শুক্রবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৮

২০১৮ য় প্রথম গল্প বৈঠক

ত ২৪শে জানুয়ারি, ২০১৮ অনুষ্ঠিত হল গল্পবৈঠকের সপ্তদশতম সাহিত্য বাসর। আনন্দের চাঁদের হাট বসেছিল ইছাপুর মণ্ডল রাজবাড়িতে । ঐতিহ্যমণ্ডিত এই বাড়িতে শীতের নরম দ্বিপ্রাহরিক রোদ্দুরে গা এলিয়ে নেমে এলো গল্পেরা, তার সাথে পরম সুখে মাথা নেড়ে তাল দিল গঙ্গাতীরের মৃদু বাতাস। যারা গল্পবৈঠকের সাথে জড়িত, সবাই জানেন যে এখানে যারা আসেন, গল্প এবং শুধুমাত্র গল্পের টানেই আসেন। অন্য কোনও বিশেষ আকর্ষণ যেমন পত্রিকায় গল্প ছেপে বের হওয়া বা বিশেষ কোনও পুরস্কার প্রদান, সম্মাননা প্রদান, বই প্রকাশ... এসব কোনও কিছুর সাথে গল্পবৈঠক বা গবৈ-এর কোনও সম্পর্ক নেই।

মধ্যাহ্নভোজনের পরে ঘরোয়া এই বৈঠক শুরু হল অতিথি গল্পকার শতদ্রু মজুমদারের গল্প ‘কবি ও কবিতা’ দিয়ে। কাব্যপাঠের এক আসরে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র এক কবির কবিতার খাতা হারিয়ে যাওয়াকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে গল্পের ঘটনাবলী। কবির সন্দেহ, মানসিক দোলাচল, কবিতার পাণ্ডুলিপি হারানোর কষ্ট এসব অনুষঙ্গের মধ্য দিয়ে যেন লেখক বর্তমান সময়ের কাব্যলক্ষ্মীর দৈন্যদশার কথাই ব্যক্ত করলেন কিছু ব্যঙ্গের মোড়কে।

দ্বিতীয় গল্পকার ছিলেন প্রদীপ গুপ্ত। গল্পের নাম ‘বসন্তপূর্ণিমার খোয়াব’। চাঁদ এবং এক পাগল বাউলকে কেন্দ্র করে নেমে এলো এক স্বপ্নালু আবেশ। লেখার কাব্যিক শৈলীর মধ্য দিয়ে জ্যোৎস্নার আলো এসে যেন মুছে দিল বাস্তব এবং কাল্পনিক জগতের সীমারেখা। গল্পের শেষে চন্দ্রোদয় বয়ে নিয়ে আসে নতুন আশাবাদী ইঙ্গিত।

তৃতীয় গল্পে নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত বললেন একটি মেয়ের গল্প। আমোদিনী কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেও, এই গল্পেও চাঁদ একটি উল্লেখযোগ্য পার্শ্বচরিত্র, কারণ গল্পের নাম ‘চন্দ্রবিদ্ধা’। সত্যিই কি চাঁদ আমোদিনীকে উন্মাদ করে দেয়? নাকি সংসারের চার দেয়াল থেকে পথে বেরিয়ে জন্ম হয় আরেকটি নতুন মেয়ের, যে দূর থেকে পরম আমোদে পর্যবেক্ষণ করে জগতসংসার। সাধুভাষায় লেখা এই গল্পের জোরালো বার্তা পাঠক এবং শ্রোতামণ্ডলীকে ভাবতে বাধ্য করে।

চতুর্থ গল্পকার ছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক কণা বসু মিশ্র; পড়লেন হার-না-মানা চিরযুবক মানুষের গল্প ‘সৌম্যকান্তি’। তিনি কোনওভাবেই মেনে নিতে চাননা তার বয়স বাড়ছে। টুকরো টুকরো খুশি রীতিমত হিসেব করে কুড়িয়ে বাড়িয়ে, সাজিয়ে নিতে চান বেঁচে থাকার আনন্দ। সংসার আড়ালে হাসে, তাল রাখতে পারেনা তার অদম্য ইচ্ছের সাথে, কিন্তু তাতে সৌম্যকান্তির বয়ে গেলো। আকর্ষক নানা সংলাপের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা গল্পের পরিণতি চরম মুহূর্তে পৌঁছায়, যখন সৌম্যকান্তি নিজের বুড়োটে প্রতিবিম্বকেও আয়নায় লাথি মেরে অস্বীকার করেন।


 পঞ্চম গল্প ‘পরবাস’এ কস্তূরী চট্টোপাধ্যায় বিবৃত করেন একটি মেয়ের কথা। শিশুকালে, কিশোরীবেলায় উদারমন মা’কে সংসারে এমনকি নিজের অধিকারটুকুও দাবী করে নিতে দেখেনি বন্যা। হয়তো তাই সে নিজেও কোনওকিছু আঁকড়ে ধরেনা সেভাবে, বরং অসুখী সংসার-জীবনের অজস্র না-পাওয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় থাকে কখনও না-যাওয়া, এক অগম্য প্রবাসের। সহজ ভঙ্গিমায় লেখা এই গল্প টেনে রাখে, শ্রোতারা একাকার হয়ে যায় বন্যার সাথে, আশায় জাগে মন, তার অনাগত প্রেমের জন্য।

পরবর্তী গল্পকার তমালী রায় তার ‘অন্তর্লীনা’ গল্পে শুনিয়েছেন এক নারী দেবদত্তার কথা, যার অন্তর্জগত হঠাৎ টলে যায় মনোরোগে। ছাত্রজীবনে প্রিয় বন্ধু গুঞ্জন ছিল লেখালেখি এবং সৃষ্টিকর্মের অনুপ্রেরণা। মৃত্যু তাকে কেড়ে নিলেও, সেই বন্ধুর দেওয়া নাম ‘ভ্রমর’ এর মধ্যে সুপ্ত নিজেরই অস্তিত্ব যেন অতীত থেকে ফিরে এসে তৈরি করে এক দ্বন্দ্ব। অবশেষে সেই দ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে আসার কথা সরল অথচ মনোগ্রাহী ভাষায় বলেন গল্পকার।

অনিন্দিতা মণ্ডল তার ‘পুতুল’ গল্পে সহজভাষায় ব্যক্ত করেন যাদুবাস্তব। গায়ক পার্থর সঙ্গে চিত্রকর/ভাস্কর যীশুর বন্ধুত্বকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে কিছু নারী দাঁড়িয়ে থাকে শিল্পসৃষ্টির মায়াজগতের সাথে বাস্তবের সীমানা জুড়ে। এদের অস্তিত্ব পার্থর কাছে ইন্দ্রিয়াতীত মনে হয়, চিনেও চিনতে পারেনা। সবাইকে যেন যীশু বশ করে পুতুল বানিয়ে রেখেছে বলে মনে হয় তার। একসময় সে নিজেও একাকার হয়ে যায় যীশুর সৃষ্টির সাথে।

কৃষ্ণা দাস তার ‘গোপনীয়’ গল্পে বলেন দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনের চড়াই-উতরাইয়ের মাঝে থাকা এক নারী আদিরার কথা। সংসারে সবকিছুর সাথে মানিয়ে নিতে নিতে আদিরা হয়তো নিজের ভালোবাসাটুকুও চিনতে পারেনা। প্রতিশোধের গোপন খেলা কি তার নিজের সাথেই? স্বামী অরিন্দমের মাথার নিচের বালিশ ঠিক করতে করতে নিজেকেই সে আশ্বাস দিতে চায়, ‘ভালোবাসি না, একটুও না।’ মায়া জাগিয়ে শেষ হয় এই গল্প।

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় তার ‘পূর্বপুরুষ’ গল্পে বলেন আধুনিক সমাজের এক পুরুষের কথা, যে সবার নেতা হয়ে উঠতে চায় যেন আদিম পশুর দলের গোষ্ঠীপতির মতো। আধুনিক শিক্ষাদীক্ষা সত্ত্বেও মানুষ অতিক্রম করে উঠতে পারেনা জিনের মধ্যে গ্রথিত থাকা তার পূর্বপুরুষ শিম্পাঞ্জির প্রবৃত্তি। নেতা হবার জন্য সে এমনকি অন্য কাউকে খুন করে নিজের পথের কাঁটা পরিষ্কার করতে চায়। সমান্তরাল ভাবে চলতে থাকা টেলিভিশান চ্যানেলের স্টোরি এবং গল্পের নায়কের মনের দোলাচল শ্রোতাদের বিশেষভাবে স্পর্শ করে।

এই গল্পবৈঠকে ভিন্ন স্বাদের অনুবাদ গল্প নিয়ে এলেন জয়া চৌধুরী। এলেনা পনিয়াতৌস্কার স্প্যানিশ গল্প ‘পরিচয়’ পাঠ করে শোনালেন। সুন্দর পঠনভঙ্গিমায় শ্রোতারা সবাই যেন গল্পের নায়কের সাথে চাষির ট্র্যাক্টরে চড়ে সঙ্গী হলেন পাহাড়ের পথে। উপত্যকা পেরিয়ে গল্প পৌঁছায় এক উত্তরণের দিকে, যখন গল্পের নায়কের কাছ থেকে কোনও দান সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে, চাষি নিজেই তাকে একটা নাম দিতে চায়। কারণ, যে তার অন্তরের সম্পদে ঋদ্ধ, শুধুমাত্র সেই পারে কিছু দিতে।

থিওডোর স্টর্মের লেখা একটি জার্মান শিশুগল্পের অনুবাদ ‘হাবুলের ভ্রমণবৃত্তান্ত’ পাঠ করেন নন্দিনী সেনগুপ্ত। বেশি বেশি ঘুরে বেড়াতে গিয়ে হাবুলের ভারি বিপদ হয়েছিল, কাজেই অতিরিক্ত কোন কিছুই যে ভালো নয়, এই গল্প সেরকম এক নীতিশিক্ষার কথা বলে। এছাড়াও দেখানেপনা করতে গিয়েই হাবুল নিজের বিপদ ডেকে এনেছিল, অতএব দেখানেপনার বিরুদ্ধেও একটা বার্তা আছে এই গল্পে।

মিষ্টিমুখ এবং খোলা আকাশের নিচে আড্ডা-গানে শেষ হল গল্পবৈঠক। অনতিদূরেই গঙ্গার বহমানতার সঙ্গে গল্পের প্রবাহ নিয়ে ঘরে ফিরলাম আমরা । এবারের আসরের পরম প্রাপ্তি ছিল কণা বসু মিশ্রের উপস্থিতি, যিনি অন্তরঙ্গ ভঙ্গীতে তাঁর লেখক জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ভাগ করে, আলো করে রেখেছিলেন গবৈ। নিঃশর্ত বন্ধুত্বে জড়িয়ে থাকা গল্পবৈঠকের মানুষেরা সূর্যের অস্তরাগে মিশিয়ে মেখে নিয়েছিল এক আনন্দের গুলাল। গবৈ এগিয়ে চলুক এভাবেই বন্ধুদের গল্পহাত জড়িয়ে। 



প্রতিবেদন লিখলেন নন্দিনী সেনগুপ্ত

সোমবার, ২৮ আগস্ট, ২০১৭

"মিতালি"র আয়োজনে ষোড়শ গল্পবৈঠকে কিশোর গল্পপাঠ এবং লাইব্রেরী উদ্বোধন




ক্ষিণ কলকাতার কালিকাপুরের অক্সফোর্ড স্কুলের আঙিনায় বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা মিতালি-র আহ্বানে অনুষ্ঠিত হল গল্পবৈঠকের ষোড়শতম সাহিত্য বাসর।
মিতালি, একটি উজ্জ্বল প্রয়াস, যার লক্ষ্য নারী ও শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অপুষ্টি থেকে রক্ষা করা, এবং বঞ্চিত শিশুদের সাংস্কৃতিক সচেতনতা বৃদ্ধি।
এঁরা সুন্দর করে মঞ্চ সাজিয়েছিলেন।অতিথিদের আপ্যায়ন এবং মিষ্টি মুখের আয়োজন করেছিলেন, এবং ছোটদের বই পড়ার অভ্যাসকে এগিয়ে নিইয়ে যাবার জন্য , একটি গ্রন্থাগারের উদ্বোধন ও করলেন এই অনুষ্ঠানকে সংগে নিয়েই । গল্প বৈঠকের সদস্য এবং মাননীয় অতিথিরা প্রত্যেকেই কিছু বই উপহার দিয়ে অংশভাক হয়ে রইলেন এই আনন্দের মুহুর্তটির ।
মিতালি-র পক্ষ থেকে একটি উদ্বোধনী সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে সুরু করলেন সমগ্র অনুষ্ঠানটির ।


এরপর গল্প বৈঠকের অন্যতম আয়োজক শ্রীমতী ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় সঞ্চালনার ভার তুলে দিয়েছিলেন সপ্রতিভ মঞ্চশিল্পী, অনুবাদক, এবং সুবক্তা সাহিত্যিক জয়া চৌধুরীর হাতে। জয়া মঞ্চে আহ্বান করে নিলেন, আজকের আলোচক সাহিত্যশিল্পী অতিথিদের।প্রখ্যাত সাহিত্যিক রতনতনু ঘাটি, বিনতা রায়চৌধুরী,বুবুন চট্টোপাধ্যায় এবং মহাশ্বেতা রায়কে মিতালির সদস্যরা মঞ্চে বরণ করে নেবার পর, জয়া চৌধুরী স্ত্রোত্র পাঠের মধ্য দিয়ে শুভারম্ভ করলেন এই বৈঠকি আড্ডার ।
প্রথমেই জনপ্রিয় গল্পকার দীপান্বিতা রায় গল্প পড়লেন । গল্পের নাম, চেনা ঠিকানা । দরিদ্র ট্যাক্সি চালক আনোয়ার, আর তার পরিবারে, অবাঞ্চিত মাতৃহারা কন্যা লক্ষ্মী, কেমন সহজেই আপন হয়ে অকালে নিহত মেয়েটির স্থান পূর্ন করে, জেনে মনে মধ্যে মমতার ঢেউ ওঠে । লেখিকা অনায়াস দক্ষতায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি , মানবিকতা, কন্যা সন্তানের প্রতি আমাদের দায়িত্ব এই সব বড় বড় তত্ত্বকে বক্তৃতার মঞ্চ ঠেকে ঘরের উঠোনে নিয়ে এসেছেন। এই জল রঙে আঁকা ছবিটি বহুকাল মনে থাকবে।


বিখ্যাত সাহিত্যিক, শিশু সাহিত্যের দিকপাল শ্রী রতনতনু ঘাটি আলোচনা করলেন এ গল্পের। তিনি বললেন, এইটেই আজকের রূপ কথা। সত্যি তো  এ আমাদের ঘরের সিন্ডারেলার গল্পই বটে।আরও বললেন, সাহিত্য, বিশেষ শিশু সাহিত্যে মানুষের জয় হওয়া কতোটা জরুরি। শুনতে শুনতে মনে পড়ে গেল, “হোথা মাতৃহারা মা পাইবে চিরদিন---” কলমের জয় হোক ।
এরপরেই জয়া চৌধুরী ডাক দিলেন আমায়। অঙ্কের প্রতি ছোটদের আতঙ্ক, এবং তা কাটানোর জন্য আমার ছেলে মেয়ের সঙ্গে তাদের দাদু দিদার নানান মজার খেলা, সব বাচ্ছাদেরই চেনা লাগে। তাই ছড়ার নাম ছিল, সাত সতেরো । ছোট্ট শ্রোতাদের এক গাল হাসি, মন ভাল করে দিল।

এই ফাঁকে জয়া জানালেন গল্প বৈঠকের গোড়ার কথা। শ্রীমতী ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়, শ্রী অয়ন চৌধুরি, শ্রী নিলয়কান্তি বিশ্বাস কি ভাবে সাহিত্যের আদান প্রদানের জন্যেই গড়ে তুলেছিলেন এই আড্ডা।
গার্গী রায়চৌধুরী জানালেন ২০১২ থেকে মিতালির পথ চলার ইতিহাস।
এরপর জনপ্রিয় এবং রসিক লেখিকা তৃষ্ণা বসাক, কিশোর ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত গল্প রোবোর বাপের শ্রাদ্ধ গল্প ।  ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে রোবট সমাজ, মানুষের অভাব, অনুভূতি,প্রকৃতির সংগে আমাদের ক্রমবর্ধমান দূরত্ব কি সাবলীল হাস্যরসে মুড়ে উপহার দিলেন।এবং উপসংহারে  সময় সাঁতারুর ইলিশ আনার ছোঁয়ায় সব বাঙালি মাত।
কিশোর ই-পত্রিকার “ইছামতী”র সম্পাদক, সাহিত্যিক শ্রীমতী মহাশ্বেতা রায়, কল্পবিজ্ঞানের এই গল্পটির বিভিন্ন দিকগুলি ছুঁয়ে, আধুনিক জীবনে প্রযুক্তি ও আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে মনোজ্ঞ মতামত রাখলেন।

এরপর, ছড়াকার হিসেবে এলেন নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত। নিবেদিতা তাঁর অননুকরণীয় ভঙ্গীতে ছড়ার ছন্দে ছোটদের জানিয়ে দিলেন, বৃষ্টি হলে ছোট মানুষের কত অসুবিধে। তার কিত কিত খেলা, বাবার জলদি বাড়ি ফেরা, সব ভন্ডুল। খালি অঙ্ক টিউশানির দিন এলে ভারি সুবিধে।
এরপরে মঞ্চে এলেন শ্রীমতী ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় । তাঁর পুরাণ ছোঁয়া সরস রচনা, ভ্রমণ কাহিনী, উপন্যাস, রম্য রচনা বাঙালি পাঠকের বিশেষ পরিচিত।
ছোটদের জন্য তিনি নিয়ে এসেছিলেন গল্প, চিন্তামণি থটশপ। সেই দোকান যেখানে বুড়ো মানুষ চিন্তামণি বাবু, নানান রকম স্বপ্নের ক্রিস্টাল লজেন্সের মত বোয়েমে সাজিয়ে রাখেন। ল্যাবরেটরির বর্ননা, স্ট্যালাগমাইট, স্ট্যালাকটাইটের সৌন্দর্য, গ্লাস রডে গুলে যাওয়া স্বপ্নের রঙ, সব শেষে , অবিশ্বাসীদের থেকে দূরে স্বর্গের স্বপ্ন ছুঁতে চাওয়া একলা চিন্তামণি, সব মিলিয়ে এক সাতরঙা অপরূপ রামধনু। রসায়নবিদ লেখিকা নবরসের বেশির ভাগগুলিকেই সাজিয়ে দিয়েছেন এই আলোময় কাহিনীর মধ্যে।
আলোচনা করতে মঞ্চে সাহিত্যিক, সাংবাদিক বুবুন চট্টোপাধ্যায় তাই অবন ঠাকুর,লীলা মজুমদার এবং মানুষকে জিতিয়ে দেবার প্রসঙ্গ আনলেন। বললেন, “এমন কেন সত্যি হয়না আহা-”
পরবর্তী গল্প পাঠে এলেন বৈঠকের আরেক আয়োজক , সাংবাদিক , সাহিত্যিক অয়ন চৌধুরি । তিনি মনে করিয়ে দিলেন এ দিনটি মাদার টেরিজার পুণ্য জন্ম তিথি, এবং পথের পাঁচালি দিবস ও ।
তাঁর গল্পের নাম; স্বাধীনতা ।অবাঙ্গালি রঘুনাথ কুমারের মাতৃহীন ছেলে চতুর্থ শ্রেণীর ছোটুর ঘুড়ির সুতোর বায়না, তার বাবার জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান , আত্মসচেতন হয়ে ওঠা বাপ ও ছেলে , জীবন্ত হয়ে ওঠে শব্দ বিন্যাসে। অন্যাইয়ের সংগে আপোষ না করার স্বাধীনতা মিলে মিশে যায় ছেলের ইচ্ছেসুখে ঘুড়ি ওড়ানোর স্বাধীনতার সংগে।
আলোচনায় বিখ্যাত লেখিকা বিনতা রায়চৌধুরি প্রথমে বই এবং গ্রন্থাগারের প্রতি ভালবাসার কথা জানালেন। পরে বললেন , গল্পটি বড়দের জন্যেও কত উপযোগী ।
এরপর, জনপ্রিয় কবি সুস্মেলি দত্ত, ছড়া পড়লেন, উলট পুরাণ । ছন্দের জাদু খুশি করে দিল ছোট বড় সবাইকে।

চা সিংগারা সহ জলযোগের বিরতিতে, মিতালির ছোটরা সবার হাতে পৌঁছে দিল গোলাপ ফুল এবং নিজেদের হাতে বানানো অপুর্ব নান্দনিক কার্ড ।তারপর মঞ্চে এল মিতালির পরিশ্রমের ফসল। নীল সাড়ি , সাদা বন্ধনীর সাজে চার কিশোরী যে অপূর্ব মুদ্রা ও নৃত্যশৈলীতে নেচে গেল, “মন মোর মেঘের সঙ্গী –” অনেক খ্যাতিসম্পন্ন নাচের মহলকেও তা হার মানিয়ে দেবে। মুগ্ধ হলাম মিতালির এই কিশোর মানুষদের প্রতি যত্ন দেখে।


এরপর আবার গল্প। প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয় লেখিকা মহুয়া মল্লিক পড়লেন কল্প বিজ্ঞানের গল্প , গ্রিন প্রোজেক্ট ।রোবট অদ্রিজর চোখে মানব জীবন , প্রকৃতি , ভালবাসা , সব কিছুকে ছোঁয়ার আকুলতা, স্নেহের জন্য আর্তি, আমাদের মায়ায় ঢেকে দিল।
আলোচক শ্রী রতনতনু ঘাটি ও প্রশংসা করলেন গল্পটির ।
পরের বার মঞ্চে এলেন অন্যতম রসিক সাহিত্যিক , শ্রী রজতশুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ।তাঁর লেখার অনাবিল হাস্যরস এই সময়ের মানুষকে আনন্দে রাখে । আজকের লিমেরিক, “ আর পাগলামি নয়” ও সবার মুখে হাসি ফোটাল।
পরের গল্পকার , মউল পত্রিকার সম্পাদিকা , শ্রীমতী কৃষ্ণা দাস, কল্পবিজ্ঞানের গল্প শোনালেন।ভুন্ডুল আর গ্যামেটের আধ ঘণ্টা , গল্পটির কিছু অংশ পাঠ করে শোনালেন তিনি।
আলোচক মহাশ্বেতা রায়, জোর দিলেন ইংরাজি শব্দ কম ব্যবহারের ওপর, এবং কল্প বিজ্ঞান সব দেশের সাহিত্যেই কত বড় জায়গা নিচ্ছে, সেকথা ও জানালেন তিনি।
নতুন অতিথি তপশ্রী পাল, ছড়া পড়লেন, “ছিল রুমাল হয়ে গেল বেড়াল”।
কাগজ বিলি করা গরিব ছেলে বঙ্কুর জাদুদন্ড পেয়ে দারিদ্রকে হারিয়ে দেওয়ার গল্প ছন্দে গেঁথে শোনালেন তিনি।
সব শেষ গল্পটি এল জনপ্রিয় গল্পকার ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়, আমাদের অপূর্ব এক মিষ্টি গল্পের জলছবিতে ফিরিয়ে নিইয়ে গেলেন মাটির কাছে, শিকড়ের টানে।বাবান ও হাঁসের ছানা – গল্পটি মুগ্ধ করল ছোট বড় সবাইকে। সহজ ভাষায় প্রকৃতি জীবন সব ধরা পড়ল তুলিতে আঁকা ছবির মত গদ্যে।
বুবুন চট্টোপাধ্যায় আলোচনায় বললেন এ গল্পের মাটির গন্ধ, মরমী দৃষ্টিভঙ্গীর কথা।
এরপর উপস্থিত সকলে নতুন লাইব্রেরীটির জন্য কিছু বই দিলেন। এবং কচিকাঁচাদের হাতে বই তুলে দিয়ে লাইব্রেরীর উদ্বোধন করলেন মাননীয় শিশু সাহিত্যিক রতনতনু ঘাটি।
শেষে অতিথি সাহিত্যিক শ্রী রতনতনু ঘাটি শোনালেন তাঁর মফস্বল ঠেকে এসে কলকাতা শহরের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে ওঠার গল্প।
মিতালির মিষ্টিমুখের আয়োজন সমাপ্ত করল এই সুন্দর সাহিত্য সন্ধ্যাকে।   



প্রতিবেদন লিখেছেন সোনালী

বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৭

" রিয়েল ভার্সেস ডিজিটাল আড্ডা " এই বিষয়ে কি মত তোমাদের?

সেদিন হঠাত মনে পড়ে গেল আমাদের পুরোণো বাড়ির দালানে বসে একজোট হয়ে তুতো ভাই বোনেদের সঙ্গে জমিয়ে কাঁকড়ার ঝাল দিয়ে ভাত খাওয়ার কথা। কাঁকড়ার সুস্বাদু দাঁড়া চিবোতে চিবোতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যেত। হাতের এঁটো হাতেই শুকিয়ে যেত তবু যেন আড্ডা ফুরতো না। কিসের এত আড্ডাই বা ছিল? কেন ই বা এত গল্প জমে থাকতো জানিনা বাপু। একটা কারণ অবিশ্যি নিয়মিত দেখা না হওয়া। সকলেই ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় থাকতাম। কোনো এক ছুটির দিনে একজোট হয়ে খাওয়াদাওয়া, হৈ হুল্লোড়ে মেতে উঠতাম সকলে মিলে। মাংসের হাড় নিয়েও কাঁকড়ার মত অবস্থা হত আমাদের। আর খাওয়ার পর হাত চাটা যেন শেষ ই হত না। চাটনীতে আঙুল ডুবিয়েই চলেছি আর গল্পের গোরু গাছে উঠে আমাদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। তখন কি আর জানি বাপু যে এই আড্ডা গিয়ে থমকে যাবে একদিন? এই গোলগল্প গুলো আছাড় খাবে  ফেসবুকের চৌকাঠে? তাহলে আরেকটু নাহয় আড্ডা দেওয়া যেত। ঠিক তেমনি মনে পড়ে কলেজ কেটে কফিহাউসের আড্ডার কথা। কবিতায় কথালাপ, হেঁয়ালির ছটা, মজার জোকস বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নেবার আনন্দ। এই বাস্তব আড্ডার ঠেক এখন সোশ্যালনেটের এক চিলতে নীল অলিন্দ। আর সেখানে নিজের চেনা পরিচিত তুতো ভাইবোনরা যেমন আছে, আছে স্কুল কলেজের বন্ধুরা আর আছেন অপরিচিত কিছু বন্ধুবান্ধব ও। তবে তথাকথিত আড্ডার বাতাবরণ কি মেলে এই ডিজিটাল গল্পের আড্ডাখানায়? সেখানে কি সম্পর্কের বেড়াজাল পেরিয়ে আলাপচারিতা ধাক্কা খায়? না কি  সম্পর্কের টানাপোড়েন কে উপেক্ষা করে নিমেষেই উবে যায় কর্পূরের মত। অথচ ফেসবুকের মত প্ল্যাটফর্মে কোটি কোটি মানুষ অহোরাত্র আড্ডা দিয়েই চলেছেন। 

তাহলে কি দাঁড়াল? 

হাতের মুঠোয় স্মার্টফোন অথবা ল্যাপটপে কিম্বা ট্যাবের চ্যাটালাপই টিঁকে থাকবে? আর  মুখোমুখি বসে বাস্তব আড্ডাগুলো হারিয়ে যাবে সুপর্ণকান্তি ঘোষের সেই অমোঘ লিরিক্সের মধ্যে দিয়েই?  "কফিহাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, আজ আর নেই " বলে আমরা স্কাইপে, হোয়াটস্যাপে, ফেসবুকে চেঁচাতেই থাকব? 

এ বারান্দা থেকে ও বারান্দায় কাপড় তুলতে তুলতে কিম্বা শীতের রোদে বড়ি দিতে দিতে, অথবা ছাদে চুল শুকোতে গিয়ে কেউ কারোর মুখও দেখব না আর জিগেসও করব না? কেমন আছো গো? আজ কি রান্না হল তোমার হেঁশেলে? অথবা চলো না ঐ সিনেমার টিকিটটা কাটি।  
রোয়াকের আড্ডাও অপ্রতুল এখন। নেই সে রোয়াক ওলা বাড়ি, নেই সেই আড্ডাবাজ তরুণ তুর্কীরা। তা অবিশ্যি ভালোই একদিক থেকে। তরুণেরা কাজে ডুবে থাকাটা দেশের পক্ষে মঙ্গলজনক। আর যে তরুণরা এখনো বেকার হয়ে ফ্যা ফ্যা করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে জটলা করে তারা কি বোঝে সোশ্যালনেটের মাহাত্ম্য? অগত্যা রাস্তাই ভরসা তাদের আড্ডা দেবার জন্য। কিন্তু সেটাও তো ঠিক নয়। নব্য প্রযুক্তির কাছে আবালবৃদ্ধবণিতা যখন হার মানেনি তারাই বা কেন স্মার্টফোন খুলে ফেসবুকে বন্ধুর মুখ দেখবে না? সেটা বরং ক্ষতিকর সমাজের পক্ষে। 

কি মনে করছে লোকজন? ব্যাঙের ছাতার মত কফির ক্যাফে হয়েছে আজকাল। তবুও সেখানে গিয়ে বন্ধুরা জমায়েত হয়ে নিজের নিজের স্মার্ট ফোন খুলে ফেসবুক খুলে বসে আছে। অথবা হোয়াটস্যাপে আলাপ চালিয়েই যাচ্ছে। কফির পেয়ালা পানতা হয়ে যাচ্ছে। বেয়ারা বিল মিটিয়ে চলে যাচ্ছে কিন্তু প্রকৃত আড্ডা যেন মুখ লুকোচ্ছে সেখানেও ।
সেই নিয়েই পক্ষে ও বিপক্ষে অলোচনা হোক! জমে উঠুক শারদীয়া চক্র বৈঠক ! কমেন্ট বক্সে লেখা পোস্ট করুন!

সোমবার, ১৭ জুলাই, ২০১৭

পঞ্চদশ গল্প বৈঠকে ১৫ জনের গল্প পাঠ


ল্পবৈঠকের পঞ্চদশ আসর বসেছিল শেষ আষাঢ়ের এক মন কেমন করা বিকেলে, দক্ষিণ কলকাতার পাটুলি অঞ্চলে । না, কোন বাঁধাধরা সভা কক্ষে নয়, “নেশা’স কিচেন” নামে এক রম্য নিরিবিলি রেস্তোরায় আমন্ত্রিত হয়ে। শব্দসীমা বেঁধে রাখা অথচ টানটান সংবেদী গল্প পরিবেশনই সাধারণত এই বৈঠকের উদ্দেশ্য। সাথে অবশ্যই থাকে নির্ভেজাল আনন্দে ঘেরা মেধাবী আড্ডা। এবারের গল্পের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল সম্পর্ক। শুরুতেই স্তোত্রপাঠ করে শোনালেন কবি, স্প্যানিশ ভাষায় দক্ষ সাহিত্যজীবি জয়া চৌধুরি। নিমেষেই বাণিজ্যিক রেস্তোরাটি আমূল বদলে গিয়ে হয়ে উঠল এক পরিশীলিত সাহিত্য-সভা। আর তাতে বিশেষ মাত্রা সংযোজন করতে এগিয়ে এলেন গল্পকার ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, উৎপল কুমার বসুর স্মরণযোগ্য বর্ষার কবিতা এবং জয় গোস্বামীর মুক্তগদ্য জলঝারি থেকে পাঠে বৈঠকটি আশ্চর্য, সপ্রাণ গতিতে সঞ্চালিত হতে লাগল। চোদ্দটি ছোট গল্প আর একটি ভীষণ মন ছোঁয়া শৈশব স্মৃতিকথার আবহে সময়ের দোলাচল সে ঘরে টের পাওয়া গেলনা। মেধায়, মননে, প্রতিভার বহু স্বরে সম্পর্ক নামক এক অমোঘ জীবনব্যাপী সঙ্গতা নিয়ে আমরা বুঁদ হয়ে শুনলাম গল্পগুলি। সম্পর্কের মাঝে সম্পর্কহীনতার গল্পও প্রবলতর দাবি নিয়ে এগিয়ে এল। আসলে অভাব না থাকলে স্বচ্ছলতা কে যে ঠিকঠাক চেনা যায়না। এদিনের গল্পের আলোচনায় ছিলেন সাহিত্যিক কাবেরী  রায় চৌধুরী।




আসরের প্রথম গল্পটি পড়লেন এদিনের অতিথি গল্পকার সুবীর বোস। 
গল্পের নাম অনন্ত কুয়াশা।মানুষের ব্যক্তিগত যাপন চিত্রে কত যে বিচিত্র বিষয় লগ্ন থাকে ! মানসিক মেদুরতা, রহস্য ভরা ঘটনা থেকে শুরু করে গভীর গোপন কত যুদ্ধ-- বলিষ্ঠ ভাষায় লেখক জানিয়ে দিলেন,স্বল্প পরিসরে গল্প কত তীক্ষ্ণ সূচীমুখ হয়ে উঠতে পারে। ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প বিষম এর পটভূমি বেশ সাম্প্রতিক এবং চিরকালীন। ধর্ম পরিচয় গোপন করা এক গৃহ পরিচারিকার অকপট সত্য ভাষণ, কি ভাবে যে সংশয়-দীর্ণ সভ্য তথা শিক্ষিত মানুষকে দ্বন্দ্ব ও অসহায়তার অতল গহ্বরে পৌঁছে দিতে পারে, সে কথা লেখক বড় যত্ন নিয়ে তুলে ধরেছেন।



কৃষ্ণা রায়ের গল্প পিতৃপ্রতিম এর বিষয়বস্তুতে তেমন চমক নেই, আছে সন্তানের জন্য চিরকালীন, সীমাহীন, অযৌক্তিক স্নেহের বেদনাঘন আবহ । স্বেচ্ছায় অকরুণ হয়ে এক সফল প্রতিষ্ঠিত পুত্র-সন্তান লোক সমক্ষে নিজের অসফল বাবাকে “বাপের বয়সী বিরক্তিকর মানুষ” বলে চিহ্ণিত করলেও কাঙাল পিতৃহৃদয় সেই টুকু সবীকৃতিকেই পরম প্রাপ্তি বলে আঁকড়ে ধরেন। আমাদের শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া দাবি করে মনোযোগ কখনো এক নাগাড়ে স্থায়ী হতে পারেনা। তাই প্রয়োজন হয় ক্ষণিক বিরতির। এই বৈঠকে গল্প দিয়েই ইন্দ্রিয়দের শাসন করা হয়।আর এ তো জানা কথা, যথেষ্ট ভারী বিষয়বস্তুও রচনার প্রসাদ গুণে স্নায়ুর চাপ নামিয়ে দেয়।


রজতশুভ্র বন্দোপাধ্যায়ের আঁতলামো ও মাতলামো শুনে শ্রোতা বন্ধুরা প্রাণ খুলে হাসলেন। দুই সম্পূর্ণ বিপ্রতীপ বিষয়কে নির্বাচন করে রম্যতা, হাস্যরস, চমক, শ্লেষ, সমকালীন নাগরিক জীবন এর মিশেল দিয়ে কী স্বচ্ছন্দ গদ্য যে লেখা যায়, রজতশুভ্রের লেখা যারা পড়েছেন বা শুনেছেন, সে কথা তারা স্বীকার করতে বাধ্য। জয়া চৌধুরি বরাবরই গল্প অনুবাদের ক্ষেত্রে বিষয়-বস্তুটিকে প্রাধান্য দেন। এবারেও ব্যতিক্রম হয়নি। বলিভিয়ার এক লেখকের স্প্যানিস ভাষার গল্পের অনুবাদ, বন্ধ দরজা শিরোনামের গল্পটির প্রতিটি পর্বে চমক পাঠক-শ্রোতাদের এক মুহূর্তের জন্য অন্যমনস্ক হতে দেয় না। চূড়ান্ত পর্বে বাবা-মেয়ের এক বিচিত্র সম্পর্কের সামনে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হতেই হয়।

বুবুন চট্টোপাধ্যায়ের সম্পর্ক গল্পে স্থায়ী দাম্পত্যের চেনা অন্বয় ও সমীকরণ অনায়াসে গল্পটিকে পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে যায় । নিজস্ব মানুষটির মধুমেহ রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর জেনে সদা সমালোচক ঝগরুটে স্ত্রী রসকলির উদ্বেগ উপভোগ করে হারাণ। স্ত্রীর কোমল , মমতাময় আচরণের পালাবদলের উৎসে যে রয়ে গেছে অর্থনৈতিক ভাবে পরাধীন মানুষের আমূল নির্ভরতা, তারই তাগিদে হয়তো বা দীর্ঘ দাম্পত্যে মধুর বাতাবরণ তৈরি হতে অসুবিধে হয়না। জীবনের এক ধূসর সত্য এ গল্পে সহজ ছন্দে উঠে এসেছে। টানটান মেদহীন গল্প উপহার দিয়েছেন পারমিতা মুন্সি তার অসম্পর্কের গল্পে। নব পরিণীতা অতীব সুন্দরী স্ত্রী যে আদতে অজস্র সম্পর্কে লগ্ন থাকা ছদ্মবেশী আই এস আই গুপ্তচর, সে কথা জেনেও প্রেমাকুল স্বামীর সংশয় যায়না। বিচার ব্যবস্থাকে অবজ্ঞা করে প্রতারক স্ত্রী আত্মঘাতী হলেও সবামী তার অন্ত্যষ্টিক্রিয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ গল্প কি সত্যিই অসম্পর্কের? নাকি সমাজ-মান্য সংলগ্নতাকে উপেক্ষা করে শাশ্বত জীবন-লগ্নতার দলিল?

সুগত চৌধুরির ছেঁড়া চিঠি এক বহু চেনা হৃদয় রেখার কাহিনী, বুদ্ধ পূর্ণিমার রাতে বৃদ্ধাশ্রমে থাকা দুঃখিনী মায়ের লেখা চিঠি, মেরুদন্ড হীন পুত্র গৌতমকে তার জন্মদিনে। আপাত ভাবে চেনা ছকের গল্পের মধ্যেও হয়তো বা রয়ে গেছে আরেক যোগসূত্র। ভগবান বুদ্ধ ঘর –সংসার ছেড়ে পথে নেমেছিলেন জীবনের বিচিত্রতার সাধনায়। আর আধুনিক যুগে সংসার থেকে বিতাড়িত মায়েরা বৃদ্ধাশ্রমে বাস করে জরা-ব্যাধি-মৃত্যু- ইত্যাদি নশ্বর জীবনের যাপন কথার অমোঘ বার্তাটি হৃদয়ঙ্গম করেন।এ বার্তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলে । বেশ উপভোগ্য ও স্মরণযোগ্য গল্প। শাশ্বতী সরকারের অমরত্বের খোঁজে গল্পের পরতে পরতে সম্পর্কের জটিল বুনন এসেছে সহজ ভাষায় । জীবনে তেমন কিছু না হয়ে ওঠা ভিকি হতাশা থেকে মুক্তি খোঁজে অনর্গল স্বপ্নচারণে, তার অবচেতন মনলোক ধর্ষক বাবার বিরুদ্ধে প্রতিশোধের উপায় খোঁজে, আকাঙ্খা করে মাতৃজাতির প্রার্থিত সম্মান । এভাবেই সে খুঁজে চলে জীবনের জ্যোতিঃলোকের পথ।

তমালি রায়ের মানুষ হিন্দু-মুসলমানের নিটোল সম্প্রীতির গল্প। এ ধরণের গল্প যত বেশি লেখা হবে, আমাদের জনমানস গোঁড়া ধর্মীয় বাতাবরণ থেকে মুক্ত হয়ে তত বেশি যুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে।

ঋণী গল্পে ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় বেশ ঝরঝরে ভাষায় তুলে এনেছেন সম্পর্কের এক ভিন্নতর বাঁক । মানুষের ব্যক্তিগত যাপন চিত্রের কত শত খুঁটিনাটি অস্তিত্বের খোঁজ সব সময় রাখা যায় না, রাখলেও সংশয় থেকেই যায়। এ গল্প এক হারিয়ে যাওয়া জৈবিক (বায়োলজিক্যাল) পিতা ও আরেক একক মায়ের ছেলের জীবন কথা। পিতা পুত্রের সম্পর্কে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা কিন্তু চিরকালীন মানবীয় আবেগের দাবি কিংবা অন্বয়টি কে অস্বীকার করতে পারেনা। গল্পের এই মর‍্যাল মনে করিয়ে দেয় সাহিত্যচর্চার মহত্তর লক্ষ্য আসলে অফুরান জীবন রসের নিবিষ্ট সাধনা এবং মানব-কল্যানের নব দিগন্ত ।

বাবা–মেয়ের সম্পর্কের দ্বন্দ্ব-জটিলতা নিয়ে গার্গী রায়চৌধুরীর সম্পর্ক গল্পটি বস্তুত একটি সুদূরপ্রসারী গল্পের অভিমুখ। প্রার্থিত পরিণতির প্রত্যাশা থেকেই যায়। প্রান্তিক মানুষের জীবনে নির্বীজ-করণের মত বাস্তব অথচ ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে গল্প খুব কম লেখা হয়েছে। কৃষ্ণা দাসের নির্বীজ গল্পটি সেই হিসেবে বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। শিক্ষিত, সুভদ্র নাগরিক যেখানে নিজের জৈবিক দৈন্যের বিষয়টি এড়িয়ে দাম্পত্য পর্ব টিকেই স্বীকৃতি দিতে অপারগ হয়, অন্ত্যেবাসী, শ্রমজীবি মানুষের চেতনা সেখানে স্বাভাবিক জীবন বোধে অনায়াসে অতিক্রম করে যায়। প্রচলিত সমাজমান্যতার ছক উপেক্ষা করে নিজের পুরুষত্বকে বাজি রাখতে তার দ্বিধাহীনতাকে তখন বাহবা না দিয়ে পারা যায়না।

 গল্প শুনতে শুনতে শ্রোতার আত্মশক্তি যে সপ্রাণ হয়ে ওঠে সোনালির শায়িত বুদ্ধ গল্পটি না শুনলে বিশ্বাস করা কঠিন হত। অসাধারণ কিছু শব্দ বিন্যাস দিয়ে ঘেরা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি উদ্বোধনের গল্পটি বহু কাল মনে থাকবে।

আসরের শেষ পর্বে মহাশ্বেতা রায় শোনালেন ফেলে আসা ছেলেবেলায়, মা ভাই, প্রতিবেশী , বন্ধুদের সান্নিধ্যে ঝুলন সাজানো দিনের স্মৃতি। সেই সব ভাল লাগার উৎসব আধুনিক নাগরিক জীবন থেকে নিছক অবহেলায় হারিয়ে গেছে।মহাশ্বেতা রায় তার অনুপম গদ্যে, প্রায় রূপকথার ভাষায় তুলে আনলেন সেই মহার্ঘ কিছু দিন। আর সেই হারিয়ে যাওয়া ঝুলন উৎসব পালনের আনন্দের রেশ আমরা সবাই সারা অস্তিত্বে মেখে নিলাম। পৌঁছে গেলাম আমাদের অগম্য শৈশবের সোপানে, মনে পড়ে গেল সেই সব দিনের অজস্র অনাবিল সম্পর্কের কথা।



পনেরো জন গদ্যকারের স্বরচিত গল্পপাঠে পঞ্চদশ গল্পবৈঠক নিটোল পূর্ণতা পেল আরো দু’জনের সান্নিধ্যে। নেশা’স কিচেনের পক্ষ থেকে সাহিত্যপ্রেমী দীপা চ্যাটার্জীর আন্তরিক আপ্যায়ন এবং সেদিনের আসরে পঠিত গল্প নিয়ে বিশেষ অতিথি সাহিত্যিক কাবেরী রায় চৌধুরির খোলামেলা, অন্তরঙ্গ আলোচনা ছিল দিনের বাড়তি প্রাপ্তি । শর্তহীন স্নিগ্ধতায় এই দুই নারী গল্প বৈঠকের প্রতিটি সদস্য ও বন্ধুদের মানবিক সম্পর্কে জড়িয়ে নিলেন। গল্পবৈঠকের যাত্রাপথ এগিয়ে চলবে আরো কয়েক শতক আসরের লক্ষ্যে ।


কৃষ্ণা রায়

বৃহস্পতিবার, ২২ জুন, ২০১৭

চতুর্দশ গল্পবৈঠক @ মৃত্তিকা


ষাঢ়ের তিন তারিখ হয়ে গেল, না কি চার? অথচ বৃষ্টির দেখা নেই। সমস্ত কলকাতা বাষ্পাকুল কেটলির মত ফুঁসছে শুধু। তারই মধ্যে ত্রিকোণ পার্কের মাড ক্যাফের মৃত্তিকা নামের একটা ঘরের চৌহদ্দিতে, অবশ্যই এসি-র বদান্যতা সহই, চমৎকার বসবার ব্যবস্থা এবং অ্যাকুস্টিকস নিয়ে, জমে উঠল চতুর্দশ গল্পবৈঠক অথবা গবৈ। মাঝামাঝি অথবা শেষের দিকে প্রধান আহবায়ক ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় বললেন, গবৈ কেন আলাদা। কেননা গবৈ কোন পত্রিকা বার করেনা, ফান্ড রেজিং করে না, গবৈ পুরস্কার ঘোষণাও করে না।সম্মাননা দেয় না কারোকে। এখানে নবীন প্রবীণ সদস্যরা আসেন গল্পকে ভালবেসে। গল্পের টানে। আর কোন স্বার্থ থাকেনা। এভাবেই পথ চলছে গবৈ, একের পর এক অনুষ্ঠানে ভেন্যু থেকে ভেন্যুতে জম্পেশ হয়ে উঠছে সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত আদান প্রদানে, অংশগ্রহণে, বন্ধুতায় । 




সেদিন অর্থাৎ ১৮ই জুন, ২০১৭ শুরু হল অধিবেশন ঠিক বিকেল চারটেতে। মাড কাফে-র তিনতলার মৃত্তিকা ঘরটিতে তখন দেবব্রত বিশ্বাসের রবীন্দ্র সঙ্গীতের হালকা অনুরণন । লাল শানের মেঝে দেওয়া পুরনো বাড়িটিতে একদা থেকে গিয়েছেন জর্জ বিশ্বাস ও শম্ভু মিত্র , তৃপ্তি মিত্র, ভাড়াটিয়া হিসেবে। আজ সারাবাড়ির কোণে কোণে তাঁদের ছবি টাঙানো। প্রাথমিকভাবে গান দিয়ে শুভারম্ভ । বর্ষার গান গাইলেন ডাঃ সুতপা গুপ্ত। 
তারপর গল্প পাঠের সূত্রপাত। প্রথমেই আষাঢ়ের দিনটার নিয়মরক্ষা করা হল একটি দুর্দান্ত ভূতের গল্পের আবহ দিয়ে। কৃষ্ণা দাসের সান্ধ্য সমাপতন। রীতিমত রোমাঞ্চকর এক কাহিনির সূত্রপাত। পটভূমি এক পুরাতন বাড়ি, তার ছাত। সে ছাত থেকে দেখা যায় কাঁসাই নদী। রোমহর্ষক গল্প। পরবর্তী গল্প নিবেদিতা ঘোষ মার্জিতের ভ্যাঁদা। নিবেদিতার বেশ কিছু গল্প শুনেছি আমরা আগের গবৈ তে। তার একটিও আমাদের হতাশ ত করেই নি, উল্টে প্রত্যাশা আরো বাড়িয়ে চলেছে। ভ্যাঁদা গল্পেও ছোট ছোট বাক্যে একটা স্পষ্ট সহজ ছবি পাওয়া গেল, সমাজমনস্ক মানবিক এক গল্পের রেণু লেগে ছিল এই ক্ষুদ্র লেখায়। চাইলে পরবর্তীকালে এ গল্পকে বিস্তারও দেওয়া যায়। এর পরের গল্প ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের “অ্যাক্রোফোবিয়া”। নামকরণেই একটা আভিজাত্যের ছোঁয়া। খুব ভাল গল্পকারের বৈশিষ্ট্য লেখন ভঙ্গিমায়। অল্প কথায় ঘটনাক্রমের বর্ণনা এবং শেষমেশ উত্তরণ। দুটি অর্থে অ্যাক্রোফোবিয়া শব্দের ব্যঞ্জনাকে ছড়িয়ে দেওয়া। অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া। বিসমিল্লায় গলদ পড়লেন স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়। অ্যাক্রোফোবিয়া গল্প যেমন নাম নিয়ে খেলা করে। স্বপ্নার লেখায় নামটাই গল্পের বড় অংশ। গল্পে কোথাও সরাসরি নামটার সংযুক্তি না থেকেও, গোটা গল্প জুড়ে একটা গলদের ছায়াচ্ছন্নতা ঝেঁপে আসে। অতিবাস্তব কিন্তু অত্যন্ত সংযত সেই বিবরণ। জাম্প কাটে পরিণত। এর পর জয়তীর শেষ উপহার। বাস্তব ঘটনা অনুসরণে লিখিত। একটা দুর্দান্ত প্রেমের গল্পের প্রচন্ড ঝাঁকুনিময় পরিসমাপ্তি। স্তম্ভিত করে। সুলিখিত, সুপঠিত। মনকে আচ্ছন্ন করে দেয়, ঘটনার বীভৎসতায়। রজত শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায় শিল্প এই ভারি হয়ে আসা পরিমন্ডলে একটা দারুণ রিলিফ, যেরকম তাঁর কাছ থেকে আমরা পেয়েই থাকি। শব্দখেলায় দক্ষ আর রসবোধে অনুপম রজত, সকলের রজতদা রীতিমত নাকানি চোবানি খাইয়েছেন সেই সব স্বঘোষিত শিল্পবোদ্ধাদের যারা শিল্পকে “কিসসু হয়নি' বলে দাগান অথবা অন্য কারুকে ‘কিসসু বোঝেনি' বলে গালি দেন। কাঁদি কাঁদি কলা আর শিল্প কলার সম্পর্ক রজতদা স্পষ্ট বুঝিয়ে ছাড়েন। 
নন্দিনী সেনগুপ্ত এর পর দেখালেন যাদু। তিনি ছিলেন এদিনের অতিথি গল্পকার। প্রথমদিনেই জার্মান গল্পের অনুবাদে “ বোলিং ট্র্যাক / ক্রীড়াভূমি” একটি অসামান্য অভিজ্ঞতা ছিল আজ। অনুবাদ বলে ত মনেই হয়না এত জোরালো বাংলা। ক্ষমতাশালী অনুবাদক নিঃসন্দেহে। আর পড়েছেন অবাক করা এক শ্রুতিনাটকীয় ভঙ্গিমায়। স্যালুট নন্দিনীকে, এই রকম চিরতরে সমকালীন এক বিষয়কে অনুবাদের মাধ্যমে আমাদের কাছে এনে দেবার জন্য। যুদ্ধের গল্প প্রতিদিনের যুদ্ধদামামার সময়ে অত্যন্ত স্পর্শ করে যায় আমাদের। সুগত চৌধুরীর ক্যাবলা, বেশ চমৎকার একটি কলেজি প্রেমের গল্প। প্রেমের গল্পকে সূক্ষ্মভাবে রসবোধ দিয়ে ধরার ক্ষমতা খুব অল্প লেখকেরই থাকে। এখানে সুখ এবং দুঃখ দুই মিলে মিশে অদ্ভুত একটা সৌন্দর্য ঘটে উঠেছে। চেনা চেনা মানুষের ছবির সঙ্গে মিলেমিশে যায়। কৃষ্ণা রায়ের মাতৃপর্ব। এক চমৎকার মনস্তাত্বিক কাহিনি। তিন প্রজন্মের মধ্যে সেতুবন্ধন। মা মেয়ের সম্পর্কের ভেতরে করুণা পর্ব ঈর্ষ্যা পর্ব। নানা পর্বের দোলায়মানতা। স্পর্শযোগ্য। ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের পরী। ভিন্ন এক অবস্থান বা দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যে কোন ছোট গল্পই আমাদের মধ্যে অন্যরকম একটা অনুভব আনে। চেনা গল্প তখন অচেনা। গ্রামের মেয়ে পরীর দৃষ্টিকোণের সারল্য, তার বঞ্চনা এবং অ্যাবিউজের অনুভবটি ছুঁতে সাহায্য করে শ্রোতাকে। শাশ্বতী সরকারের অহল্যা নামে একটি গল্প এর পর। প্রেমবুভুক্ষু এক নারীর গল্প। যে নিজে পাথরই থেকে যায়। বার বার চেষ্টায় তার চাহিদা মেটাতে অক্ষম হয়। অথবা যে পুরুষ কে সে কামনা করে অন্য পুরুষের সম্পর্ক মিলেমিশে যায় তার মধ্যে। চৈতালি চট্টোপাধ্যায় এরপর পেশ করেন অপ্রস্তুত নামের অতি ক্ষুদ্র এক অণুগল্প। চমক এবং বিস্ময়ে যে কোন শ্রোতাকে ছুঁতে সক্ষম গল্পটি। একজন মানুষকে সামান্য জেনে তাকে ভুল বোঝার প্রবণতা কতটাই না আমাদের , সেদিকে আঙুল তোলে এ গল্প। এর পর কনিষ্ক ভট্টাচার্য পড়েন অদ্ভুত আঁধার এক নামে একটি বিস্ময়কর লেখা। গল্পটি আমাদের এই সময়কে এমনই এক তীক্ষ্ণ শ্লেষে তুলে ধরে যে কশাহত হয় শ্রোতা। সংখ্যা ছড়িয়ে পড়েছে ঝড়ের অভিঘাতে, সমুদ্রতীরে। এ দৃশ্য হিচকক বা পূর্ব ইউরোপের কোন চিত্রপরিচালকের ছবির সুররিয়াল দৃশ্যের মত আমাদের আচ্ছন্ন করে। সেই সংখ্যা তুলে তুলে শিক্ষক সৈন্য রাজনীতিক সাংবাদিক সকলেই তাঁদের কাজে লাগাতে থাকেন। শেষ যেখানে এসে বাঁক নেয় গল্পটি সেটা সমসাময়িক একটি ঘটনাকে তুলে আনে মনোদেশে। সুস্মেলী দত্ত পড়েন গ্রহণ নামে একটি গল্প। মনস্তাত্বিক গল্প এটিও। নিজেকে বিকিয়ে দেওয়া এক মেয়ের কথা। গ্রহণ শব্দটির দুই প্রচলিত অর্থই মাথায় আসে। করুণা হয় মূল চরিত্রকে। এবার গার্গী রায়চৌধুরীর আলোর ডায়েরি। ডায়েরি ফর্মে লেখা এক মেয়ের লড়াইয়ের কাহিনি। লেখাপড়া করে নিজের প্রতিষ্ঠা পাবার পথে যে সব সাধারণীদের অনেক বাধা, তেমনই এক মেয়ের উত্তরণের কাহিনি এটা। আশাবাদী। এখানেও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই আলোর উৎস। শেষ গল্প যশোধরা রায়চৌধুরীর “ঐ বাড়িটা”, কিশোরপাঠ্য গল্প। এ গল্পের চরিত্ররা মনুষ্যেতর। শেষ পাতে খানিক হাসির আমেজ। অনুষ্ঠান শেষ হয় অনেক সুখাদ্য ( দার্জিলিং চা ও গ্রিলড স্যান্ডুইচ) সহকারে। একেবারে শেষে আবার গান। 

যশোধরা রায়চৌধুরীর কলমে 
 

মঙ্গলবার, ২০ জুন, ২০১৭

গল্পবৈঠকের বিদেশ সফর- ৫ই মে ২০১৭


 মে মাস, ২০১৭। ফিলাডেলফিয়া পৌঁছানোর আগেই নিউজার্সির তিন লেখকবন্ধুকে কথা দেওয়া ছিল। 
ছেলের কাছে গিয়েই যেন তাদের সঙ্গে একটিবার হলেও দেখা করি। আর বন্ধু মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী তো আগাম নেমন্তন্ন করেই রেখেছিল তার বাড়িতে অন্ততঃ একটিবেলা যেন পাত পেড়ে খেয়ে আসি। ফেসবুকে তার রন্ধনশৈলীর দিব্যি পরিচয় পেয়ে আসছি সুস্বাদু বাহারী সব পদের মনোহরা ছবি দেখে।  তাতেই এদ্দিন গ্যাস্ট্রোনমিক ফূর্তি হত। মৈত্রেয়ী যে সু রাঁধিয়ে তা জানতাম। সে রাঁধে আবার গল্পও বাঁধে নিজের কলমে।  তার গল্প সংকলন বহ্নিশিখাও পড়ে ফেলে তাকে ফিডব্যাক দিয়েছি। তার গদ্য বেশ সরস। প্যাপিরাস ই-পত্রিকায় তার টের আগেই পেয়েছি। আরেকজন হল সুদীপ্তা বুয়া চ্যাটার্জী। সেও একসময় ব্লগ লিখত। প্যাপিরাসেও লিখেছে। মৈত্রেয়ীর পড়শী আরেক সৃষ্টিশীল মেয়ে। প্ল্যান ছিল অনেক কিন্তু ফিলি তে পা দেবার আগেই ফেসবুকে সুদীপ্তার ছেলের হাত ভেঙে যাবার ছবি দেখে সেখানে গিয়ে উতপাত করা বা গল্পবৈঠকে সামিল হওয়া, কোনোটাই মাথায় ছিল না। এই সুদীপ্তা আর মৈত্রেয়ী ফেসবুক আমাদের কলকাতার গল্পবৈঠকে ছবি দেখলেই এতদিন ধরে মনখারাপ করত আর বলত, দিদি, এখানে এলেই কিন্তু গল্পবৈঠক হবে। মনে আছে তো?



আরেকজন বন্ধু হল সংগ্রামী লাহিড়ী। তার সাথে আমার ওঠাবসা বহুদিনের। প্রথমে বেথুন, তারপর সায়েন্স কলেজ আর তারপর আমার কর্তার সহকর্মী ছিল সে প্রাইস ওয়াটার হাউস, কুপার্স, কলকাতায়। সংগ্রামী কোর বিজ্ঞানের কৃতি ছাত্রী। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে যথেষ্ট অনুরাগ এবং দখল তার। ফেসবুকে তার আর আমার সাহিত্যচর্চা, নিয়মিত ইন্টারনেট আবাপ তে আমার লেখা পড়ে সে দেশ থেকে জানানো ইত্যাদির ফলে সংগ্রামীর সঙ্গে সে বিদেশবাসী হবার পর লেখালেখির কেমিষ্ট্রিটা জমে উঠছিল। প্যাপিরাসেও লিখেছে সে বার দুয়েক।  এবার ফিলি তে গিয়ে একটু থিতু হয়েই মনে হল, আশেপাশেই এই তিনবন্ধু কে অন্ততঃ জানিয়ে দি ব্যাপারটা, যে আমি এখানে এসেছি। নয়ত ফেসবুকে ছবি সাঁটালে ওদের মন ভার হবে। ওরা বলবে, খেলব না, সংগ্রামী, সুদীপ্তা, মৈত্রেয়ী তিনজনেই বেদম গোঁসা করবে। আরো যেসব বন্ধুরা আমেরিকায় আছে তারা আমার থেকে অনেক অনেক দূরে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিন্তু এই তিনজন একদম পাশের স্টেটেই। ইনবক্স করতেই ফোনাফুনি আর তারপরেই চরম উত্তেজনা আমাদের চার বন্ধুর।



- দিদি, তোমরা willow grove স্টেশনে পৌঁছনর মিনিট দশেক আগে একটিবার কল করে দিও রাজর্ষিকে। আনন্দের চোটে সব ভুল হয়ে যাচ্ছে, আচ্ছা, তোমাদের আশাকরি কোনো ফুড অ্যালার্জি নেই, যদি থাকে একটু জানিও...

কি আনন্দ! কি আনন্দ! বিদেশ বিভূঁই তে বাঙালী বন্ধু যেন সহোদরা।

মৈত্রেয়ীই দায়িত্ব নিল। তার বাড়িতেই এক সপ্তাহান্তে গল্পবৈঠক হবে। সেই সঙ্গে ডিনার। 

আগেই বলেছি ফিলাডেলফিয়ার যোগাযোগ ব্যাবস্থার জন্মলগ্নে বৃহষ্পতি তুঙ্গে। বাস, ট্রাম (ট্রলি) এবং লোকাল ট্রেন পরিষেবা একটিমাত্র কোম্পানির অধীনে যার নাম সেপটা (SEPTA) বা সাউথ ইষ্টার্ণ পেনসিলভেনিয়া ট্রান্সপোর্টেশান অথোরিটি । আর তাই বুঝি এত সুসংবদ্ধ এই নেটওয়ার্ক ।  অতএব পায়ে হেঁটে বাড়ি থেকে ট্রেন স্টেশনে পৌঁছে গেলাম বেলাবেলি। টিকিট কাটাই ছিল অনলাইনে।  ঘন্টাদুয়েক চলার পর মৈত্রেয়ীর কথামত নেমে পড়ি উইলোগ্রোভ স্টেশনে।  সেখানেই প্ল্যাটফর্মে হাজির ছিলেন বন্ধুপতি রাজর্ষি দা। মুগ্ধ হতে হল আতিথেয়তায়। কত যত্ন করে বেচারি নিজের উইকএন্ড প্ল্যান বাতিল করে শুধু আমার জন্যে  ছুটে এলেন অফিস কাছারি সামলিয়ে।
প্রিন্সটন  মেডোজ এর  প্লেনসবরোতে কার্পেটের মত সবুজ ঘাসে মোড়া জঙ্গলের মধ্যে মৈত্রেয়ীর বাড়ি পৌঁছলাম। কিছপরেই রীতিমত মাঞ্জা দিয়ে মাটন কারীর ঝোলা হাতে সুদীপ্তার প্রবেশ সাউথ ব্রান্সউইক থেকে।আর তার কিছু পরেই পার্সিপেনি থেকে এল সংগ্রামী তার কগনিজেন্টের ব্যাস্ত দায়ভার সামলিয়ে, নিজে হাতে বেক করা কেক নিয়ে।    
তারপরেই চা কফি পর্ব সঙ্গে মৈত্রেয়ীর হাতের বানানো ফিশ পকোড়া, সংগ্রামীর কেক জমে গেল সেই বিকেলে। এবার কথা না বাড়িয়েই গল্প পর্ব। গল্পপাঠ শুরু হল। পাশেই জঙ্গল, পাখির কিচিরমিচির। বাইরে কাঁচের দরজায় ঝোলানো বার্ডফিড এর সুদৃশ্য  খুপরী।  হালকা ঠান্ডার রেশ তখনো। পাখী আসতে বাধ্য। মন উচাটন। ওরে ওরে রোদ থাকতে থাকতে ছবি তোল। ছেলে ছবি তুলছে কখনো পাখীর, কখনো আমাদের গল্পপাঠের।
অতঃপর, ঢেঁকি স্বর্গে গিয়েও ধান ভানে।
মৈত্রেয়ীর গল্পের নাম "চেরী রঙের ড্রেসার"। পুরোনো ড্রেসার কিনে গুপ্তধন লাভের গল্প, সত্যি ঘটনা অবলম্বনে... মুগ্ধ শ্রোতা, আমার পুত্র শুভায়ন, সুদীপ্তার দুই পুত্র, স্বয়ং শুভ্র আর সায়ন শুভ্র, মৈত্রেয়ীর কন্যা সুকন্যা এবংআমাদের তিনজনের পতিদেবতারা। আর কি চাই? একেবারে ফাঁকা মাঠে গল্প বৈঠক কখনো গোল দেয় না।



এরপর সংগ্রামীর সেদেশের ভারতীয় অভিবাসীদের নিয়ে, এক্কেবারে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার গল্প। তারপরে সুদীপ্তার আগের দিন রাতে লেখা গল্প "নির্ভেজাল দিনের আত্মকথন"। আর  সবশেষে আমার অলৌকিক গল্প "চুনীর আংটি এবং থুরা" দিয়ে শেষ হল সেদিনের গল্পের আড্ডা । 

তারপরেই ঝাঁপিয়ে পড়া মৈত্রেয়ির ডাইনিং টেবিলে। রীতিমত সসৈন্যে আক্রমণ যেন। ডাল-ভাত-ফুলকপির ডালনার সঙ্গে ধোঁকার ডানলা, টার্কির বল কারি আর সুদীপ্তার মনোহরা মাটন জমে ক্ষীর সেই মূহুর্তে।

ছেড়ে যেতে মন চায় না তবুও ফিরতেই হল সে রাতে। রাজর্ষি দা আমাদের ছেড়ে দিয়ে গেলেন ফিলি তে। গল্পবৈঠকের টুপিতে আরো একটি পালক যুক্ত হল সেদিন। দেশের গন্ডী পেরিয়ে তার প্রথম বিদেশের মাটিতে পা রাখা...বেশ অন্যরকম, খুব আনন্দদায়ক। এটি বিদেশে প্রথম আর সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ বৈঠক ছিল।    

বুধবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৭

“গল্প বৈঠক বর্ষবরণ - ১৪২৪”

এই সময়, ২২শে এপ্রিল ২০১৭ শনিবার



২২শে এপ্রিল, ২০১৭, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের নর্থ গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হল শিল্প ও সাহিত্যের এক অনন্য মেলবন্ধন। বেহালা ফাইন আর্টস সোসাইটির পক্ষ থেকে এখানে আয়োজন করা হয়েছে বিশিষ্ট শিল্পীদের আঁকা শিল্পকর্ম নিয়ে একটি প্রদর্শনী, ২১শে এপ্রিল থেকে ২৭ শে এপ্রিল, ২০১৭ পর্যন্ত। জলরঙ, চারকোল এবং ক্যানভাসের ওপর আক্রিলিক রঙে আঁকা অনিন্দ্য সব চিত্রকলায় প্রাণ পেয়েছে শিল্পী মনের নিভৃত দর্শন। চিত্রকলা, স্থাপত্য, ভাস্কর্যের ব্যাকগ্রাউন্ডে কেবলই মনে হচ্ছিল শিল্প এবং শব্দ যুগপৎ পথ চলতে পারে। শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন প্রেমাংশু মিত্র, সমীর কর্মকার, তপন ভট্টাচার্য, গৌতম চৌধুরী, নিলয় কান্তি বিশ্বাস, অপূর্ব মজুমদার, বিশ্বজিত পাল, সঞ্জু মান্না এবং সত্যব্রত কর্মকার।
তাঁদেরই আমন্ত্রনে ২২ শে এপ্রিল বিকেল চারটে থেকে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের নর্থ গ্যালারিতে আয়োজিত হল “গল্প বৈঠক বর্ষবরণ - ১৪২৪”। শিল্পী বন্ধুদের গল্প বৈঠকের তরফ থেকে জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ এবং অশেষ কৃতজ্ঞতা।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই যে, এক বছর আগে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের সেন্ট্রাল গ্যালারিতে, বেহালা ফাইন আর্টস সোসাইটির বন্ধুদের সাহচর্যে ও সহযোগিতায় আয়োজিত হয়েছিল প্রথম গল্প বৈঠক। তাই “বর্ষবরণ” কথাটি এখানে দ্ব্যর্থবোধক, অর্থাৎ, গল্প বৈঠকের এক বছর পূর্তি এবং নতুন বাঙলা বছর ১৪২৪ কে সাদর আবাহন।




 গল্প বৈঠকের থিম সঙ গেয়ে অনুষ্ঠানের সুচনা করলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়, জয়া চৌধুরী এবং অয়ন চৌধুরী। গানটির কথা অয়ন চৌধুরীর এবং সুর ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের । এদিনের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে ছিলেন ভ্রামণিক, সম্পাদক এবং সাহিত্যিক শ্রী অমরেন্দ্র চক্রবর্তী। তাঁর উপস্থিতি এবং মূল্যবান মতামত গল্প বৈঠককে নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ করল। তিনি বলেন, লেখকের সাধনা একাকী, অন্তরালে। নিজের গভীরে ডুব দিয়ে তাঁকে খুঁজে আনতে হয় কিছু শব্দ, যা অন্য মানুষদের আলো দেখায়, তাই লেখকের দায়িত্ব অনেক। তাঁর বক্তব্যে তিনি বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেন মেয়েদের লেখালেখির কথা। তাঁর মতে মেয়েদের লেখার ভাষা এখন অনেক বলিষ্ঠ ও অসঙ্কোচ। তাদের লেখার মধ্যে শোনা যাচ্ছে তাদের নিজেদের লড়াইয়ের গল্প, ফুটে উঠছে তাদের নিজস্ব স্বর, নিজস্ব দৃষ্টি। শ্রী চক্রবর্তী পাঠ করলেন তাঁর নিজের কবিতা “ধর্না” - পরমকল্যাণের পথ চেয়ে অন্তহীন অপেক্ষায় থাকা।


গল্পে, কবিতায় গল্প বৈঠকের আসর জমে উঠেছিল। 

রজতশুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের  “নেইবাবুদের গল্প” আসলে সরকারি নেইবাবুদের নিয়ে লেখা একটি পরম উপাদেয় স্যাট্যায়ার। এই  নেইবাবুরা সরকারি খরচে ন্যায্য এবং অন্যায্য সব সুযোগ সুবিধা নেবার ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত কিন্তু কাজের কাজ করার বদলে এনারা করে চলেন “নেই কাজ”, অর্থাৎ যে কাজের কোনও বাস্তব অস্তিত্ব নেই, যা কিছু শুধু খাতায় কলমে। লেখাটি আদতে একটি ব্ল্যাক হিউমার যা একটি গভীর সমস্যাকে হাস্যরসের মোড়কে পরিবেশন করে।

নিবেদিতা ঘোষ মার্জিতের গল্প ন্যুড স্টাডি, একটি অসাধারণ গল্প যার মধ্যে রয়েছে অনেকগুলি স্তর। ক্লাস সেভেনের একটি ছেলে তার অমলিন দৃষ্টিতে মাকে স্বল্পবসনা অবস্থায় স্নানরত দেখে মুগ্ধ হয় এবং তার জীবনের প্রথম ন্যুড ছবিটি আঁকে। গল্পটির শেষে এই অপ্রত্যাশিত মোচড়ে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। কোথাও যেন ফ্রয়েড সাহেবের ইদিপাস কমপ্লেক্স উঁকি মারে।

কস্তূরী চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা “কেমন আছ” একটি অতৃপ্ত ভালবাসার, মন কেমনের মেদুর কবিতা। সোনালির কবিতা “সংসার” আমাদের আটপৌরে জীবনে আস্টেপৃস্টে জড়িয়ে থাকা ভালবাসার কথা বলে। দিনের শেষে এই আমাদের বেঁচে থাকার রসদ।

পাপিয়া ভট্টাচার্যের গল্প “অসবর্ণ” গল্পে লেখিকা তার সহজাত সাবলীল ভাষায় নিম্নবিত্ত পরিবারের অশিক্ষিত, সাধারণ অথচ ব্যাতিক্রমি মেয়ে বুলির জীবনচিত্র একেছেন। সমাজ সংসার নির্দেশিত ভালমন্দের ধারণাগুলোকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে মেয়েটি নিজের অন্তরে যা সত্য বলে অনুভব করে তাকেই অনুসরণ করে জীবনে। মেয়েটি অপ্রেম জানে না। অসুখী হয়েও সে ভালবাসা ঢেলে দিতে জানে। এর মূল্যও তাকে দিতে হয় সারাজীবন ধরে, নানা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে। তবু শেষ পর্যন্ত কোথাও যেন সে জিতেই যায়। আমরা যারা ব্যক্তিজীবনে নানারকম ভাবে আপোষ করতে করতে বেঁচে থাকি, তারা চমকিত হই মেয়েটির সততা ও চরিত্রের বলিষ্ঠতায়।

শাশ্বতী সরকার পড়লেন চারটি কবিতা। “আহ্বান” কবিতাটি রুপক ধর্মী।  সোনার ফসল ফলাবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে উষ্ণ মাটি ভালবাসার আহ্বান জানায় মেঘ ও বৃষ্টিকে। ‘সাধ’ কবিতায় পাই ভালবাসাকে ঘিরে অন্তহীন সাধ-স্বপ্নের আখ্যান। “স্বপ্নভুমির খোঁজে” কবিতায় ফুটে উঠেছে বিপন্ন সময়ের অসহায়তা। “অহল্যা” কবিতাটি অতি সংক্ষিপ্ত পরিসরে বলতে পেরেছে প্রতীক্ষা ও সমর্পণের কাহিনী।

নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষিতে লেখা প্রবীণা সাহিত্যিক শ্রীমতী কণা বসু মিশ্রের কবিতা “সত্তরের সেই দশক” ফুটিয়ে তুলেছে অস্থির সময়চিত্র - ছাত্র রাজনীতি, কাঁদানে গ্যাস, পুলিশের গুলি, খণ্ডযুদ্ধ। তবুও কবিতা, তবুও প্রেম বেঁচে থাকে সংগোপনে, বাঁচিয়ে রাখে সভ্যতার সবুজ বাগান।

বরেন্দ্রনাথ দাসের গল্প “বিপন্ন বার্ধক্য” আধুনিক সমাজের নিস্থুর অমানবিকতার ছবি তুলে ধরেছে, যেখানে পারিবারিক গণ্ডির মধ্যেই স্বার্থপরতার শিকার হয় পরিবারের বয়োবৃদ্ধ মানুষজন।

সুস্মেলী দত্তের “চক্র” কবিতায় প্রেম আসে, প্রেম হারিয়েও যায় ঋতুচক্রের আবর্তনে। তবুও মনের কোণে তার রেশটুকু থেকেই যায়। “যাপন” কবিতাটিও প্রেমের কবিতা। প্রাত্যহিক জীবনের নানা ওঠাপড়া মধ্যেও জেগে থাকে প্রেম। রোজকার দিনগত পাপক্ষয়ে ভালবাসার অপেক্ষায় থাকাই আমাদের সার্থক যাপন।

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের গল্প “মণিডাইনি” এক ভূমিকন্যার অবহেলিত জীবনের কথা, তার স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস, বঞ্চনা, লড়াই, ক্রমাগত ব্যবহৃত হতে হতে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার কাহিনী। নিজের পরিবারের লিঙ্গরাজনীতি তাকে স্বপ্নপুরণের কোনও সুযোগই দেয় না। শ্বশুরবাড়িতে অত্যাচারিত হতে হতে সে একসময় ডাইনি বলে ঘোষিত হয়, তাও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে। এই পোড়া দেশে এমন অনেক হতভাগ্য মেয়ের প্রতিনিধি হয়ে সে আমাদের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। আমরা যেন তার দিকে তাকাতে পারি না। কঠোর বাস্তব থেকে আহৃত এই কাহিনী আরও বেশী জীবন্ত হয়ে ওঠে লেখিকার অনবদ্য পঠনভঙ্গিতে।

তৃষ্ণা বসাকের শক্তিশালী কলম আবার উপহার দিল একটি চমকপ্রদ গল্প “উকুন”। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শ্রোতাকে চমকিত করতে করতে গল্পটি এগিয়ে যায় তার অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে। কি অনায়াস দক্ষতায় লেখিকা একসূত্রে গেঁথে ফেলেন কিছু আপাত বিচ্ছিন্ন বিষয়। সামান্য উকুন থেকে শুরু করে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সংশয়ের দোলাচলে ঝুলতে থাকা সম্পর্ক, ভার্চুয়াল দুনিয়ায় নিজেকে নাঙ্গা করে ফেলার অসহায়তা, সত্য মিথ্যার দন্দ্বে বিপর্যস্ত মানুষের ব্যাক্তি পরিচয় পেরিয়ে গল্পটি পৌঁছে যায় শ্রেণীহীন সমাজের অলীক স্বপ্ন, ভয় বা সম্ভাবনার দিকে।

গল্প বৈঠকের আসরে বিশেষ ভাবে পাওয়া জয়া চৌধুরীর স্প্যানিশ অনুবাদ গল্প “সার্জেন্ট চেও লোপেসের মৃত্যু।” মূল কাহিনী সিরো আলেগ্রি (পেরু)। এক সাধারণ সৈনিকের মৃত্যুর খবরে তার প্রাক্তন সতীর্থ ও সহযোদ্ধার স্মৃতিতে ফিরে আসে যুদ্ধের কটুস্মৃতি, মৃত্যুর সঙ্গে ওঠাবসা করার সাতকাহন। মৃত্যু এ গল্পে একটি চরিত্র হয়ে উঠেছে। তার নিজস্ব গন্ধ আছে, যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকদের সে সঙ্গ দেয়, পাশে থাকে। শবযাত্রায় সাধারণ সৈনিক টিকে স্যালুট জানানোর ইচ্ছে দিয়ে শেষ হয় গল্প। জয়াকে ধন্যবাদ, বিশ্ব সাহিত্যের এমন সব মণিমাণিক্যগুলিকে বাঙলা ভাষার পাঠকদের কাছে তুলে ধরার জন্য।

পারমিতা মুন্সীর কবিতা “বিবাহ প্রস্তাব” কবিতায় পাই একটি অভিনব বিবাহের প্রস্তাব। যৌথ জীবন, দাম্পত্য যেন একটা খেলা, বা প্রতিযোগিতা, বডি কনট্যাক্ট গেম, হাডুডু বা জুজুৎসুর মত। বিবাহের প্রস্তাব আসলে সেই খেলায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো। প্রস্তাবটিকে লোভনীয় করার চেষ্টা করা হয়েছে এই কথা বলে যে, এখানে কোনও রেফারি নেই এবং প্রতিপক্ষ স্বেচ্ছায় হেরে যেতে রাজি।

অয়ন চৌধুরীর গল্প “ডিকেসি ১, ডিকেসি ২” কর্পোরেট জগতের এক টুকরো ছবি তুলে ধরেছে। একটু খাপছাড়া, অন্যরকম চিন্তাধারার মানুষ ডিকেসি এই জগতে চূড়ান্ত মিসফিট এবং সকলের উপহাসের পাত্র। এ জগতে ঘোষিত নীতির সঙ্গে মেলে না বাস্তবের নিরীক্ষা। ছকে বাঁধা জীবনের বাইরে স্বাধীন চিন্তার কোনও মানুষের পা ফেলা মানতে পারেনা কেউ। আধুনিক সমাজমননের প্রতিচ্ছবি ধরা পড়ে সেখানেও।

শর্মিষ্ঠা ঘোষের গদ্য কবিতা “কাল্পনিক” তুলে ধরেছে রোজকার জীবনসংগ্রামে বিদ্ধস্ত মানুষটির ফেসবুকে ছদ্ম প্রোফাইলের আড়ালে মুক্তি খোঁজার কাহিনী। গল্পটি খুব চেনা। আমরা সকলেই তো কোনও না কোনও ভাবে এই এসকেপিসম আশ্রয় করে বেঁচে থাকি।

কৃষ্ণা রায়ের গল্প “টান” মানবমনের চিরন্তন টানাপোড়েনের গল্প যেখানে সন্তানের ভবিষ্যৎ ভাবনায় উদ্বিগ্ন মাতৃসত্তা মেয়ের কমপ্যাশনেট গ্রাউনডে চাকরি হবে ভেবে স্বামীর মৃত্যুকামনা করতেও পিছপা হয় না। সময় বদলে দেয় সবকিছুই। স্বামীর প্রতি ভালবাসার টান থেকেও অনেক শক্তিশালী হয়ে দাঁড়ায় সন্তানের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষা। কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হতে গিয়ে একাকার হয়ে যায় সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দের বোধ। আশাপূর্ণা দেবীর তীব্র বাস্তবধর্মী গল্পগুলির তিক্ত কষায় স্বাদ স্মৃতিতে ফিরে আসে যেন!

কৃষ্ণা দাসের গল্প “অসুখ” তুলে ধরে এক মনোবিকলনের কাহিনী। আপাতভাবে সুস্থ স্বাভাবিক স্মার্ট ঝকঝকে ছেলেটি টেলিফোনে কথা বলে চলে তার মৃত প্রেমিকার সঙ্গে। আধুনিক জীবনের ইঁদুর দৌড়ে সামিল হতে গিয়ে মনের ওপর চাপ বেড়েছে অনেকগুন। সেই সঙ্গে প্রেমিকার মৃত্যুজনিত ডিপ্রেশন, মেলাঙ্কোলিয়া। ফলে ছেলেটি মনের ভারসাম্য হারায়। অসুখ কি আসলে শুধুই ঐ ছেলেটির?

তমালী রায় পাঠ করলেন তিনটি কবিতা। “ঈর্ষা” কবিতাটি বলে, অন্যের ঈর্ষা অর্জন করতে হলেও যোগ্যতার প্রয়োজন। ঈর্ষা কবিকে আরও দৃঢ় করে তোলে । “প্রহর” কবিতায় পাই, সারাদিনের নানা কাজের ফাঁকে কিছু নির্জন অপার্থিব মুহূর্ত যত্নে তুলে রাখা থাকে ভালবাসার জন্য, যা মনের মেঘ কাটিয়ে নতুন সূর্যোদয়ের সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে দেয়। “আধুনিকতা” কবিতায় বলা হয় আধুনিকতার সঙ্গে সমান্তরালে বয়ে চলা অস্থিরতার কথা।

ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প “কুহক” তুলে ধরে মানবমনের আর এক জটিল গোলকধাঁধার কথা। বিপত্নীক বৃদ্ধ একটি অল্পবয়সী মেয়ের চেহারায় তার মৃতা স্ত্রীর চেহারার কিছু মিল খুঁজে পেয়ে বারবার তাকে দেখতে চাইতেন, মেয়েটির সঙ্গলাভের আশায় নয়, তার স্ত্রীকে ফিরে দেখার বাসনায়। এভাবেই যেন সময়কে হারিয়ে দিয়ে স্ত্রীর মৃত্যুকে অস্বীকার করতে চাইতেন তিনি।

বুবুন চট্টোপাধ্যায়ের গল্প “মৃত্যু”। আত্মসর্বস্ব মানুষ হারিয়ে ফেলছে মানবিকতার বোধ। এমনকি পথেঘাটে কারও মৃত্যু ঘটেছে শুনলেও সে কোনও আগ্রহ বা কৌতূহল বোধ করে না, শুধু নিজের অসুবিধার কথা ভেবে কিছু ক্ষোভ আর বিরক্তি উগরে দেয়। মেট্রো রেলে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে গেছে হঠাৎ। যার ফলশ্রুতিতে এই সমস্ত ভাবনা মনে আসে অরুনাংশুর। পরে জানা যায় মৃত ব্যক্তিটি তাঁর নিজের সন্তান। শুধু যে অন্যের প্রতি মানবিক বোধেরই মৃত্যু ঘটেছে তা নয়, আত্মসর্বস্ব জীবনে মানুষ সন্তানের মনের খবর রাখতেও ব্যর্থ, মৃত্যুর করাল ছায়া এতটাই বিস্তৃত আমাদের জীবনে, এমনই একটি ইঙ্গিত দিয়ে শেষ হয় গল্পটি।



    অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন সঞ্চারী চক্রবর্তী। তাঁর সুললিত কণ্ঠে দু’কলি রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে শেষ হল দ্বাদশ গল্পবৈঠকের আসর।

পরিশেষে আরও একবার উল্লেখ করতে হয় বেহালা ফাইন আর্টস সোসাইটির শিল্পী বন্ধুদের আন্তরিক আতিথেয়তার কথা। গল্প বৈঠকের প্রত্যেক সদস্যকে পুস্পস্তবক দিয়ে অভিবাদন জানানো থেকে শুরু করে ভেজিটেবিল চপ এবং চা দিয়ে আপ্যায়ন। আমরা অভিভূত, আপ্লুত, মুগ্ধ। তাঁদের সকলের জন্য গল্প বৈঠকের তরফ থেকে জানাই আন্তরিক শুভকামনা। শিল্প সাহিত্যের এই মেলবন্ধন দীর্ঘস্থায়ী হোক, এই কামনা করি।


 ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিবেদন