত করে প্রায় নৃত্যোন্মুখ করে ছেড়েছিল সব শেষে।
ক্যাফের এক কাপ করে চা আর শ্রদ্ধেয়া অগ্রজ সাহিত্যিক কণাদির আনা একটি পরমরোচক মিষ্টি দিয়ে ২৩ তম গল্প বৈঠকের সুখসমাপ্তি হল।




প্রতিবেদনটি লিখেছেন স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়
ফোটো সৌজন্যে, জয়তী ভট্টাচার্য অধিকারী                        
অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পত্র ডিজাইনে নন্দিনী সেনগুপ্ত 
  

মঙ্গলবার, ১৪ আগস্ট, ২০১৮

গল্পবৈঠক - ২২, একটি প্রতিবেদন

ছবিঃ নন্দিনী সেনগুপ্ত
৮শে শ্রাবণ, ১৪২৫ এর এক বর্ষা বিকেলে এবারের ‘গল্প বৈঠকের’২২ তম আসরটি বসেছিল লেখক কণা বসু মিশ্রের বাড়িতে। মনের তাগিদে সংসারের সব কাজ অকাজ সামলে মেয়েরা অনবরতঃ যে লিখে চলে বা গল্পের বুনোটে নিজের গোপন অনুভুতিটুকুর জন্ম দেয় তারই রেশ পাওয়া গেলো এবারের বৈঠকেও। এবারের বৈঠক শুরু হলো আমন্ত্রিত গল্পকার উর্মি দাসের ‘চাবি’ গল্পটি দিয়ে। সাইবার ক্যাফেতে ধুলোর পরত জমে থাকা একটি কমপিউটারের আত্মজীবনী। ঝরঝরে গদ্যে,বিষয়বস্তুর নতুনত্বে গল্পটি একটা অন্য জায়গায় পৌঁছে দেয় যেন। দ্বিতীয় গল্প সোনালী মুখোপাধ্যায়ের ‘মায়াবনবিহারিনী’। মা মেয়ের সম্পর্ক নিয়ে বলা এই গল্প অসম্ভব সুন্দর একটা মোড়ে দাঁড় করিয়ে দেয় আমাদের। মেয়ের সঙ্গে তার প্রেমিকের আড়ালে থাকা মায়ের কথপোকথন গল্পটিকে একটা অন্য উত্তরণে নিয়ে যায়। পরের গল্প জয়া চৌধুরীর 'লোকটা’।একজন বৃদ্ধ মানুষ ও তার দুই পুত্রের জীবনবোধের কাহিনী জয়ার লেখায় সুন্দর ফুটে উঠেছে।পরের গল্প কৃষ্ণা দাসের ‘আবর্ত’। রোজ পার্কে দেখা হওয়া দুজন প্রবীন প্রবীণার আটপৌরে একাত্বীত্বের কাহিনী তার গল্পে চমৎকার বলেছেন কৃষ্ণা। বড়ো মন ছোঁয়া গল্প। পরের গল্পটি আইভি চট্টোপাধ্যায়ের ‘ব্যাঙ্ক’।ব্যাঙ্কের একজন চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীর জীবন যুদ্ধের কাহিনী, যে অবসর সময়ে মেয়ে সেজে যাত্রাপালা করে।পরবর্তীতে জীবনে উচ্চ প্রতিষ্ঠিত পুত্রদের লজ্জা হয়ে দাঁড়ায় বাবার এই বিটিছ্যেলা সেজে অভিনয় করা।করুণরসে সিক্ত এই গল্প শেষে গিয়ে যেন অন্য মাত্রা পায়। নন্দিনী সেনগুপ্তের স্বপ্ন গল্পে  অণুলেখার সঙ্গে কে চ‍্যাট করছিল? তার স্বামী সুবীর, নাকি অন‍্য কেউ? অণুলেখার এক মানসিক দোলাচলে শেষ হয় গল্পটি।বাস্তবের উপর ভিত্তি করে লেখা গল্পটি খুব মন কাড়া। এরপর কস্তুরী চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাজি’। সারাদিন ফেসবুক চ্যাটের মাধ্যমে দুই অসম বয়সীর প্রেম কৌতুক দিয়ে শুরু হয়। সাতান্নর জয়দীপ দুরুদুরু বক্ষে একদিন দেখা করতে যায় একুশের রিয়ার সঙ্গে। ভুল ভাঙ্গে অপত্যস্নেহে যখন দেখে রিয়া তাঁরই ভাবী পুত্রবধু।কিছুটা কৌতুকের ঢং এ লেখা গল্পটি কিছুটা চেনা কিছুটা অচেনা একটা মিষ্টি ছাপ রেখে যায়।পরের গল্প দীপা চ্যাটার্জির ‘আলতা বুড়ি’। বিধবা হিরন্ময়ী সধবা সেজে বাড়ি বাড়ি আলতা পড়িয়ে চারটি পেট চালায়। শেষ ট্রেনে আবার বিধবার বেশ  পরে ঘরে ফেরে রোজ।দৈনন্দিন জীবনের এই করুণ কাহিনীর রেশ গল্প শেষ হওয়ার পরেও যেন প্রাণ ছুঁয়ে রয়ে যায় আমাদের পাঁজরে। এরপর ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের ‘সঙ্গীত নন্দন’ গল্পটিও কিছুটা অসম বয়সীর ভারচ্যুয়াল প্রেমের উপর দাঁড়িয়ে।স্বামী সন্তান ছেড়ে আসা বিবাহবিচ্ছিন্না একজন মধ্যবয়সী একা মায়ের বয়সে অনেক ছোট অনীশের সঙ্গে অদ্ভুত এক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।এই সম্পর্কের যোগসূত্র ছিল গান।ভুল ভাঙ্গে যখন সেই মা দেখে অনীশের গায়িকা প্রেমিকা আর কেউ নয় তারই মেয়ে।বড়ো সুন্দর একটি গল্প বুনেছেন ইন্দিরা। বৈঠকের শেষ গল্পটি পড়লেন বুবুন চট্টোপাধ্যায়।’দিদিয়া’ নামের দুই বোনের এই গল্পের বিষয়ে নতুনত্ব আছে। বড়ো দিদির প্রেমকে হালকা ভাবে নেওয়া ছোট বোনের অনুভুতি ধাক্কা খায় যখন দেখে তার দিদিয়া পোলিও আক্রান্ত প্রেমিককে প্রগাঢ় ভলোবাসায় জড়িয়ে রেখেছে। ঝরঝরে গদ্যে সুন্দর গল্প লিখেছেন বুবুন। এবারের বেশীর ভাগ গল্প ছিল ভারচ্যুয়াল প্রেম কেন্দ্রিক। প্রতিটি গল্প মন শুনে গল্পগুলি নিয়ে সুঠাম আলোচনা, সুন্দর সুচিন্তিত মতামত দিয়েছেন এদিনে অতিথি বাংলা সাহিত্যে কৃতি ছাত্রী কবি প্রমিতা ভৌমিক ও লেখক বুবুন চট্টোপাধ্যায়। তাদের অকুন্ঠ ধন্যবাদ অবশ্য প্রাপ্য।
এদিনের গল্পবৈঠকের উপরি পাওনা ছিল তপশ্রী পালের গান। অনবদ্য একটি বর্ষার নজরুল গীতি গাইল সে। আর গাইল একটি ভজন। আর শেষ পাতে ছিল কণাদির তুমুল আতিথেয়তায় জমজমাট খাওয়া দাওয়া।

ছবিঃ নন্দিনী সেনগুপ্ত

অনুষ্ঠানের রিভিউ লিখেছেন 
কস্তুরী চট্টোপাধ্যায়

বুধবার, ২৫ জুলাই, ২০১৮

কিশোরদের জন্য আয়োজিত গল্পবৈঠক ২১ @ দেবভাষা, গোলপার্ক


লকাতার গলিপথ জুড়ে তখন বিকেলের খেলা। তারই এক পাশে শুরু হল ‘গল্প বৈঠক’এর ২১ তম বৈঠক। সেদিন ছিল কিশোরদের জন্য স্বরচিত গল্পপাঠের আসর।
সমগ্র অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন শ্রীমতী সোনালী ভট্টাচার্য। সঞ্চালনার ফাঁকে ফাঁকে ছোটদের জন্য পদ্য, ছড়া অন্য মাত্রা যোগ করেছিল।
অতিথি গল্পকার শ্যামলী আচার্য পড়লেন "মেসি" নামে গল্প। স্বপ্নের ফুটবল মাঠে শরণ্যার মেসিকে পাওয়ার গল্প বলেন। বিশ্বকাপ চলাকালীন এই গল্প রীতিমত রিলেট করলেন উপস্থিত সকলে। স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পের নাম, "মিঃ টুসন এবং স্যার বিশালাক্ষী দন্ডপাট" । ছোটখাট লুজ বল থাকলেও কিশোর গল্প হিসেবে সার্থক।  ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অংক স্যারের ভাই’ গল্পটি ছোট্ট টুবলু-র প্রচণ্ড রাগী আর গম্ভীর অংক স্যার ও টুবলুর প্রণোদনায় তাঁরই লুক-অ্যালাইক এক পাগলের প্রতি তাঁর হৃদয় মুচড়ে ওঠার কাহিনী। ‘সেই চোখ’ ছিল তপশ্রী পালের ছোট্ট টানটান কিশোর থ্রিলার। নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত ‘মুগার উপাখ্যান’-এ শুনিয়েছেন এমন এক কাহিনী, যেখানে সকলকে টপকে অকস্মাৎ এক বিরাট অজগরকে পরাস্ত করার সুযোগ পেয়েও কীভাবে সেই লোভ সংবরণ করে মুগা বীরের মতো তাকে হেলায় ছেড়ে দিচ্ছে আগামী সম্মুখ সমরের প্রত্যাশায়। কৃষ্ণা দাসের ‘মায়ের দয়া’ ছোঁয়াচে পক্স আর তার সংক্রমণ নিয়ে, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার কোনো বিশেষ অঞ্চলের উপভাষাসমৃদ্ধ সংলাপ সহ এক মা, তাঁর শিশু সন্তান ও পাঁচিপিসির মায়াবিদ্ধ গল্প। যশোধরা রায়চৌধুরী ‘দুষ্টুরা’-য় বটলা, জড়ুল, কুটকুটে, ইব্রাহিম ইত্যাদি আরও সব কে কে যেন আছে – তাদের প্রায় স্বচ্ছ ভারত অভিযান আর ‘বটলাকে মারলে জড়ুল কেঁদে ওঠে, এমনই বন্ধুত্ব’-র গল্প। বজ্জাৎ কিশোর বান্টি আর তার সাকরেদ, তস্য বজ্জাৎ এক পোষা ল্যাব্রাডর স্কুবি মিলে এক সকাল চুরমার করার মজাদার গল্প শোনালেন জয়তী অধিকারী। 

‘সম্বিতের সঙ্গে মাত্র দুদিন ডেট করেছি আর তুই সেটা মাকে বলে দিলি?’ – বর্ষা তার দুবছরের ছোটো বোন দিঠিকে বলল একথা, আর শুরু হয়ে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়েও শেষ হল না বুবুন চট্টোপাধ্যায়ের কিশোর গল্প ‘প্রেম’। এখনকার কিশোররা এইসব অত্যাধুনিক সংলাপে যথেষ্ট অভ্যস্ত তাই গল্পটি বাস্তবিক ভাবে সফল। ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় খুব সুন্দর একটা গল্প পড়লেন – ‘মিতুলের জলরহস্য’। নয় বছরের ছোট্ট মিতুল একদিন দুপুরবেলা, ঘরের ভিতরে চুঁইয়ে নামা বৃষ্টির জলের উৎস খুঁজতে গিয়ে পেয়ে গেল তার দাদুর হারিয়ে যাওয়া কবিতা লেখার খাতা এবং গল্প এগোল সিনেমার ফ্ল্যাশ ব্যাক ফ্ল্যাশ ফরোয়ার্ড টেকনিকেই।

এই সব পাওয়া হল গত ১লা জুলাই, ২০১৮ বিকেলে ‘দেবভাষা’ নামক একটি মনোরম বই বিপণীতে। দক্ষিণ কলকাতার গোলপার্কের বই আর শিল্পের আবাস এটি। ছিল শ্রীমতী অনিতা মুখোপাধ্যায় এবং শ্রীমতী সুতপা গুপ্তের গলায় মন ভালো করা বর্ষার রবীন্দ্রাগীতি। বিনা যন্ত্রানুসঙ্গে হৃদয়ে মোচড় তোলা গান। এমন ঘরোয়া বৈঠকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিশিষ্টতা হল, প্রতিটি গল্প পাঠের পরেই গল্পটি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও প্রাসঙ্গিক কথোপকথন। এদিনের গল্প পাঠের বিষয় ছিল লেখিকাদের লেখা ছোটোদের গল্প। আলোচনায় উঠে এল প্রশ্ন – ছোটোদের গল্প মানে কি ছোটোদের জন্যে গল্প, নাকি ছোটোদের নিয়ে গল্প? কবি কিংশুক মণ্ডল ও প্রকাশক পলাশ বর্মন, আলোচনার দায়িত্ব সামলাবার চেষ্টা করলেন অত্যন্ত যথা যত ভাবে। আড্ডার মাঝে মাঝে গল্পের নির্মাণ, তার ভাষা বা শৈলী নিয়ে সামান্য সংশোধনবাদী ফুট কাটাও হল । আর ছিল দুই খুদে কিশোরী, আগমনী এবং স্বাতন্ত্র্রী।  যাদের সুচিন্তিত মতামত গল্পগুলি কে আরও মাত্রা দিল। গল্পের ভালোমন্দ বিচার করেছে তারাও। লেখকদের শুধরনর জায়গা তৈরি হল তাদের জন্য।
শেষে বিস্মিত চোখে ঘুরে ঘুরে দেখলাম দেবভাষার শিল্পের আবাসে স্থিরচিত্রের প্রদর্শনী, যেখানে একদিন ক্যামেরায় চোখ রেখেছিলেন দেবাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। যাঁকে যৌবনের শুরুতেই অকারণ ডেকে নিয়ে গেছে মৃত্যু। তাঁর বিষয়ে শুনলাম তাঁর মা, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপিকার  কথা। শেষের চা, মিষ্টি আর আন্তরিকতায় ঘন এমন যাপন বেশ মনে রয়ে যায়। 






রিভিউ লিখলেন কবি, প্রকাশক পলাশ বর্মণ (কলিকাতা লেটার প্রেস) 


মঙ্গলবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৮

"গল্পবৈঠক-২০" ২য় বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান

  
আমন্ত্রণ পত্রঃ নন্দিনী সেনগুপ্ত 

“মধুর তোমার শেষ যে না পাই, প্রহর হল শেষ” রবীন্দ্রসঙ্গীতটি বড় সুন্দর প্রকাশ করেছিল সেদিনের গল্প বৈঠকের রূপটিকে । চৈত্রের প্রহর শেষের শেষবেলায় কলকাতা সেদিন উপচে পড়েছিল গড়িয়াহাটের সেলে । পরদিন যে বাঙ্গালির প্রিয় ১লা বৈশাখ ! সেই ভিড় পেরিয়ে একটু এগোলেই বাসন্তীদেবী কলেজের পাশে “আমন্ত্রণ” বুটিকের তিনতলায় সঞ্চারী চক্রবর্তীর বাড়ির সুসজ্জিত ছাদে বসেছিল গল্পবৈঠকের দ্বিতীয় বর্ষপূরতি ও বিংশতিতম অনুষ্ঠানের আসর ।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই বৈঠকের আহ্বায়িকা ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় দু কথায় বললেন গল্প বৈঠকের উদ্দেশ্য, তার গত উনিশটি বৈঠকের পথচলা ও আগামীদিনে কিভাবে তিনি এগিয়ে নিয়ে যেতে চান এই বৈঠককে । সমবেত হাততালির মধ্য দিয়ে শুরু হল অনুষ্ঠান । সেদিন বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান বলে গল্পপাঠ ছাড়াও ছিল সঙ্গীত, শ্রুতিনাটক, কবিতা ইত্যাদির আয়োজন । গল্পবৈঠককে ভালবেসে হাজির ছিলেন অনেক দর্শক শ্রোতা বন্ধু । ছিলেন পৃথ্বীশ মুখোপাধ্যায়। ছিলেন প্রখ্যাত লেখিকা কঙ্কাবতী দত্ত । যোগ দিয়েছিলেন সাহিত্যিক পাপিয়া ভট্টাচার্য, তৃষ্ণা বসাক প্রভৃতি আরো অনেকে ।
এবারের অনুষ্ঠান যেহেতু দীর্ঘ, তাই সবাইকে অনুরোধ করা হয়েছিল ২৫০ – ৩০০ শব্দের মধ্যে “রক্ত না ঝরা রহস্য” এই বিষয়ের ওপর অনুগল্প লেখার জন্য । অত্যন্ত ছোট পরিসরে এবং রক্ত না ঝরিয়ে অর্থাৎ No violence – No bloodshed করে রহস্য গল্প লেখা যথেষ্ট কঠিন কিন্তু আজ হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বি – তাই হাসিমুখে সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন লেখকরা ।
প্রথমেই ছিল ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুললিত কন্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত । এরপর সঞ্চালিকা মৌমিতা ঘোষ পড়লেন তাঁর লেখা স্বরচিত সুন্দর একটি কবিতা ও ডেকে নিলেন প্রথম গল্পকার মহুয়া চৌধুরীকে । গল্পের নাম “রহস্যটা সামনে ছিল” । পারিবারিক সম্পত্তি একটি হীরের আংটি চুরি গেছে । অনেক অপরাধের রকম দেখলেই বোঝা যায় এর মধ্যে পরিচিত বা বাড়ির কেউ যুক্ত । এই সুত্র ধরেই শুধু বুদ্ধি দিয়ে কি ভাবে এর সমাধান করলেন হাবু কাকু তাই নিয়েই গল্প । লেখিকার সহজ, ঝরঝরে লেখনীর পরিচয় পাওয়া যায় এই লেখায় ।
অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে চা, আম পোড়ার শরবত, গরম শিঙ্গাড়া – আপ্যায়নের কোন ত্রুটি ছিল না । সেগুলি সহযোগে আবার ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে দুটি সুললিত রবীন্দ্রসঙ্গীত । শেষ গান “আজি যে রজনী যায় সখী ।“ গানের অভিঘাত কানে বাজতে লাগলো দীর্ঘক্ষণ ! তারমধ্যেই মৌমিতার কবিতা পেরিয়ে গল্প পড়তে এলেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ । গল্পের নাম “কফি @ সি সি ডি” । গল্পটির মধ্যে থ্রিলার চলচিত্রের বীজ লুকিয়ে আছে । দু চারটি কথোপকথনের মধ্য দিয়ে ঘটনার ঘনঘটার মধ্যে হঠাত শ্রোতাকে নিয়ে ফেলেছেন গল্পকার । রুদ্ধশ্বাস গল্পটিতে অপরাধী যখন মনের মানুষ, তখন বিবেকের টানাপোড়েন লেখক দেখাতে চেয়েছেন । গল্প আর একটু পরিসর পেলে হয়তো আরও ভালো হত।
এরপর স্বরচিত কবিতায় নিজে সুর দিয়ে এক নতুন রূপে পাঠ করলেন তমালী রায় । কবিতা ও সুর দুটিই সুন্দর ।


এদিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শ্রুতিনাটক । পরিবেশন করলেন “ঊচ্চারণের” তরফ থেকে সুস্মেলী দত্ত, সোমা ঘোষ ও কস্তুরী চট্টোপাধ্যায় । শ্রুতিনাটকের নাম “আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান” । রবি ঠাকুরের মানস প্রেমিকা রানু, সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মানসী নীরা ও এক আধুনিকা রীনার পারস্পরিক কথোপকথন ও তাদের মনোজগতে নিয়ে গেলেন এঁরা – মুন্সিয়ানার সঙ্গে । নতুনত্ব ছিল বিষয় ও পরিবেশনে ।
আবার গল্পে ফিরে আসা । গল্প পড়লেন ডঃ সোনালী । নাম “গল্পের মধ্যেখানে”। এক অদ্ভুত পরাজাগতিক অনুভুতি, মনাস্ট্রি, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জগত, মিশরের রাস্তাঘাট, শেষে জীবন্ত ড্রাগনের হাতে মৃত পান্নাচোর। স্বল্প পরিসরে  অত্যন্ত লিরিকাল গল্পটি মুহূর্তে আমাদের নিয়ে গেলো অন্য এক জগতে । 
এরপর গল্প পরিবেশন করলেন তপশ্রী পাল । গল্পের নাম “খাদ্য রহস্য”। আমাদের মধ্যে আজ জাতপাত, ধর্মের কত ভেদাভেদ – অথচ শিশুরা এইসব ভেদের কত ওপরে । কেমন করে বাড়ির খাবার দাবার হঠাত হঠাত উধাও হয়ে যাওয়ার রহস্য সমাধান হল একটি শিশুর কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে তাই নিয়েই গল্প । কোন রক্তপাত, কোন হিংসা না দেখিয়েও রহস্য গল্প লেখা যায় ও লেখা প্রয়োজন – একথা আয়োজিকা ইন্দিরা আবারো জোর দিয়ে বললেন এই গল্প পাঠ শেষে ।
অদ্বিতীয়া পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদিকা মৌমিতা তারণ যে রহস্য গল্পটি পড়লেন তার নাম “পাচার” ।  


স্প্যানিশ অনুবাদ
জয়া চৌধুরী এদিন পড়লেন মৌলিক গল্প “পৌষালির বন্ধু” । ড্রাগের নেশা আমাদের শিক্ষিতদেরও কেমন ভয়ঙ্কর ভাবে গ্রাস করছে , ছড়িয়ে পড়ছে মধ্যবিত্ত পুরুষ মহিলা নির্বিশেষে । সেই ভয়দায়ক বিষয়টি তুলে এনেছেন লেখিকা । কে ছিল বাড়িতে আশ্রিত সেই ব্যাক্তি? শেষ পর্যন্ত মনোযোগ ধরে রাখে গল্পটি ।
জয়তী রায়ের গল্পের নাম “দাদুর রোগ” । দাদুর পেটমোটা হোমিয়প্যাথির বাক্স থেকে কি কি আবিষ্কার করলেন কাকা আর কিভাবেই বা ধরা পড়লো দাদুর রোগ তাই নিয়েই ছোট্ট মিষ্টি গল্প জয়তীর । আমাদের অনেকের বাড়িতেই লুকিয়ে আছেন এরকম অনেক শখের গোয়েন্দা দাদা কিম্বা কাকা – বাঙ্গালীর মনের মধ্যে যে ফেলুদা বাসা বেঁধেছে সেই কবে !
শুনলাম কৃষ্ণা দাসের গল্প “একটি সজীব হত্যার পূর্বে” । মড়ার পচা দুরগন্ধ থেকে কিভাবে গল্প গিয়ে পৌঁছল একটি ফুলে ! তাই তো বলা হয় “ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন” ! সত্যিই বৈচিত্রে অনন্য ছিল এবারের গল্পবৈঠকের গল্পগুলি।
এরপর আমাদের সেদিনের হোস্ট সঞ্চারী শোনালেন “দূরে কোথায় দূরে দূরে – “ মুহূর্তে জমজমাট গল্পের আসর থেকে মন উদাস হল সুদূর গগনে মেঘেদের সাথে । মনকে আবার ফিরিয়ে আনলেন ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায় । তাঁর গল্প “টক্কর” । অধিবেশনের অন্যতম কৌতুহলোদ্দীপক গল্পটিতে বিবদমান স্বামী স্ত্রী অরিন্দম ও পৃথা । স্বামীর ব্যাবহারে চুড়ান্ত আহত হয়ে স্ত্রী আলাদা থাকেন । কিভাবে শঠে শাঠ্যং হল – স্বামীর ওপর শোধ নিলেন স্ত্রী, তাই নিয়েই গল্প । লেখিকা দেখিয়েছেন মানুষের মনোজগতের বিভিন্ন টানাপোড়েন, গল্পে আছে রহস্য, সঠিক সুত্র ধরে তাঁর সমাধান । বহুমাত্রিক গল্পটির বড় গল্প বা উপন্যাস হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রচুর ।
নন্দিনী সেনগুপ্ত শোনালেন আর একটি অত্যন্ত সুন্দর গল্প । গল্পের নাম “যৌগিক পত্র” । কিভাবে ড্রাগের নেশা আক্রমণ করছে আমাদের কৈশোরকে সেই বিষয়টি আবার ঊঠে এসেছে এই গল্পে । কিভাবে স্কুলের জন্য যৌগিক পত্র তুলতে গিয়ে কুমু আবিষ্কার করে ক্যানা”বিষ” আর বাঁচায় তাঁর দাদাইকে? শেষ অবধি টানটান হয়ে শোনার মত গল্প ।
কৃষ্ণা রায় শোনালেন গল্প “বারুদ” । লেখিকা রহস্যের মোড়কে আবার আমাদের টেনে নিয়ে গেলেন সামাজিক বহু আলোচিত একটি বিষয়ে । মা এর ছেলের ওপর অধিকার বোধ ও ভালোবাসা মাত্রা ছাড়ালে কিভাবে নষ্ট হয় ছেলের জীবন ।
সবশেষে গল্প পরিবেশন করলেন গল্পবৈঠকের আহবাহিকা ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় । গল্পের নাম “দইমাছ”।
কিশোর গোয়েন্দা পুপুল কিছুতেই বুঝতে পারে না ফ্ল্যাট বাড়ির সদর দরজা খুলে এক ভদ্রলোক অত রাত্রে রোজ যান কোথায় গাড়ী নিয়ে । এই কৌতুহল দমন করতে না পেরে বাবাকে ওই গাড়ির পিছু ধাওয়া করতে বাধ্য করল পুপুলের গোয়েন্দা মন । কিন্তু কি আবিষ্কার করল পুপুল? আমাদের একটু উদ্বৃত্ত কত মানুষের প্রয়োজন মেটাতে পারে সেটিই এই মননশীল গল্পের উপজীব্য ।
গল্পের শেষে একের পর এক গান চলল রাত বাড়ার সাথে সাথে – কখনো রবীন্দ্রসঙ্গীত, কখনো দ্বিজেন্দ্রগীতি, লোকগীতি, আধুনিক  শোনালেন সঞ্চারী, ওয়েলস, মৈত্রেয়ী বণিক, জয়িতা রাহা প্রভৃতি সঙ্গীতশিল্পী । সুন্দর কীবোর্ড ও গীটার ছিল সঙ্গে । 



সুদূর রায়গঞ্জ থেকে গল্পবৈঠকের জন্মদিনে কেক নিয়ে এসেছিলেন কবি শর্মিষ্ঠা ঘোষ । কেক কাটলেন অগ্রজ সাহিত্যিক গল্পকার পাপিয়া ভট্টাচার্য । সবশেষে ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের গান “আমায় ডুবাইলি রে আমায় ভাসাইলি রে” আর সঙ্গে  ডঃ সোনালির নাচ সত্যি আপ্লুত করল, ডোবাল, ভাসাল আমাদের আবেগ আর অনুভূতিকে । একটি না ভোলার মত সন্ধ্যা উপহার পেলেন উপস্থিত সবাই । এই আনন্দের মাঝেও আমাদের মধ্যে সেদিন পেলাম না গল্পবৈঠকের সাথী গল্পকার নিবেদিতা ঘোষ মারজিত, বুবুন চট্টোপাধ্যায়, মহুয়া মল্লিক, অনিন্দিতা মন্ডল ও আরো কয়েকজনকে । তবে এদের সবার লেখা ধরা রইল বৈশাখী প্যাপিরাস ই-পত্রিকার পাতায় ।


রিভিউ লিখলেনঃ তপশ্রী পাল   
ছবি সৌজন্যঃ পৃথ্বীশ মুখোপাধ্যায়
      
সংবাদনজর, বুধবার  ১৬ই মে ২০১৮ 

এইসময় শনিবার, ২১ শে এপ্রিল ২০১৮

 

জরুরী কথা

প্রতিবার গল্পবৈঠক শেষে ইনবক্সে মেসেজ ভরে যায়। এবারেও তাই হল। কি করে গল্পবৈঠকে গল্প পড়তে পারি? অনেকবার আগেও বলেছি, আবারো বলছি।
সর্বাগ্রে তিনটি "উ"কে চাই। গল্পকার বন্ধুকে হতে হবে উপকারী, উপযোগী, উতসাহী।
আমাদের অনুষ্ঠানের কোনো মেম্বারশিপ চাঁদা নেই।
এখানে অনুষ্ঠান মূলতঃ কোয়ালিটির ওপর বেস করে হয়।
কোয়ান্টিটি তে প্রাধান্য দেওয়া হয় না।
আমরা সম্মাননা জ্ঞাপন করিনা। 
আমাদের প্রতি অনুষ্ঠানে নতুন নতুন থিম আর সীমিত শব্দসীমার মধ্যে ছোট ছোট গল্প লেখাটাই প্রধান উপজীব্য বিষয়। আর?
অন্ততঃ গল্পকারের একটি গদ্য সংকলন থাকাটা বাঞ্ছনীয় unless তিনি অনেকদিন কবি অথবা সম্পাদনা, সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। 
প্রিন্ট অথবা ওয়েব পত্রিকায় অন্ততঃ দুটি গল্প প্রকাশিত হওয়াটা বাঞ্ছনীয়।
গল্পটি যেন পাঠযোগ্য হয়।
পাঠ যেন শ্রুতিমধুর হয় এবং স্পষ্ট উচ্চারণ হয়।
আর ওপরের ক্রাইটেরিয়া গুলি সব ফুলফিলড হলে শ্রোতা হয়ে আসতে হবে আপনাকে অথবা কোনো কাজে অংশ নিতে হবে।
তারপর আমরাই ডেকে নেব আপনাকে একদিন। শুধু নিজের গল্পটি পড়লাম আর চলে এলাম হলে চলবে না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাকে অনুষ্ঠানের রিভিউ লিখতে হবে। কোথাও সেটি প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। সঞ্চালনার দায়িত্ত্ব নিতে হবে দরকার পড়লে। তার চেনা পরিচিত কোনো আলোচক কে নিমন্ত্রণ করে আনতে হবে।
প্রত্যেক অনুষ্ঠানে বিদগ্ধ আলোচক থাকেন। তাঁর আলোচনা নেবার মত শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। 
এবার প্রস্তুত তো?